দ্য ওয়াল ব্যুরো: সালটা ২০১২। সে বার গোয়ায় অনুষ্ঠিত হচ্ছে বিজেপি-র জাতীয় কর্মসমিতির বৈঠক। লালকৃষ্ণ আডবাণী, সুষমা স্বরাজরা চোদ্দর ভোটে প্রধানমন্ত্রী পদপ্রার্থী হওয়া থেকে আটকাতে চেয়েছিলেন নরেন্দ্র দামোদরদাস মোদীকে। কিন্তু তামাম সঙ্ঘ পরিবার মোদীর পিছনে দাঁড়িয়ে পড়ায় তিনিই হন প্রধানমন্ত্রী পদপ্রার্থী। আর উনিশের ভোটের কয়েক মাস আগে, সেই সঙ্ঘ নেতাই রাম মন্দির ইস্যুতে তোপ দাগলেন মোদী সরকারের বিরুদ্ধে। একেবারে মোদীর রাজ্যপাটের সদর দিল্লির রামলীলা ময়দানে দাঁড়িয়ে।
বিশ্বহিন্দু পরিষদ রামলীলা ময়দানে মেগা মিটিং-এর ডাক দিয়েছিল রবিবার। হিন্দুত্ববাদী এই সংগঠনের ডাকে কয়েক হাজার মানুষের জমায়েত হয়েছে রাজধানীর এই মাঠে। দাবি একটাই, লোকসভার সামনের শীতকালীন অধিবেশনে আইন পাশ করিয়ে অযোধ্যায় রামমন্দির নির্মাণ করতে হবে। ভিএইচপি-র এই সমাবেশে রবিবার বক্তৃতা দিতে গিয়ে মোদী সরকারের বিরুদ্ধে তীব্র আক্রমণ শানালেন বর্ষীয়ান সঙ্ঘ নেতা সুরেশ ভাইয়াজি যোশী।
ভাইয়াজি এ দিন বলেন, “আজকে যাঁরা সরকার চালাচ্ছেন, তাঁরা কথা দিয়েছিলেন ক্ষমতায় এলে রাম মন্দির নির্মাণ করবেন। মানুষের দাবি তাঁদের পূরণ করতেই হবে।” বিজেপি-র নাম না করে তিনি আরও বলেন, “আমরা কোনও ভিক্ষে চাইছি না। এটা আমাদের আবেগ। দেশ রামরাজ্য চায়।”
প্রসঙ্গত, সপ্তাহ দুয়েক আগেই ভিএইচপি-সহ বেশ কিছু হিন্দুত্ববাদী সংগঠন ধর্মসভার আয়োজন করেছিল খোদ অযোধ্যায়। সেই কর্মসূচিকে সমর্থন জানাতে সপরিবারে অযোধ্যায় পৌঁছেছিলেন শিবসেনা প্রধান উদ্ধব ঠাকরে। মহারাষ্ট্রের রাজনীতিতে একদা বিজেপি-র জোট সঙ্গী হলেও ইদানীং তাঁদের সম্পর্কে ফাটল ধরেছে। উদ্ধবও সেখানে গিয়ে রাম মন্দির ইস্যুতে তোপ দেগেছিলেন মোদী-শাহদের বিরুদ্ধে। অযোধ্যায় ধর্মসভার পর এ বার রাজধানীতে রামমন্দির ইস্যুতে সমাবেশ করে বিজেপি-র উপর চাপ বাড়াতে শুরু করল হিন্দুত্ববাদী সংগঠনগুলি।
অযোধ্যা মামলা আপাতত দেশের শীর্ষ আদালতে বিচারাধীন। দেশের প্রধান বিচারপতি রঞ্জন গগৈ সম্প্রতি একটি নির্দেশে বলেছেন, আগামী জানুয়ারিতে নতুন বেঞ্চ গঠন হবে। তারপর সেই বেঞ্চ ঠিক করবে কবে থেকে হবে বিতর্কিত রামজন্মভূমি মামলার শুনানি। তারপরও শুনানির সময় এগিয়ে আনার জন্য একাধিক সংগঠনের তরফে সুপ্রিম কোর্টে পিটিশন দাখিল করা হয়েছিল। কিন্তু তা বাতিল করে দেন প্রধান বিচারপতি। স্পষ্ট বলে দেন, শীর্ষ আদালতের শুধু একটি মামলা নিয়ে পড়ে থাকলেই চলবে না। সব মামলাই আদালতের কাছে গুরুত্বপূর্ণ। ২০১০ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর এলাহাবাদ হাইকোর্ট রায় দিয়েছিল, অয্যোধ্যার বিতর্কিত জমিকে তিন ভাগে ভাগ করার। একভাগ রামলালা, একভাগ নির্মোহী আখড়া ও একভাগ সুন্নি ওয়াকফ বোর্ডের মধ্যে ভাগ করে দিতে হবে । তার পরেই সুপ্রিম কোর্টে একাধিক সংগঠন ওই রায়ের বিরুদ্ধে আবেদন জানায়।
আইনজ্ঞদের মতে, জানুয়ারিতে বেঞ্চ গঠন হয়ে শুনানি শুরু হলেও উনিশের লোকসভা ভোটের আগে রামমন্দির নিয়ে রায় দেওয়া সম্ভব নয়। রাজনৈতিক মহলের অনেকের মতে, রাম মন্দির ইস্যু বিজেপি-র কাছে ব্যুমেরাং হচ্ছে। কারণ, মতাদর্শগত বন্ধুরাই আজ কেন্দ্রের শাসক দলের বিরুদ্ধে সুর চড়াতে শুরু করেছে। আবার অনেকের মতে, এ সবই গটআপ। বিজেপি কেন্দ্রের শাসক দল হয়ে আদালতের বিরুদ্ধে কিছু বলতে পারছে না বলে, অন্য সংগঠনগুলিকে রাস্তায় নামিয়ে দিয়েছে। যাতে ধর্মীয় ভাবাবেগকে উস্কে দিয়ে আদালতের উপর ঘুরিয়ে চাপ তৈরি করা যায়। সেই সঙ্গে, এই হাওয়া জারি রাখলে ধর্মীয় মেরুকরণের রাজনীতিই তীব্র হবে ভোটের আগে। বিশ্বহিন্দু পরিষদ তো আর ভোটে লড়বে না। ভোটে দাঁড়াবে বিজেপি-ই। তাই গভীরে গিয়ে দেখলে বোঝা যাবে, আসলে ভিএইচপি বা সঙ্ঘনেতাদের এই বক্তব্য থেকে ভোটের বাক্সে লাভ হবে পদ্ম শিবিরেরই।
আগামী কাল অর্থাৎ সোমবার দিল্লিতে বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলির মেগা বৈঠক হওয়ার কথা। আর তার আগের দিনই রামমন্দির ইস্যুতে সরগরম রাজধানীর রাজনীতি।