
শেষ আপডেট: 22 September 2021 09:22
ভালবাসা, অনুপ্ররণাই মারণ ব্যধি জয় করার আসল ওষুধ। এই লক্ষ্যেই গোলাপ দিবস পালিত হয় বিশ্বজুড়ে। ভালবাসার দিন আজ নয়। তবে ভালবাসা ছড়িয়ে দেওয়ার দিন। প্রতি বছর ২২ সেপ্টেম্বর বিশ্বজুড়ে পালিত হয় ‘ওয়ার্ল্ড রোজ ডে’। এই গোলাপ দিবসের সঙ্গে ভ্যালেন্টাইন্স ডে-র কোনও সম্পর্ক নেই। ক্যানসার আক্রান্ত রোগীদের জীবন সংগ্রামে উদ্বুদ্ধ করাই এই বিশেষ দিনটির উদ্দেশ্য। গোলাপ ফুলের সঙ্গে প্রেম-ভালবাসা-বন্ধুত্বের এক অবিচ্ছেদ্য সম্পর্ক আছে। মারণ রোগের সঙ্গে লড়াই করছেন যাঁরা, তাঁদের জীবনে এক টুকরো ভালবাসা , আনন্দের মুহূর্ত ছড়িয়ে দিতেই গোলাপ দিবস পালিত হয় প্রতি বছর।
এই দিনে ক্যানসার রোগীদের গোলাপ ফুল, কার্ড, উপহার দিয়ে তাঁদের মনোবল বাড়ানোর চেষ্টা হয়। দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে ছোটখাটো অনুষ্ঠানও হয়। বাঁচার ইচ্ছা চলে গেছে যে ক্যানসার রোগীদের, মারণ রোগের যন্ত্রণা কুড়ে কুড়ে খাচ্ছে যাঁদের, সেই মুহূর্ষু রোগীদের অনুপ্রেরণা দেওয়া হয় যাতে তাঁদের জীবন গোলাপের নরম পাপড়ির মতোই পেলব, মসৃণ, জয়ের সুগন্ধে ভরে ওঠে।
গোলাপ দিবসের সঙ্গে ইতিহাস জড়িয়ে রয়েছে। কানাডার ১২ বছর বয়সী ছোট্ট একটি মেয়ে মেলিন্ডা রোজের জীবন থেকে অনুপ্রেরণা নিয়েই এই দিনটি পালন করা হয়। রক্তের ক্যানসারে আক্রান্ত ছিল মেলিন্ডা। বিরল অস্কিন টিউমার ধরা পড়েছিল তাঁর। চরম যন্ত্রণার দিনগুলোতেও বাচ্চা মেয়েটি জীবনে বাঁচার আশা ছাড়েনি। তার প্রতিটা ই-মেল, কবিতা, চিঠিতে রোগের সঙ্গে লড়াই করে বাঁচার কথা লেখা থাকত। ছোট্ট একটা মেয়ের এমন ইতিবাচক মনোভাব ও মনোবল মুগ্ধ করেছিল বিশ্ববাসীকে। বিশ্বের সমস্ত ক্যানসার আক্রান্তদের কাছে মেলিন্ডা আজও জীবন্ত উদাহরণ। তাকে বাঁচিয়ে রাখতেই এই গোলাপ দিবসের ভাবনা।
দুরারোগ্য ক্যানসারও দমিয়ে রাখতে পারেনি
দুরারোগ্য অসুখ এক সময় স্তব্ধ করে দিতে চেয়েছিল তাঁর জীবনের পথ। দিনরাত বিছানায় শুয়ে শুয়ে নিজের মেক আপ ভ্যান, শুটিং ফ্লোর, স্বামী ও ছেলের কথাই ভাবতেন, সেই যুদ্ধ জয় করেছিলেন নব্বইয়ের দশকে জনপ্রিয় অভিনেত্রী সোনালী বেন্দ্রে। মনের জোর ও সাহসকে অবলম্বন করে ক্যানসার জয়ীদের তালিকায় এখন উঠে এসেছে তাঁর নামও।
হাসির জন্যই জনপ্রিয় ছিলেন সুন্দরী ও প্রতিভাবান অভিনেত্রী মণীষা কৈরালা। ৪২ বছর বয়সে ডিম্বাশয়ের ক্যানসারে আক্রান্ত হন মণীষা নিজের ইতিবাচক মনোভাবের জোরে মৃত্যুর সঙ্গে লড়াই চালাতে থাকেন। আর এখন ক্যানসার আক্রান্তদের আশার পথ দেখান অভিনেত্রী।
বরফি ছবির প্রতিভাবান পরিচালক অনুরাগ বসু। অনেকেই জানেন না ২০০৪ সালে রক্তের ক্যানসারে আক্রান্ত হয়েছিলেন অনুরাগ বসু। সে বছরই তাঁর প্রথম কন্যা ইশানার জন্ম হয়। ডাক্তারও জানিয়ে দিয়েছিল ২ মাসের বেশি সময় নেই তার কাছে। কিন্তু চিকিৎসকের এই সতর্কবানী টলাতে পারেনি শক্ত মনের মানুষটিকে। সেই সময়ই 'লাইফ ইন মেট্রো' এবং 'গ্যাংস্টার' ছবির চিত্রনাট্য লেখেন অনুরাগ। ৩ বছরের কেমিওথেরাপি এবং ওষুধের পর আবার স্বমহিমায় অনুরাগ বসু।
ক্যানসারের সঙ্গে লড়াই করে তাকে হারিয়ে ফিরে আসার নায়ক অবশ্যই ক্রিকেটার যুবরাজ সিং। বিরল এক মারণ ক্যানসারে আক্রান্ত হয়েছিলেন যুবরাজ। সারা দেশ প্রার্থনা করেছিল যুবরাজের আরোগ্য কামনায়। যুবরাজের হৃদয় আর ফুসফুসের মধ্যে টিউমার তৈরি হয়েছিল এবং তা ক্রমশই বড় হচ্ছিল। কিন্তু যুবরাজ ক্যানসারকে পরাজিত করেন। দ্য টেস্ট অফ মাই লাইফ বইয়ে নিজের অভিজ্ঞতার কথাও বর্ণনা করেছেন যুবরাজ।
ক্যানসার জাল বিস্তার করছে
একটা সময় ক্যানসারের কোনও অ্যানসার ছিল না। এখন আছে। ফুসফুস, ত্বক, অন্ত্র, জরায়ু, প্রস্টেট—মারণ রোগের যে কোনও ধরনেরই চিকিৎসা আছে। তাও কর্কট রোগ তার জাল বিছিয়েই চলেছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সমীক্ষা বলছে, পিছিয়ে পড়া, আর্থিকভাবে অনুন্নত দেশগুলিতে ক্যানসারের প্রকোপ বেড়েছে ৮১ শতাংশ। সেই তালিকায় রয়েছে আমাদের দেশও। রোগ নির্ণয়ে গলদ, চিকিৎসায় খামতি এবং সচেতনতার অভাব যার অন্যতম প্রধান কারণ।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) এবং ইউনিয়ন ফর ইন্টারন্যাশনাল ক্যানসার কন্ট্রোল (UICC)-এর উদ্যোগে প্রতি বছর ৪ ফেব্রুয়ারি বিশ্ব ক্যানসার দিবস হিসেবে পালন করা হয়। ক্যানসার প্রতিরোধের পাশাপাশি প্রাথমিক অবস্থায় ক্যানসার নির্ণয় করার ওপর সচেতনতা বাড়ানোর চেষ্টা এই দিনটির লক্ষ্য। আর গোলাপ দিবসে ক্যানসার রোগীদের যুদ্ধজয়ের পাঠ পরানো হয়। এই দুটি দিনের উদ্দেশ্যই হল, ‘আই অ্যাম অ্যান্ড আই উইল’ (I am and I will)—আমি পারি, এবং আগামী দিনেও পারব, ক্যানসার নামক মারণ রোগকে ভেঙে গুঁড়িয়ে দেওয়ার শপথ নেওয়া।