সারোগেসি আইন (surrogacy law) কার্যকরের আগে ভ্রূণ সংরক্ষণকারী (Frozen Embryos) দম্পতিদের জন্য স্বস্তির বার্তা দিল সুপ্রিম কোর্ট (Supreme Court)। বলল, তাঁদের ওপর নতুন বয়সসীমা প্রযোজ্য নয়, কারণ সন্তানলাভের অধিকার সময়ের সীমায় বাঁধা নয়।

সারোগেসি নিয়ে সুপ্রিম কোর্ট।
শেষ আপডেট: 10 October 2025 13:22
দ্য ওয়াল ব্যুরো: কখনও কখনও আইন নয়, জীবনের যুক্তিই বড় হয়ে ওঠে। তেমনই এক মামলায় রায় দিয়ে বৃহস্পতিবার সুপ্রিম কোর্ট জানাল, যাঁরা সারোগেসির পথে এগিয়েছিলেন এবং নতুন আইন কার্যকর হওয়ার আগে তাঁদের ভ্রূণ সংরক্ষণ করেছিলেন, তাঁদের ক্ষেত্রে নতুন সারোগেসি আইনের বয়সসীমা প্রযোজ্য নয়।
এই রায় শুধু আইনের ব্যাখ্যা নয়, সেই সঙ্গে মানবিকতার পক্ষেও বড় বার্তা। এদিন বিচারপতি বিভি নাগারত্না ও কেভি বিশ্বনাথনের বেঞ্চ স্পষ্ট করে দেন— কোনও আইনই অতীতে গিয়ে মানুষের অধিকার কেড়ে নিতে পারে না। যদি তা করতে হয়, আইনেই তার স্পষ্ট উল্লেখ থাকা চাই।
২০২১ সালের সারোগেসি (রেগুলেশন) আইনে বলা হয়েছে, সারোগেসি পদ্ধতিতে মা-বাবা হতে গেলে মহিলার বয়স হতে হবে ২৩ থেকে ৫০-এর মধ্যে এবং পুরুষের বয়স হতে হবে ২৬ থেকে ৫৫ বছরের মধ্যে। এই আইনটি কার্যকর হয় ২৫ জানুয়ারি ২০২২ থেকে। সরকারের যুক্তি ছিল, সন্তানের দীর্ঘমেয়াদি যত্নের জন্য এই বয়সসীমা স্থির করা প্রয়োজনীয়।
কিন্তু তিনটি দম্পতি, যাঁরা আইন কার্যকর হওয়ার আগেই সারোগেসি শুরু করেছিলেন, আইনের এই নতুন সীমার কারণে থমকে যান। তাঁদের যুক্তি, যদি তাঁরা আগেভাগে জানতেন এমন আইন আসছে, তবে তাঁরা প্রক্রিয়ার পরবর্তী ধাপ, অর্থাৎ ভ্রূণ স্থানান্তরের কাজটি আগেই সম্পন্ন করতেন।
এই পরিস্থিতিতে বিচারপতিরা বলেন, সারোগেসির মাধ্যমে সন্তান লাভের অধিকার সংবিধানের ২১ নম্বর অনুচ্ছেদের অন্তর্ভুক্ত। এটি জীবনের মৌলিক অধিকার, যা সময় বা বয়সের সীমায় আটকে রাখা যায় না। যখন এই দম্পতিরা সারোগেসি প্রক্রিয়া শুরু করেছিলেন, তখন তাঁদের ওপর কোনও বয়সসীমা ছিল না। তাই নতুন আইন পিছনে ফিরে গিয়ে তাঁদের সেই অধিকার কেড়ে নিতে পারে না।
বিচারপতিরা নতুন বয়সসীমা নিয়ে উদ্বেগও প্রকাশ করেছেন। তাঁদের মতে, সন্তানলাভের আকাঙ্ক্ষা এমন এক গভীর মানবিক ইচ্ছা, যা কেবল সংখ্যায় মাপা যায় না।
সুপ্রিম কোর্টের মতে, এই রায়ের সুফল পাবেন সেইসব দম্পতিরা যাঁরা সারোগেসি প্রক্রিয়ার ‘স্টেজ বি’-তে ছিলেন।অর্থাৎ, যাঁদের গ্যামেট সংগ্রহের পর ভ্রূণ তৈরি ও সংরক্ষণ সম্পন্ন হয়েছে এবং ঠিক তখনই আইন কার্যকর হয়েছে, তাঁরা নতুন নিয়মের বাইরে বেরিয়েই পুরো প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে পারবেন।
তবে সুপ্রিম কোর্ট উল্লেখ করেছে, যাঁরা শুধু কাউন্সেলিং করিয়েছেন, অনুমোদন বা শংসাপত্র পেয়েছেন, বা গ্যামেট সংগ্রহের পর্যায়ে ছিলেন, তাঁরা এই রায়ের আওতায় আসবেন না।
বিচারপতিরা বলেন, “মানুষের সন্তানলাভের অধিকার তখনই সীমাবদ্ধ করা যেতে পারে, যখন তা যুক্তিসঙ্গত ও ন্যায্য কারণে প্রয়োজন। আইনকে অন্যায্যভাবে ব্যাখ্যা করে এই অধিকার কেড়ে নেওয়া যাবে না।”
আদালত যেন মনে করিয়ে দিল, আইন সাধারণত ভবিষ্যতের জন্য প্রযোজ্য, অতীতের জন্য নয়। বিচারপতিরা বলেন, “যে অধিকার ইতিমধ্যেই রয়েছে, তা কোনও নতুন আইনের দ্বারা নষ্ট করা যায় না, যদি না সেই আইন স্পষ্টভাবে তা নির্দেশ করে।”
এই যুক্তি অনুযায়ী, সারোগেসি আইনের বয়সসীমা অতীতে প্রযোজ্য করা হলে তা নাগরিকদের অধিকার ক্ষুণ্ণ করবে, যা সংবিধানের পরিপন্থী।
আদালত জানিয়েছে, মামলাকারী দম্পতিরা আইনের অন্য শর্ত পূরণ করলে সারোগেসি প্রক্রিয়া চালিয়ে যেতে পারবেন। তাঁদের আর বয়স যাচাইয়ের সার্টিফিকেট লাগবে না। তবে অন্য দম্পতিরা যদি একই সমস্যায় পড়েন, তাঁদের হাইকোর্টে আবেদন করতে বলা হয়েছে।
সুপ্রিম কোর্টের এই রায় শুধুমাত্র আদালতের দ্বারস্থ হওয়া তিনটি দম্পতির জন্য নয়, সেইসব মানুষদেরও কণ্ঠস্বর হয়ে উঠেছে যাঁরা সারোগেসির পথে হেঁটে থমকে গিয়েছিলেন নতুন আইনের বাধায়। এই রায় মনে করিয়ে দিল—মাতৃত্ব বা পিতৃত্বের অধিকার শুধু শরীরের নয়, হৃদয়েরও বিষয়।