দ্য ওয়াল ব্যুরো: 'হোলিকা দহন' অনুষ্ঠানে এ বার পোড়ানো হলো মাসুদ আজহারের কুশপুতুল। দোল বা হোলির আগের রাতেই অশুভ শক্তির বিনাশ করতে এই 'হোলিকা দহন'-এর আয়োজন করা হয়। সাধারণত 'দশেরার' মতোই এই অনুষ্ঠানেও রাবণের পুতুলই পোড়ানো হয়। তবে এ বার 'হোলিকা দহন'-এ পোড়ানো হলো জঙ্গি সংগঠন জইশ-ই-মহম্মদের প্রধান মাসুদ আজহারের অনুকরণে বানানো পুতুল।
মুম্বইয়ের ওরলিতে স্থানীয় বাসিন্দারা আয়োজন করেছিলেন এই 'হোলিকা দহন'-এর। সাদা কুর্তা-পাজামা পরা মাসুদ আজহারের একটি বিশাল পুতুলের গায়ে সেঁটে দেওয়া হয়েছিল হিন্দিতে টেরোরিস্ট লেখা একটি লেবেল। খেলনা রাইফেল হাতে দাঁড়ানো মাসুদের পুতুলের গায়ে বেঁধে দেওয়া হয়েছিল একটি রকেট জাতীয় আতসবাজি। তারপর পুড়িয়ে দেওয়া হয় মাসুদের ওই প্রতিকৃতি। জইশ প্রধানের পুতুল পোড়ানোর সময় উপস্থিত সবার মুখেই ছিল 'বন্দে মাতরম' স্লোগান।
মুম্বইয়ের আর একটি অংশে বনফায়ারের আয়োজন করেছিলেন শিব সেনার নেতা রাহুল শেহওয়ালা। আর সেখানে শুধু মাসুদ আজহার নয়, পোড়ানো হয়েছে আন্ডারওয়ার্ল্ড ডন দাউদ ইব্রাহিম এবং ২০০৮ সালে মুম্বই হামলার মাস্টারমাইন্ড হাফিজ সঈদের ছবিও। শেহওয়ালের কথায়, "অশুভ শক্তির বিনাশ প্রয়োজন। সেই জন্যই এদের ছবি পোড়ানো হয়েছে।" তিনি আরও বলেন, "পুলওয়ামা হোক বা অন্য কিছু, এখনও পর্যন্ত ভারতে যত হামলা হয়েছে তার পিছনে রয়েছে এই তিনজনই। অবিলম্বে এদের ভারতের হাতে তুলে দেওয়া উচিত। এবং এদের জেরা করা উচিত।" মুম্বইয়ের আর একটি জায়গায় পাকিস্তানের যুদ্ধবিমান এফ-১৬-এর প্রতিকৃতিও পোড়ানো হয়েছে।
গত ১৪ ফেব্রুয়ারি দক্ষিণ কাশ্মীরের পুলওয়ামা জেলার অবন্তীপোরার কাছে লেথপোরায় জম্মু-শ্রীনগর হাইওয়েতে সিআরপিএফ-এর কনভয়ে অতর্কিতে হামলা চালায় আত্মঘাতী জঙ্গিরা। ৭৮টি ট্রাকে করে হাজার দুয়েক সেনাকে তখন স্থানান্তর করা হচ্ছিল। বেশিরভাগই ফিরছিলেন ছুটি কাটিয়ে। কেউ বা ক’দিন পর ছুটি নেবেন। কারও আবার কয়েকমাসের মধ্যেই অবসর। ফিদায়েঁ জঙ্গি হানায় মুহূর্তেই ছিন্নভিন্ন হয়ে যায় ৪০জন সিআরপিএফ জওয়ানের দেহ। পরে সেনা সূত্রে জানা যায়, আরও অনেকেই শহিদ হয়েছেন এই হামলায়। আহত হয়েছেন অসংখ্য জওয়ান।
এই ফিদায়েঁ হামলার পরেই দায় স্বীকার করে পাকিস্তানের মদতপুষ্ট জঙ্গি সংগঠন জইশ-ই-মহম্মদ। আর এই হামলার পর থেকেই মাসুদ আজহারকে আন্তর্জাতিক জঙ্গি হিসেবে চিহ্নিত করার জন্য উদ্যত হয়েছে বিশ্বের বিভিন্ন দেশ। রাষ্ট্রপুঞ্জের নিরাপত্তা পরিষদে এই প্রস্তাবও এনেছে আমেরিকা, ফ্রান্স, ব্রিটেন, জার্মানি। কিন্তু বেঁকে বসে চিন। চতুর্থবারের জন্য তাদের ভেটোয় মাসুদের আন্তর্জাতিক জঙ্গি হিসেবে চিহ্নিতকরণ আটকে যায়। তবে চিনের এ হেন সিদ্ধান্ত ফ্রান্স খুশি নয় তা স্পষ্ট করে দেয় বুঝিয়ে দেয় তারা। ইতিমধ্যেই মাসুদ আজহারের সমস্ত সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে ইম্যানুয়েল ম্যাক্রোঁ-র সরকার। এবং ইউরোপের বাকি দেশগুলির কাছেও এই প্রস্তাব রাখবে তারা। এর পাশাপাশি প্যারিস প্রশাসন জানিয়ে দিয়েছে, সন্ত্রাস দমনে সবরকম ভাবে ভারতের পাশে রয়েছে তারা।
এই ঘটনার পর খানিক সুর নরম করে চিনও। ভারতে নিযুক্ত চিনের রাষ্ট্রদূত লুয়ো ঝাওহুই (Luo Zhaohui) আশ্বাস দিয়ে বলেন, “কিছু পদ্ধতিগত কারণে মাসুদের আন্তর্জাতিক জঙ্গি হিসেবে চিহ্নিত হওয়া আটকে রয়েছে। বিশ্বাস রাখুন। এই সমস্যার দ্রুত সমাধান হবে।” এই আশ্বাসের পাশাপাশি লুয়ো আরও বলেন, “মাসুদ প্রসঙ্গে ভারতের উদ্বেগ আমরা সম্পূর্ণ ভাবে বুঝি।”
এর আগে ২০০১ সালে কাশ্মীরের বিধানসভায় জঙ্গি হামলার পিছনেও ছিলেন মাসুদ। এই হামলায় ৩০ জন নিহত হয়েছিলেন। ভারতের সংসদেও হামলা চালায় জইশ জঙ্গিরা। ২০১৬ সালে পাঠানকোট বায়ুসেনা শিবির এবং ২০১৮ সালে উরির সেনা ছাউনিতেও হামলা চালিয়েছিল মাসুদ আজহারের জঙ্গি সংগঠন জইশ-ই-মহম্মদ।