কার জিলিপি কত বড়, কেঞ্জাকুড়ায় তারই টক্কর
মৃন্ময় পান, বাঁকুড়া: ভাদ্র সংক্রান্তি মানেই ভোরে স্নান সেরে পাত্রে ফুল নিয়ে বা গোবরের উপর ধান ছড়িয়ে ভাদুর রূপ কল্পনা করে তাঁর আরাধনা। মানভূম অঞ্চলে ঐতিহ্য মেনে এ আরাধনায় সামিল হন মূলত কুমারীরাই। ভাদুকে নিয়ে বহু লোককথাও প্রচলিত রয়েছে এই এল
শেষ আপডেট: 17 September 2018 10:54
মৃন্ময় পান, বাঁকুড়া: ভাদ্র সংক্রান্তি মানেই ভোরে স্নান সেরে পাত্রে ফুল নিয়ে বা গোবরের উপর ধান ছড়িয়ে ভাদুর রূপ কল্পনা করে তাঁর আরাধনা। মানভূম অঞ্চলে ঐতিহ্য মেনে এ আরাধনায় সামিল হন মূলত কুমারীরাই। ভাদুকে নিয়ে বহু লোককথাও প্রচলিত রয়েছে এই এলাকায়। যেমন, পঞ্চকোট রাজ পরিবারের নীলমণি সিংদেওর তৃতীয়া কন্যা ভদ্রাবতীর বিয়ে স্থির হওয়ার পর অকালমৃত্যু হয়েছিল তাঁর ভাবী স্বামীর। এরপরেই শোকে উদভ্রান্ত হয়ে আত্মহত্যা করেন ভদ্রাবতী। ভদ্রাবতীর এই আত্মবলিদান স্মরনীয় করে রাখতেই ভাদুগানের প্রচলন করেছিলেন নীলমনি সিংদেও।
তবে পরিবারের রাজ পুরোহিত রাখালচন্দ্র চক্রবর্তীর পঞ্চকোট ইতিহাসে রাজার দশজন পুত্রসন্তানের উল্লেখ থাকলেও কোনও কন্যার কথা বলা নেই। আবার বীরভূমে, হেতমপুরের রাজার কন্যা হিসেবে কল্পনা করা হয়েছে ভদ্রাবতীকে। বিয়ে ঠিক হওয়ার পর শালের জঙ্গলে ডাকাতদের আক্রমণে বর্ধমানের রাজপুত্রের মৃত্যু হলে সহমরণে গিয়েছিলেন ভদ্রাবতী। কথিত যাই থাক, কালে কালে তিনি লোকদেবী। ভাদ্র সংক্রান্তির আগের রাতে ভাদু জাগরণ হয় গোটা তল্লাট জুড়ে। থালা ভরে মিষ্টি সাজিয়ে দিয়ে শুরু হয় তাঁর আরাধনা। পরের দিন সকালে বাড়ি বাড়ি মেয়েদের আপ্যায়ন করা হয় মিষ্টির থালা সাজিয়ে। তারপর ভাদু বিসর্জনের পালা।
https://www.youtube.com/watch?v=5SIjkO0Zmrs
এই লোক উৎসবকে ঘিরেই বাঁকুড়ার কেঞ্জাকুড়া মেতে ওঠে অন্য উৎসবে। আর তা হল জিলিপির উৎসব। প্রতিবছর ভাদ্র সংক্রান্তির আগের রাতে যখন বাড়ি বাড়ি চলে ভাদু জাগরণের পালা, তখন কেঞ্জাকুড়া ব্যস্ত হয়ে পড়ে জিলিপির মেলায় পসরা সাজাতে। বিশাল আকৃতির সব কড়াইয়ে বিশাল বিশাল জিলিপি তৈরিতে নাওয়া খাওয়া ভোলেন কারিগররা। রাতভরই মানুষের আনাগোনা লেগে থাকে মেলায়। আসেন ভিন জেলার মানুষও। মুচমুচে জিলিপিতে রসনা তৃপ্তির পাশাপাশি পরিজনদের জন্যেও নিয়ে যান অনেকেই।

অভিনব এই জিলিপি মেলায় কার তৈরি জিলিপি কত বড়, সে নিয়ে বিক্রেতাদের মধ্যে চলতে থাকে সুস্থ প্রতিযোগিতা ।বিউলির বেসন, চাল গুঁড়ো, ময়দায় তৈরি বনস্পতিতে ভাজা জিলিপির এক একটির ওজন কম করে তিন থেকে চার কেজি। কারিগর মন্টু চন্দ, রাজু প্রামাণিকরা জানান, তাঁদের বাপ-ঠাকুরদার আমলেও এমনই ভাবে ভাদু পরবে এই মেলা চলেছে বলে শুনেছেন তাঁরা। এমন বড় জিলিপি জেলার আর কোথাও তৈরি হয় না বলেই দাবি তাঁদের।
বাঁকুড়া বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের অধ্যাপক অরবিন্দ চট্টোপাধ্যায় এই বিশালাকার জিলিপি তৈরির গল্প লোককথাতেই লুকিয়ে রয়েছে বলে মনে করেন। তিনি বলেন, ‘‘মূলত ভাদু পুজো উপলক্ষে এই জিলিপি তৈরি হয়। ভাদুকে থালা ভর্তি মিষ্টি দেওয়াই রীতি । কিন্তু নানা রকমের মিষ্টি দিয়ে ভাদুকে নৈবেদ্য দেওয়া সেই সময় যথেষ্ট খরচসাপেক্ষ ছিল। একটি থালার আকারে জিলিপি তৈরি করে ভাদুকে নিবেদন করতেই এমন ভাবনা।’’
কারণ যাই হোক, মেলায় সাজানো রসে টইটম্বুর এই জিলিপির পসরাই কেঞ্জাকুড়ার ভাদু উৎসবকে চিনিয়ে দেয় আলাদা করে। সেই আশ্বিন সংক্রান্তি পর্যন্ত চলে কেঞ্জাকুড়ার জিলিপি মেলা।