
শেষ আপডেট: 11 July 2020 18:30
আরও একটা কারণ আছে। সেটা হল মানুষের খাদ্যাভ্যাস। বন্যপ্রাণীর মাংস খাওয়া অভ্যাসে দাঁড়িয়ে গেছে অনেক দেশেই। শুধু আদিবাসী সমাজে নয়, শহরের বাজারগুলোতেও বন্যপ্রাণীর কাঁচা মাংস দেদাড় বিকোচ্ছে। ইউনাইটেড নেশনস এনভায়রনমেন্ট প্রোগ্রামের সায়েন্টিফিক অ্যাসেসমেন্টের প্রধান মার্টিন কাপ্পেলে বলেছেন, গত ৫০ বছরে বন্য জীবজন্তুর মাংস খাওয়ার প্রবণতা প্রায় ২৬০% বেড়েছে। বিশেষত, ইঁদুর, রডেন্ট জাতীয় ছোট প্রাণী, বাদুড়, সাপ, প্যাঙ্গোলিন-সহ বিরল প্রজাতির প্রাণী হত্যা করেও তার মাংস খাওয়া চলছে। যার কারণেই পশুদের শরীরে বাসা বাঁধা ভাইরাস বা ব্যাকটেরিয়া সহজেই চলে আসছে মানুষের শরীরে।
ভাইরাস সামান্য হোক বা প্রাণঘাতী, তার বিস্তারের জন্য বাহকের দরকার হয় যাকে বলে Reservoir। ভাইরাস কিন্তু এই বাহকের ক্ষতি করে না। বরং তার শরীরকে আশ্রয় করেই বাড়তে থাকে। কিন্তু সেই বাহকের শরীর থেকে ভাইরাল স্ট্রেন যখন মানুষের শরীরে ঢোকে, তখনই তার বিভাজন হতে শুরু করে। জিনের গঠন বদলে সেই ভাইরাল স্ট্রেন হয়ে ওঠে সংক্রামিক। হিউম্যান ট্রান্সমিশন শুরু হয়ে যায়। সার্স, মার্স ও হালে সার্স-কভ-২ ভাইরাসের সংক্রমণ তারই উদাহরণ। বিজ্ঞানীরা বলছেন, বাদুড় থেকেই সার্স-১ ও সার্স-২ ভাইরাসের সংক্রমণ ছড়িয়েছে বলে মনে করা হয়। এই বাদুড় প্রায় ৬৬ রকম ভাইরাসের বাহক। গবেষকরা বলছেন, বাদুড়রা মানুষের সংস্পর্শ সাধারণত এড়িয়েই চলে। তবে যেভাবে জঙ্গল কেটে ফেলা হচ্ছে তাতে তাদের খাদ্যশৃঙ্খলে বড় বাধা পড়ছে। গাছ কাটার ফলে মাথা গোঁজার ঠাঁই মিলছে না। তাছাড়াও মানুষের শিকার, বাদুড় খাওয়ার প্রবৃত্তি নানা কারণে এরা ক্রমশই মানুষের সমাজের কাছাকাছি চলে আসছে। এদের শরীরে লুকিয়ে থাকা ভাইরাসও স্বাভাবিক ভাবেই মানুষের শরীরের মতো উপাদেয় ও বড় আধার খুঁজে নিচ্ছে। দেহকোষের প্রোটিনের স্বাদ পেয়ে ইচ্ছামতো জিনের বদল ঘটিয়ে আরও প্রাণঘাতী হয়ে উঠছে। মানুষের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতার প্রাচীর ভেঙে ফেলে নিজেদের বিকল্প প্রতিরোধ গড়ে তুলছে। বিজ্ঞানীরা বলছেন, হোয়াইট-নোজ সিন্ড্রোম নামে একধরনের রোগ বাদুড়েরও হয়, যেটা মহামারীর আকার নেয়। রোগাক্রান্ত বাদুড়ের সংস্পর্শে আসা প্রাণী বা মানুষের মধ্যেও রোগ ছড়াতে দেরি হয় না।
রেবিস ভাইরাসের বাহক বাদুড়, আবার নিপা ভাইরাসের বাহক তিনরকম বাদুড় যার মধ্যে একটা পরিচিত Pteropus hypomelanus। মারবার্গ ইবোলা ভাইরাসের বাহকও বাদুড়ই। এই বাদুড়দের থেকে মধ্যবর্তী বাহকের মাধ্যমে মানুষের শরীরে সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ার অনেক উদাহরণ আছে। যেমন, সিভেট ক্যাট থেকে সার্স, উঠ থেকে মার্স (মিডল ইস্ট রেসপিরেটারি সিন্ড্রোম), ঘোড়া থেকে হেন্দ্রা ভাইরাস ও অনুমান করা হয় প্যাঙ্গোলিন থেকে কোভিড-১৯।
সম্প্রতি চিনে বিউবনিক প্লেগের আতঙ্ক ছড়িয়েছে। এই প্লেগ ভাইরাসের বাহক ইঁদুর ও রডেন্ট জাতীয় প্রাণী। ইঁদুরের মৃতদেহ, মল-মূত্র থেকে এই ভাইরাস ছড়ায়। যাদের শরীরে বিউবনিক প্লেগের মতো সংক্রমণ ধরা পড়েছিল, তারাও ইঁদুরের মাংস খেয়েছিল বলেই জানা গেছে।
চিনে যেমন খোলা বাজারে বন্যপ্রাণীর মাংস দেদাড় বিক্রি হয়, তেমনি আফ্রিকাতেও বুশমিট বাজারে বন্য জীবজন্তুর কাঁচা মাংস, পোড়া, বা আধপোড়া, কাটাছেঁড়া প্রাণীর দেহ অবাধে বিক্রি হয়। মধ্য ও পশ্চিম আফ্রিকার দেশগুলিতে এই বুশমিট বাজারের চল রয়েছে। গবেষকরা বলেন, বুশমিটের জন্য বন্যপ্রাণী শিকার চলে অবাধে। তারপর সেই প্রাণীর গোটা দেহ বা কাটাছেঁড়া দেহ পুড়িয়ে বিক্রি হয় বাজারে। এই বুশমিট ভাইরাস বা ব্যাকটেরিয়া সংক্রমণের আঁতুরঘর। এমনটাই বলছেন বিজ্ঞানীরা। ইবোলা ভাইরাস উৎপত্তি হয়েছিল এই বুশমিটের বাজার থেকেই। মনে করা হয় ইনফ্লুয়েঞ্জা, সালমোনেলা, এইচআইভি, সার্স, মার্স ভাইরাসের সংক্রমণের পিছনেও এই বুশমিট বাজারই দায়ী। গবেষকদের দাবি, এই সমস্ত প্রাণঘাতী ভাইরাসের সংক্রমণ ছড়িয়েছে বন্য জন্তু থেকে। আর বন্য জন্তুদের সঙ্গে মানুষের সরাসরি যোগাযোগ এমন খোলা বাজার থেকেই। ইন্টারন্যাশনাল ইউনিয়ন ফর কনজারভেশন অব নেচার (আইইউসিএন)-এর রিপোর্ট বলছে, মধ্য ও পশ্চিম আফ্রিকার দেশগুলিতে বছরে ৫০ লক্ষ টনেরও বেশি বন্যজন্তুর মাংস বিক্রি হয়। কঙ্গো, আমাজনের জঙ্গল থেকে বন্যপ্রাণী শিকার করে তার মাংস পাচার করা হয় অন্যান্য দেশেও। ২০০৬ সালের একটি সমীক্ষার রিপোর্টে বলা হয়, প্রতি বছর প্রায় ১ লক্ষ ৪৩৭ হাজার ৪৫৮টি প্রাণীকে হত্যা করা হয় এই বুশমিটের জন্য। তাদের মধ্যে রয়েছে বিরল থেকে অতি বিরল প্রজাতির প্রাণীরাও। গবেষকরা বলছেন, বুশমিটের মধ্যে নানারকম প্যারাসাইটেরও খোঁজ মিলেছে যেমন এন্টামোবিয়া, অ্যাসকারিস, ক্যাপিলারিয়া, পিনওয়ার্মস, এন্ডোলিম্যাক্স ইত্যাদি যারা মানুষের শরীরে সংক্রামক রোগ তৈরি করতে পারে।