দ্য ওয়াল ব্যুরো: কোভিড করোনাভাইরাসের জেরে সারা বিশ্ব কার্যত থমকে গেছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন এর ফলে নাকি দূষণের মাত্রা অনেকটাই কমে গেছে। কিন্তু সত্যিই কি তাই? জানেন কি আমরা ঘরে বসে প্রত্যেক দিন দূষিত করে চলেছি মহাসমুদ্র। হ্যাঁ নিজের অজান্তেই।
কোভিড-১৯ থেকে বাঁচার জন্য আধ ঘণ্টা অন্তর হাত ধোয়ার কথা বলা হচ্ছে। শুধু জল দিয়ে নয় সাবান দিয়ে। তবে শুধু সাবান নয়, মাজন থেকে যে কোনও ধরনের প্রসাধনী ব্যবহার করার ফলেও নিয়মিত দূষিত হচ্ছে মহাসাগর। তাতে নষ্ট হতে পারে সমুদ্রের পরিবেশ ও শৃঙ্খলা।
আমরা যে সব জিনিস ব্যবহার করি তার অধিকাংশতেই রয়েছে অতিসূক্ষ্ম প্লাস্টিক। এটাই সবচেয়ে বড় সমস্যা। প্লাস্টিক সর্বত্র ছেয়ে আছে। ঘুম থেকে উঠে যে মাজনে দাঁত মাজছি তাতেও প্লাস্টিক, আবার করোনা থেকে বাঁচতে যে সাবান ব্যবহার করছি তাতেও রয়েছে অতি সূক্ষ্ম প্লাস্টিকের বল। আমরা যখনই হাত ধুচ্ছি তখনই সেই জল বাড়ি থেকে রাস্তার নর্দমা, সেখান থেকে নদী এবং সেখান থেকে গিয়ে পড়ছে সমুদ্রে। স্রোতের টানে তা চলে যাচ্ছে এক মহাসাগর থেকে আর এক মহাসাগরে। প্লাস্টিক সহজে মিশে যায় না পরিবেশের সঙ্গে। কখনও তা মিশতে কয়েক হাজার বছরের বেশি সময় লেগে যেতে পারে। তাই ক্রমেই প্লাস্টিকে ভারী হচ্ছে সমুদ্র। উষ্ণতা বাড়ছে। প্লাস্টিকের ‘ক্যারিব্যাগ’ থেকে বোতল – সবই রয়েছে এই তালিকায়।
বিশ্বের বিভিন্ন জায়গায় সমুদ্রের উপকূলে প্লাস্টিকের ব্যবহার নিষিদ্ধ করা হয়েছে। তা সত্ত্বেও দেখা যাচ্ছে সেখানে এসে পড়ছে বোতল। সেই সব বোতলের গায়ে লাগানো লেবেল থেকে জানা যাচ্ছে তা বিশ্বের অন্য কোনও প্রান্তের। মহাসমুদ্র পাড়ি দিয়ে ভেসে এসেছে।
যেসব মৎস্যজীবী সমুদ্রে মাছ ধরতে যান তাঁরাও সমুদ্র সরাসরি দূষিত করেন। অনেক সময় নষ্ট হয়ে যাওয়া জাল ফেলে দেন সমুদ্রেই। প্লাস্টিকের সেই বিশাল জালে বহুবার জড়িয়ে যায় সামুদ্রিক প্রাণী। তারা জালে জড়িয়ে পড়ে মারা যায়। তবে তার আগে বড় কোনও প্রাণী সেটিকে খেয়ে ফেললে তারও মৃত্যু ঘটে। প্রবালপ্রাচীর বা কোরাল রিফ যে ধ্বংস হচ্ছে তার অন্যতম কারণ হল এই প্লাস্টিকের দূষণ। কোলার রিফ নষ্ট হয়ে গেলে সমুদ্রের জীবনে বড় প্রভাব পড়বে বলে আশঙ্কা করছেন বিজ্ঞানীরা।
সমুদ্রের দূষণে বাড়ছে তাপমাত্রা। তাতে গলছে দুই মেরুপ্রদেশের বরফ। এর ফল কী হতে পারে তা আন্দাজ করে ২০০৯ সালে ভারত মহাসাগরের নীচে মন্ত্রিসভার বৈঠক করেছিল মালদ্বীপ, কারণ ভবিষ্যতে ডুবে গেলে তো সমুদ্রের নীচেই থাকতে হবে! টুভ্যালু নামে ছোট্ট একটি দেশে ২০০২ সালে কার্বন নির্গমনের প্রতিবাদ করে অস্ট্রেলিয়ার বিরুদ্ধে মামলা পর্যন্ত করেছিল। তাদের আশঙ্কা ছিল সমুদ্রের জলস্তর বেড়ে গেলে পঞ্চাশ বছরের মধ্যে যে সব দ্বীপ সমুদ্রে হারিয়ে যেতে পারে তার মধ্যে টুভ্যালুও রয়েছে।
বছর খানেক আগের একটি ঘটনার কথা স্মরণ করা যাক। থাইল্যান্ডের উপকূলে এসে হাজির হয় একটি মৃতপ্রায় তিমি। সেটিকে বাঁচানো যায়নি। মরে যাওয়ার পরে তার পেট কেটে দেখা যায় পাকস্থলী ভরে রয়েছে প্লাস্টিকে। পেট ভর্তি থাকলেও সে মরেছে অনাহারে। এক ধরনের সামুদ্রিক কচ্ছপের প্রিয় খাদ্য হল জেলিফিশ। অনেক সময় তারা জেলিফিস ভেবে ভুল করে প্লাস্টিকের ভাসমান ব্যাগ খেয়ে ফেলে। ওই তিমির মতো মৃত্যু হয় তাদেরও। ফলে প্লাস্টিকের জন্য ডুবতে বসেছে পুরো বিশ্ব।
হাত ধোয়া বন্ধ করা যাবে না। দাঁতও মাজতে হবে। সঙ্গে ভাবতে হবে প্লাস্টিক আবিষ্কার হওয়ার আগেও তো এসব ছিল। তখন যেভাবে সাবান-মাজন তৈরি হত এখনও সেই ভাবে করা যায় কি?