
শেষ আপডেট: 27 December 2023 19:36
৩ মে শুরু হওয়া জাতিদাঙ্গাকে কেন্দ্র করে মণিপুরে কুকি ও মেইতেই সম্প্রদায় এখন আড়াআড়ি বিভক্ত। দু’পক্ষই রাজ্যের অভ্যন্তরে এবং বাইরে নিজেদের অধিকার, স্বার্থের কথা তুলে ধরছে। এ পর্যন্ত নিহত প্রায় দুশো মানুষের মধ্যে কোন সম্প্রদায়ের কতজন তা এখনও স্পষ্ট নয়। তবে কুকিদের দাবি, নিহতদের বেশিরভাগই তাদের সম্প্রদায়ের মানুষ।
গত আট মাসের মধ্যে বেশিরভাগ সময় মণিপুর খবরের শিরোনাম হলেও বিগত কয়েকদিন উত্তর-পূর্বের এই রাজ্য শান্ত। বড় ধরনের হিংসার ঘটনা নেই। যদিও দু’পক্ষই মারাত্মক অস্ত্রসস্ত্র নিয়ে প্রস্তুত। সেনা, আধা সেনা ও পুলিশের যৌথ বাহিনী দুই সম্প্রদায়ের বসত এলাকার সীমান্তে নিরাপদ অঞ্চল বা বাফার জোন তৈরি করে রাখলেও দূরপাল্লার আগ্নেয়াস্ত্র ছুড়ে হামলা অব্যাহত।
জাতিদাঙ্গা শুরুর পর দু’পক্ষই নিজেদের অধিকৃত এলাকায় পুলিশ ও আধা সেনার অস্ত্রগার লুঠ করেছে। মণিপুর সরকার সুপ্রিম কোর্টে হলফনামা দিয়ে জানিয়েছে গোলমাল শুরুর পর পরই ৫,৬০০ আগ্নেয়াস্ত্র এবং সাড়ে ছয় লাখ কার্তুজ লুঠ হয়। লুঠ হওয়া অস্ত্রের বেশিরভাগটাই এখনও দুই সম্প্রদায়ের হাতে আছে।
কুকিদের নাগরিক সংগঠনগুলির দাবি, লুঠ হওয়া অস্ত্রের বেশিরভাগটাই মেইতেইদের হাতে রয়েছে। অন্যদিকে, মেইতেইদের সংগঠনগুলি বলছে, কুকিরা শুধু অস্ত্রগার লুঠ করেছে তাই-ই নয়, মায়ানমার থেকে অস্ত্র পাচ্ছে তারা।
অভিযোগে সত্য-মিথ্যা যাই থাকুক না কেন, সাধারণ নাগরিকদের হাতে অস্ত্র আছে, এই সত্য সরকারও অস্বীকার করছে না। ফলে ফের গোলমাল, হামলা, রত্তপাতের সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না। পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হওয়ায় ত্রাণ শিবির থেকে মানুষকে বাড়ি ফিরিয়ে দেওয়া সম্ভব হয়নি। তার উপর কুকি ও মেইতেইরা একে অপরের এলাকায় যাওয়া বন্ধ করে দিয়েছে। পার্বত্য মণিপুরের কুকি এলাকা থেকে মেইতেইরা পালিয়ে আশ্রয় নিয়েছে ইম্ফল উপত্যকায়। উল্টোটা হয়েছে কুকিদের ক্ষেত্রে। রাজধানী ইম্ফল ছেড়ে তারা চলে গিয়েছে পার্বত্য এলাকার চূড়াঁচাদপুর, চাণ্ডেলের মতো জেলায়।
জাতিদাঙ্গাই কি মুখ দেখাদেখি বন্ধের মতো পরিস্থিতি তৈরির একমাত্র কারণ? কুকি সম্প্রদায়ের দাবি, ২০১৭-তে বীরেন সিংহের সরকার ক্ষমতাসীন হওয়ার পর পরিকল্পিতভাবে দুই সম্প্রদায়ের মধ্যে বিভাজন তৈরির চেষ্টা শুরু হয়। কুকিরা বহিরাগত, জঙ্গি, মাদক ব্যবসায়ী, বলে ধারণা তৈরির চেষ্টা চলে। ফলে মানসিক বিভাজন হয়েই ছিল। ৩ মে জাতিদাঙ্গা সূত্রে সেই বিভাজনের চূড়ান্ত বহিঃপ্রকাশ ঘটে।
কুকিরা বহিরাগত বলে কোকোমি বা কো-অর্ডিনেশন কমিটি অফ মণিপুর ইন্টিগ্রিটি, আরামবাই টেঙ্গলের মতো মেইতেই জাতির সংগঠনগুলি প্রচার তীব্র করে। রাজ্যের নানা জায়গায় এই মর্মে পোস্টার সাঁটা হয় বলে অভিযোগ। কুকিরা যাযাবর জাতি, ব্রিটিশরা তাদের পার্বত্য মণিপুরে বসতি স্থাপনের ব্যবস্থা করে দিয়েছিল বলে প্রচার তীব্র করে মেইতেই সংগঠনগুলি। ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে কুকিদের যুদ্ধ, সুভাষচন্দ্র বসুর আইএনএ-তে এই জনজাতি গোষ্ঠীর যোগদানের ইতিহাসকে মিথ্যা, অতিরঞ্জিত বলে প্রচার শুরু হয়। কুকিদের নাগরিক সমাজের অভিযোগ, মেইতেইদের অভিযোগ মান্যতা পেয়ে যায় মুখ্যমন্ত্রী বীরেন সিংহের মন্তব্যে।
কুকিদের নৃতাত্ত্বিক ইতিহাসকে অস্বীকার করার পাশাপাশি তাদের বিরুদ্ধে আফিম চাষ ও মাদক পাচারে জড়িত থাকার অভিযোগ তোলা হতে থাকে। কুকিদের বক্তব্য, মণিপুরে আফিম চাষ নতুন নয়। মায়ানমার সীমান্ত দিয়ে মাদক পাচারও অজানা অপরাধ নয়। তাতে কুকি, মেইতেই এবং নাগা, রাজ্যের তিন জনগোষ্ঠীর লোকজনই যুক্ত। অথচ, বিগত কয়েক বছর যাবৎ লাগাতার চেষ্টা চলেছে মাদক ব্যবসা এবং আফিম চাষের দায় কুকিদের উপর চাপিয়ে দেওয়ার।
জাতিদাঙ্গা শুরুর আগে মণিপুরের বিজেপি সরকারের আরও একটি সিদ্ধান্ত ঘিরে দুই সম্প্রদায়ের মধ্যে বিভাজন চওড়া হয়। গত এপ্রিলে রাজ্য সরকার সংরক্ষিত বনাঞ্চলে জরিপের সিদ্ধান্ত নিলে কুকিদের সংগঠনগুলি আপত্তি তোলে। কুকি স্টুডেন্টস ফেডারেশন এবং জোমি স্টুডেন্টস নামে দুটি ছাত্র সংগঠন আপত্তি তোলে। তাদের বক্তব্য ছিল, গ্রাম প্রধানদের সম্মতি ছাড়া রাজ্য সরকার এই কাজ করাতে পারে না। কুকি-জো জনগোষ্ঠীতে গ্রাম প্রধান বা ভিলেজ চিফই হলেন জমির ব্যাপারে শেষ কথা বলার অধিকারী। চূড়াইচাঁদপুর-সহ কুকি বহুল এলাকার বিজেপি বিধায়কেরাও রাজ্য সরকারের সিদ্ধান্তে আপত্তি তোলে। যদিও তাতে সরকারি সিদ্ধান্তের নড়চড় হয়নি। কুকি সংগঠনগুলির বক্তব্য, বহু প্রজন্ম ধরে জঙ্গলে বসবাসকারীদের অনেক গ্রামকে সরকার বেআইনি ঘোষণা করেছে। সেগুলির বাসিন্দাদের অনুপ্রবেশকারী বলে দাগিয়ে দিয়েছে প্রশাসন ও মেইতেইরা।