বুদ্ধদেব বেরা, ঝাড়গ্রাম: প্রতিদিন জঙ্গলে যেতে হয়। না হলে পেট চলে না। মাসখানেক আগে তেমনই জঙ্গলে গিয়ে চোখে কাঁটার খোঁচা খেয়েছিলেন জঙ্গলখাস গ্রামের খুদা শবর। তারপর থেকেই চোখে জল পড়ে। লাল হয়ে থাকে চোখ। যন্ত্রণা হয়। সেই চোখে পথ চিনেই প্রতিদিন জঙ্গলে যান তিনি। কুড়িয়ে আনেন কাঠ, লতাপাতা।
বছর ষাটেকের খুদা শবরের স্ত্রী মিতা শবর শোনাচ্ছিলেন সেই গল্প। গল্প বলতে তাঁদের প্রতিদিনের ধিকি ধিকি বেঁচে থাকার গল্প। ঘরের মানুষটার চোখে কষ্ট হচ্ছে, কিন্তু স্ত্রী হিসেবে কীই বা করতে পারেন তিনি ? ডাক্তার-ওষুধ জোগাড়ের কথা দিন আনি দিন খাই সংসারে কোনও দিন ভাবতেই পারেননি।
সরকারি স্বাস্থ্যকেন্দ্রে তো নিয়ে যেতে পারেন?
“যে দিন যাবে সে দিন তো আর জঙ্গলে যাওয়া যাবে না। ও তো খোলেও না প্রতিদিন।”
জানা গেল, জঙ্গলখাস গ্রামের সব থেকে কাছে তাড়কি প্রাথমিক স্বাস্থ্যকেন্দ্র। দূরত্ব তিন কিলোমিটার। কিন্তু সপ্তাহে দু দিনের বেশি সে স্বাস্থ্যকেন্দ্রের দরজা খোলে না। লালগড় ব্লক হাসপাতালে যেতে গেলে পেরোতে হয় পাঁচ কিলোমিটার রাস্তা। খুব কিছু ভারি অসুখ হলে সেখানে যাওয়ার প্রশ্ন। রোগ যখন নাগালে তখন ভরসা পাশের গ্রামের ‘কোয়াক ডাক্তার’ ছোটন মাহাতো। তাও হাতে ওষুধ কেনার মতো টাকা থাকলে তবেই। না হলে শুধু ঘরে বসে সেরে ওঠার অপেক্ষা।
গ্রামের শবর পরিবারগুলির যে সাতজন মারা গিয়েছেন, তাঁরা অধিকাংশই খুদা আর মিতার জ্ঞাতি। এতদিন শুধু তাঁদের মতো এ জানতেন ঘরে ঘরে এই মৃত্যুর খবর। সোমবারের পর সে খবর শবর পাড়ার বাইরে যায়। কেন পরপর মৃত্যু তাঁর কারণ জানতে আজ সকালেই জেলাশাসক আয়েষা রানি ঘটনাস্থলে যান। অনুন্নত এই এলাকায় পুনরাবৃত্তি ঘটলো আমলাশোলের? অর্থাৎ মৃত্যুর কারণ অনাহার? না কি বিষ মদ। কারণ মৃত্যুর কারণ হিসেবে অনেকে ততক্ষণে বিষমদকেও কাঠগড়ায় তুলেছে। তবে আজ জেলাশাসক গ্রামে গিয়ে জানতে পারেন বহু দিন ধরে রোগে ভুগেই মৃত্যু হয়েছে ওই সাতজনের।
২৮ বছরের যুবক মগলু শবরের বাবা জানান, দীর্ঘদিন ধরে টিবি রোগে ভুগছিলেন তাঁর ছেলে। হাতে টাকা থাকলে কখনও সখনও চিকিৎসা হয়েছে। বললেন, “হাসপাতালে নিয়ে গিয়েছি দু-চারবার। যেতেও তো খরচা লাগে।”
জন্ডিসে স্বামীর মৃত্যু হয়েছে বলে জানালেন মৃত কৃষ্ণ শবরের স্ত্রী খুকুমনি শবর। বললেন, “পেটে খুব যন্ত্রণা হতো। এখানে দুয়েকবার ডাক্তার দেখিয়েছি। পেট ফুলে যাওয়ায় লালগড়ে নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছিল। কিন্তু জোর করে বাড়ি চলে এল।” শুধু কৃষ্ণ নয় জানা গিয়েছে মৃতদের মধ্যে সুধীর শবর সহ আরও বেশ কয়েকজন ভুগছিলেন জন্ডিসে।
জন্ডিসতো অনেকক্ষেত্রেই জলবাহিত। বাড়ি বাড়ি ঘুরে পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে কথা বলার সময় জেলাশাসক জানতে পারেন গ্রামে দুটি মাত্র কুয়ো। তার জলই খান গ্রামের মানুষ। সেই জল পানের যোগ্য কি না তা ভেবে দেখার মতো সচেতনতা নেই কোনও স্তরেই।
‘অনাহার’ এর জন্য মৃত্যু এমনটা হয়তো সরাসরি বলা যাবে না, কিন্তু অজস্র অভাবের নাগপাশে যে ওরা দিশাহারা, তা বলার অপেক্ষা রাখে না।