দ্য ওয়াল ব্যুরো: চিটফান্ড মামলার তদন্তে সিবিআইয়ের সঙ্গে তারা পূর্ণ সহযোগিতা করেছিল বলে সম্প্রতি সুপ্রিম কোর্টে দাবি করেছিল রাজ্য সরকার। কিন্তু সিবিআই সেই দাবি শুধু খারিজই করছে না, কেন্দ্রীয় এই তদন্ত এজেন্সির দাবি, বৃহত্তর ষড়যন্ত্রের অংশীদার ছিল খোদ এসআইটি। এবং এও বলা যেতে পারে যে, সারদা-রোজভ্যালি-টাওয়ার ইত্যাদির মতো কিছু চিটফান্ড সংস্থাকে আড়াল করতে এসআইটি-কে ব্যবহার করা হয়েছিল। শোনা যাচ্ছে, ২৭ ফেব্রুয়ারি সুপ্রিম কোর্টে শুনানির সময় এই অভিযোগ আরও স্পষ্ট ভাবে জানাবে সিবিআই।
প্রসঙ্গত, চিটফান্ড মামলার তদন্তের জন্য গোড়ায় স্পেশাল ইনভেস্টিগেটিং টিম তথা এসআইটি গঠন করেছিল মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় সরকার। যে এসআইটি-র অন্যতম সদস্য ছিলেন বিধাননগরের তৎকালীন পুলিশ কমিশনার রাজীব কুমার। পরে সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশে সিবিআই তদন্ত শুরু করে। এবং সেই সিবিআইয়েরই দাবি, সর্ষের মধ্যেই নাকি ভূত ছিল। তদন্তের পরিবর্তে তথ্য ও প্রমাণ লোপাট করেছিল এসআইটি।
গত ১৮ ফেব্রুয়ারি সুপ্রিম কোর্টে একটি সাপ্লিমেন্টরি এফিডেভিট পেশ করেছে সিবিআই। সিবিআই সূত্রে শোনা যাচ্ছে, তদন্তে নেমে তাঁদের অফিসাররা জানতে পারেন, চিটফান্ডের তদন্তে রাজ্যের তদন্ত টিম অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং মৌলিক কিছু তথ্য ও প্রমাণ সংগ্রহ করেছিল। যার মধ্যে ছিল, ল্যাপটপ, মোবাইল ফোন ইত্যাদি। রাজীব কুমারের সরাসরি তত্ত্বাবধানে ওই তদন্ত চলছিল। এবং আশ্চর্যজনক ঘটনা হল, সারদা কাণ্ডে মূল অভিযুক্তকে ওই সব ল্যাপটপ, মোবাইল ফেরত দিয়ে দিয়েছিল রাজীব কুমারের নেতৃত্বাধীন এসআইটি। সেগুলির ফরেনসিক পরীক্ষা না করেই মূল অভিযুক্তকে যে ভাবে ফেরত দেওয়া হয় তাতেই স্পষ্ট যে, বৃহত্তর ষড়যন্ত্রের শরিক ছিল এসআইটি। সিবিআইয়ের হাতে তদন্ত হস্তান্তরের আগেই জেনেবুঝে তথ্য ও প্রমাণ লোপাট করা হয়েছিল।
ইতিমধ্যেই কলকাতার সদ্য প্রাক্তন পুলিশ কমিশনার রাজীব কুমার সুপ্রিম কোর্টে হলফনামা পেশ করেছেন। রাজ্য সরকারের দাবি, রাজীব কুমার এসআইটি-র নেতৃত্ব দেননি। চিটফান্ড মামলার তদন্ত হয়েছিল বিভিন্ন থানা স্তরে।
কল ডিটেলস রেকর্ডে কারচুপি
সিবিআই সূত্রে অবশ্য শোনা যাচ্ছে, চিটফান্ড তদন্তে একাধিক বিষয়ে রাজীব কুমারের বিরুদ্ধে তারা অভিযোগ করতে চলেছে সুপ্রিম কোর্টে। এবং মূল অভিযোগই হল, চিটফান্ড তদন্তের তথ্য ও প্রমাণ লোপাটের। সিবিআইয়ের বক্তব্য, সর্বোচ্চ আদালতের নির্দেশে ২০১৪ সালের ৯ মে চিটফান্ড তদন্তের ভার পেয়েছিল তারা। কিন্তু তার পর থেকে ধারাবাহিক ভাবে অনুরোধ করার পর সবে ২০১৮ সালের ২৮ জুন সিবিআই-কে কল ডিটেলস রেকর্ড (সিডিআর) হস্তান্তর করেছিলেন রাজীব কুমার। অর্থাৎ তাঁদের অভিযোগ, কল রেকর্ড দিতেই চার বছরের বেশি সময় নেন রাজীব। দ্বিতীয়ত, যে সিডিআর দেওয়া হয়েছিল সিবিআইকে-তাতেও কারচুপি করা হয়েছিল বলে কেন্দ্রীয় এই তদন্ত এজেন্সি সূত্রে শোনা যাচ্ছে। সিবিআই নাকি তা হাতেনাতে ধরেও ফেলেছে। কারণ, মোবাইল সার্ভিস প্রোভাইডারদের কাছ থেকে সিবিআই পৃথক ভাবে সিডিআর সংগ্রহ করে। এবং দুটি রেকর্ড পাশাপাশি রেখে দেখা যায়, রাজীব কুমার যে সিডিআর তাদের দিয়েছিলেন তাতে কারচুপি করা হয়েছে।
নিখোঁজ ডায়েরি
সিবিআই সূত্রে আরও শোনা যাচ্ছে, রাজ্য পুলিশ তথা এসআইটি তদন্তের সময় একটি চিটফান্ড সংস্থার ডায়েরি উদ্ধার করেছিল। তাতে বিভিন্ন লেনদেনের হিসাব লেখা ছিল। কিন্তু বারবার অনুরোধ করা সত্ত্বেও এসআইটি সেই ডায়েরি সিবিআইকে হস্তান্তর করেনি। সংশ্লিষ্ট থানাও জানিয়ে দেয় যে চিটফান্ড তদন্তের সময়ে তারা এরকম কোনও ডায়েরি পায়নি। যা কিনা সর্বৈব মিথ্যা বলে অভিযোগ সিবিআইয়ের।
আরও পড়ুন:
ভয়ানক-এর সঙ্গে সয়ানক ও স্বার্থানক, দিদির বক্তৃতায় কথার তোড়ে অচেনা শব্দ
রোজভ্যালি মামলা গোপন করা
সিবিআই সূত্রে আরও জানা গিয়েছে, ৬ বছর আগে দুর্গাপুর থানায় রোজভ্যালি চিটফান্ডের বিরুদ্ধে একটা মামলা হয়েছিল। তদন্ত হস্তান্তরের সময় সেই তথ্য গোপন করে গিয়েছিল এসআইটি। সেই কারণে বাংলায় রোজভ্যালির বিরুদ্ধে তখন কোনও মামলা দায়ের করতে পারেনি সিবিআই। পরিবর্তে ওড়িশায় রোজভ্যালির বিরুদ্ধে মামলা করা হয়েছিল। সিবিআই সূত্রে খবর, আসলে পুলিশ ও চিটফান্ড সংস্থাগুলির মধ্যে যোগসাজস ছিল। সারদা, রোজভ্যালি, টাওয়ারের মতো বেছে বেছে কিছু চিটফান্ড সংস্থাকে আড়াল করতে এসআইটি-কে ব্যবহার করা হয়েছিল বলে তাদের অভিযোগ।
বৃহত্তর ষড়যন্ত্র, টিভি চ্যানেল ও মুখ্যমন্ত্রীর আঁকা ছবি
সিবিআই সূত্রে শোনা যাচ্ছে সুপ্রিম কোর্টে শুনানির সময় চিটফান্ড কাণ্ডে ‘বৃহত্তর ষড়যন্ত্র’ প্রমাণ করার জন্য আরও কিছু তথ্য তুলে ধরতে পারে তারা। যেমন, মুখ্যমন্ত্রীর ত্রাণ তহবিল থেকে ৬ কোটি ২১ লক্ষ টাকা দেওয়া হয়েছিল ‘তারা টিভি’-কে। মাসে ২৭ লক্ষ টাকা করে ২৩ মাস ওই টাকা দেওয়া হয়। অথচ তারা টিভি সারদা চিটফান্ড সংস্থার অধীনে ছিল। এ ব্যাপারে সবিস্তারে জানতে চেয়ে সিবিআইয়ের তরফে রাজ্যের মুখ্য সচিবকে গত অক্টোবর মাসে একটি চিঠি দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু এখনও তার জবাব পায়নি সিবিআই।
দ্বিতীয়ত, তৃণমূলের মুখপত্র ‘জাগো বাংলা’ মুখ্যমন্ত্রীর আঁকা ছবি বহু কোটি টাকায় বিক্রি করেছিল। সিবিআই সূত্রে শোনা যাচ্ছে, আনুমানিক প্রায় সাড়ে ৬ কোটি টাকায় ছবিগুলি বিক্রি করা হয়। সিবিআইয়ের অভিযোগ, ওই ছবিগুলি বিভিন্ন চিটফান্ড সংস্থার মালিক বা ডিরেক্টররা কিনেছিল। হতে পারে তাদের বিরুদ্ধে পুলিশ তথা এসআইটি-র তদন্ত বন্ধ করতেই ছবি কিনেছিল তারা। এ ব্যাপারে আরও তদন্ত চলছে বলে আদালতে জানাতে পারে সিবিআই।
সূত্রের খবর, সিবিআইয়ের সাপ্লিমেন্টারি হলফনামার পাল্টা হিসাবে সোমবার একটি হলফনামা পেশ করেছে রাজ্য সরকার। রাজ্যের দাবি, সর্বোচ্চ আদালত যেন সিবিআইয়ের থেকে আর কোনও সাপ্লিমেন্টারি এফিডেভিট গ্রহণ না করে। সব মিলিয়ে দুই পক্ষের আইনি দ্বৈরথ এখন প্রায় চরমে পৌঁছেছে।
সার্বিক এই পরিস্থিতিতে সিবিআই বনাম রাজ্য সরকার মামলাটি নিয়ে আগামী বুধবার ২৭ ফেব্রুয়ারি সুপ্রিম কোর্টে শুনানি হওয়ার কথা।
(মঙ্গলবার পড়ুন: সিবিআইয়ের তোপে বাম জমানাও)
https://thewall.in/news-state-unknown-bengali-words-in-mamatas-speech/
https://thewall.in/news-state-dilip-ghosh-said-mamata-banerjee-indulges-in-horse-trading-not-bjp/