
শেষ আপডেট: 3 December 2023 00:02
দ্য ওয়াল ব্যুরো: শেষ মুহূর্তে অঘটন না ঘটলে এপ্রিল-মে মাস নাগাদ লোকসভা নির্বাচন হওয়ার কথা। তার আগে নভেম্বর মাস জুড়ে রাজস্থান, মধ্যপ্রদেশ, ছত্তীসগড়, তেলঙ্গনা ও মিজোরামে বিধানসভা ভোট হয়েছে। রবিবার ৪ রাজ্যে ভোট গণনা ও ফল ঘোষণা হবে। মিজোরামের ভোটের গণনা হবে সোমবার।
যেহেতু দেশে সাধারণ নির্বাচনের ঠিক আগে এই ভোট হয়েছে তাই মাধ্যমিকের আগে এও এক টেস্ট পরীক্ষার মতো বলেই কেউ কেউ মনে করেন। তাঁদের মতে, ফাইনাল পরীক্ষায় বসার আগে একবার দেখে নেওয়া— প্রস্তুতি কেমন রয়েছে। তবে একে সেমিফাইনাল বলা যাবে কিনা তা নিয়ে পক্ষে ও বিপক্ষে অনেক যুক্তি রয়েছে।
২০০৩ সালে ঠিক এভাবেই বিধানসভা ভোট হয়েছিল রাজস্থান, মধ্যপ্রদেশ, ছত্তীসগড় ও দিল্লিতে। হিন্দিবলয়ের তিন রাজ্যেই জিতে গেছিল বিজেপি। শুধু হেরেছিল দিল্লিতে। চারটির মধ্যে তিনটি রাজ্যে জিতে অটল বিহারী বাজপেয়ী খুবই উচ্ছ্বসিত হয়েছিলেন। লালকৃষ্ণ আডবাণীও তাই। সেমি ফাইনালে জিতে গেছি ধরে নিয়ে লোকসভার ভোট এগিয়ে এনেছিলেন বাজপেয়ী। কিন্তু তা ডাহা ভুল প্রমাণিত হয়েছিল। পরে বিজেপির বোধদয় হয়েছিল, দিল্লি-মধ্যপ্রদেশ-ছত্তীসগড়-রাজস্থানের ভোট সেমিফাইনাল ছিল না। মধ্যপ্রদেশ ও ছত্তীসগড়ে কংগ্রেস সরকারের বিরুদ্ধে প্রবল প্রতিষ্ঠান বিরোধিতা তৈরি হয়েছিল। তাই জিতেছিল বিজেপি। আর রাজস্থানে এমনিই পাঁচ বছর অন্তর সরকার পরিবর্তন হয়। কিন্তু আডবাণীরা ধরে নিয়েছিলেন, দেশজুড়ে বাজপেয়ী সরকার নিয়ে ‘ফিলগুড ফ্যাক্টর’ কাজ করছে। সেই কারণেই তিন রাজ্যে হই হই করে জিতেছে বিজেপি।
২০১৯ সালে লোকসভা ভোটের আগে মধ্যপ্রদেশ, রাজস্থান ও ছত্তীসগড়—হিন্দিবলয়ের এই তিন রাজ্যেই হেরেছিল বিজেপি। কিন্তু তার পর লোকসভা ভোটে এই রাজ্যগুলিতে ফের স্যুইপ করেছিলেন নরেন্দ্র মোদী। অর্থাৎ তখনও স্পষ্ট হয়ে গেছিল, বিধানসভা ভোটের ফলাফল লোকসভা ভোটের জন্য কোনও আগাম ইঙ্গিত নয়।
প্রশ্ন হল, তা হলে এবারের ভোটের ফলাফলকে কি সেমিফাইনাল বলা যাবে?
অনেকের মতে, পুরনো নজিরকে টেবিলে রাখলে তা বলতে দ্বিধা হতে পারে। আবার রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের একাংশের মতে, সেমিফাইনাল বলা যেতেই পারে। কারণ, এই সবকটি রাজ্যে প্রচারেই নরেন্দ্র মোদী ছিলেন বিজেপির প্রধান মুখ। বিজেপি কৌশলগত ভাবে তাঁকে সামনে রেখে ভোট চেয়েছে। তা ছাড়া ভোটের প্রচারে স্থানীয় বিষয়ের পাশাপাশি রাম মন্দির, ৩৭০ ধারা বিলোপের মতো জাতীয় স্তরের বিষয়আশয় নিয়ে এসেছিলেন প্রধানমন্ত্রী। অর্থাৎ তাঁর সরকারের সাফল্যও তুলে ধরেন। সেই সঙ্গে বিধানসভা ভোট চলাচালীনই প্রধানমন্ত্রী ঘোষণা করে দেন যে তাঁর সরকার দারিদ্র সীমার নিচে বাস করা পরিবারগুলিকে আগামী পাঁচ বছর বিনামূল্যে চাল-গম দেবে।
একই ভাবে রাহুল-প্রিয়ঙ্কা মোদী সরকারের ব্যর্থতার বিষয়গুলিও তাঁদের বক্ত়ৃতার তুলে আনেন। অর্থাৎ জাতীয় স্তরের বিষয় তুলে এনেও ভোটারদের প্রভাবিত করার চেষ্টা হয়েছে। সুতরাং এই পাঁচ রাজ্যের ভোটে জনাদেশ থেকে কেন্দ্রের সরকার সম্পর্কে মানুষের মনোভাব সম্পর্কে একটা ইঙ্গিত পাওয়া যাবে বলেই অনেকের মত।
আরও একটি বিষয় এখানে তাৎপর্যপূর্ণ। ২০১২ সাল থেকে কংগ্রেস ক্রমশ ক্ষয়িষ্ণু হওয়ার কারণেই হিন্দিবলয়ে বিজেপির বৃদ্ধি হয়েছে। রবিবারের গণনায় বোঝা যাবে কংগ্রেস সেই ক্ষয় রোধ করে ফের বৃদ্ধির পথে হাঁটতে পারছে কিনা। সেই সঙ্গে এও বোঝা যাবে যে লোকসভার ২০০টির বেশি আসনে, যেখানে বিজেপির সঙ্গে কংগ্রেসের সন্মুখ সমর হবে, সেই যুদ্ধের জন্য কে কতটা প্রস্তুত। এবং এই ভোটের সঙ্গে লোকসভার ফলাফলের প্রত্যক্ষ যোগাযোগ থাকুক বা না থাকুক, এর ফলাফল দুই শিবিরের মনোবলে অনেকটা প্রভাব ফেলবে বলেই পর্যবেক্ষকরা মনে করছেন।
তা ছাড়া তেলঙ্গনার বিধানসভা ভোটের ফলাফল জাতীয় রাজনীতির জন্য অর্থবহ হয়ে উঠবে বলেই ধারণা করা হচ্ছে। কারণ, তেলঙ্গনায় চন্দ্রশেখর রাও ক্ষমতা ধরে রাখতে পারে তা বিজেপির জন্য স্বস্তির হতে পারে। মোদী-শাহর কাছে অন্তত এই স্বান্তনা থাকবে যে কংগ্রেস শক্তিশালী হচ্ছে না। কিন্তু তেলঙ্গনায় যদি কংগ্রেস জিতে যায়, তাহলে লোকসভা ভোটের আগে তামাম দক্ষিণভারতে কংগ্রেস প্রভূত অক্সিজেন পেয়ে যাবে। কর্নাটকের পর তেলঙ্গনায় কংগ্রেস জিতে গেলে অবধারিত ভাবেই এর পর অন্ধ্রপ্রদেশ পুনর্দখলের জন্য ঝাঁপাবেন রাহুল গান্ধীরা। কারণ, ২০০৪ এবং ২০০৯ লোকসভা অভিভক্ত অন্ধ্রপ্রদেশ থেকে কংগ্রেসের সবচেয়ে বেশি সংখ্যক সাংসদ জিতেছিলেন।