তার বয়স মাত্র দশ। যেমন তুখোড় তার হাতের লেখা, তেমনি সুন্দর তার হাতে ছবি আঁকা। ভাস্কর্য তৈরিতেও কম যায় না সে। আর সেই সুন্দর হাতের লেখার জোরেই সম্প্রতি জাতীয় পুরস্কার পেল ছোট্টো সারা হিনেসলি। কিন্তু আসলে, সারার জন্য 'হাতের লেখা' শব্দটাই একটা অবাস্তব ব্যাপার। কারণ আজন্ম দু'টি হাত পুরোপুরি নেই এই ছোট্টো মেয়েটির!
"আমি এই মেয়েটির মুখে কখনও কোনও কিছুতেই 'পারব না' কথাটা শুনিনি। ও আমাদের রকস্টার। তুমি ওকে যা-ই দাও, ওকে যেকানেই ফেলে দাও, ও সেখানে ওর সেরাটাই দেবে, আর সেখান থেকে সেরা জিনিসটাই বার করে আনবে।"-- বলছিলেন সারার ক্লাস থ্রি-র শিক্ষক, চেরিল চুরিলা।
আমেরিকার মেরিল্যান্ডের ফ্রেডেরিকের বাসিন্দা, সেন্ট জোন্স রিজিওনাল ক্যাথলিক স্কুলের তৃতীয় শ্রেণির ছাত্রী সারা 'নিকোলাস ম্যাক্সিম অ্যাওয়ার্ড ২০১৯' পেয়েছে, কার্সিভ রাইটিংয়ের জন্য। এই অ্যাওয়ার্ড প্রতি বছর দু'জন করে স্পেশ্যাল চাইল্ডকে দেওয়া হয়। একটা হাতের লেখার জন্য, আর একটা লেখার বিষয়বস্তুর জন্য। প্রতি বছরই কোনও না কোনও 'প্রতিবন্ধী' শিশু এই অ্যাওয়ার্ড পায়।
এই বছরে সেই তালিকাতেই নাম জুড়ল সারার। তবে অন্য সব প্রতিবন্ধকতাই ছাপিয়ে গেছে তার এই কৃতিত্বে। আজ অবধি কোনও হাত-হীন শিশু 'হাতের' লেখার জন্য পুরস্কারটি পায়নি।
সারার কিন্তু নকল হাতও নেই। কব্জি অবধি এসেই ফুরিয়ে গিয়েছে তার হাত। তার লেখা, আঁকা, কাজ করা-- সমস্তটাই পা দিয়ে, মুখ দিয়ে এবং কব্জি অবধি হাত দু'টো দিয়ে। সারার মা ক্যাথরিন হিনসেলি জানিয়েছেন, সারা কোনও রকম সাহায্য নিতে রাজি হয় না। এমনকী কাজের সুবিধার জন্য কোনও যন্ত্রও ব্যবহার করতে চায় না।
"সব কাজেই ও ওর মতো করে সুবিধাজনক কোনও পদ্ধতি খুঁজে নেয়। ওর মনের জোর খুবই বেশি, ও খুব বুদ্ধিমতী। ও জানে, ও সব পারবে। এবং সেই পারার জন্য ও সব সময়ই নতুন নতুন পথ খোঁজে নানা রকম কাজের। ও ওর মতো করে বাঁচে, ও ওর মতো করে সুন্দর।"-- বলছিলেন ক্যাথরিন।
যেমন লেখার জন্য, হাতের গোড়ার অংশ দু'টি একসঙ্গে করে পেনসিল ধরে সারা। তার পরে ফোকাস করে অক্ষরের আকার, খাঁজ, বাঁকের উপরে। সারা বলে, "কার্সিভ রাইটিং করার সময়ে আমার মনে হয়েছে, আমি ছবি আঁকছি। অক্ষরগুলো এত সুন্দর, আমার খুব ভাল লেগেছে। লেখাও তো এক রকমের শিল্প!"

সারার যখন বছর ছয়েক বয়স, তখন তাকে চিন থেকে আমেরিকায় আনা হয়। তার আগে অবধি মান্দারিন ভাষায় লিখত ও পড়ত সারা। আমেরিকা আসার পর থেকেই শুরু করে ইংরেজি শিখতে। খুব তাড়াতাড়ি শিখেও যায়।
ক্যাথরিন বলেন, "আমরা সব সময়েই ওর ক্ষমতার ওপরে বিশ্বাস রেখেছি। খেয়াল রেখেছি, ও কতটা করতে চায়। ততটাই করতে দিয়েছি ওকে। নিজেদের বিচার চাপিয়ে দিইনি ওর ওপর। আসলে সারা এমন একটি মেয়ে, যার হাবেভাবে ফুটে ওঠে, 'আমি সব করতে পারব'-জাতীয় একটা আত্মবিশ্বাস। ফলে 'ও কি পারবে?'-- এই ধরনের প্রশ্ন আমরা কখনও নিজেদের করার সুযোগই পাইনি!"
সারা ওর আশপাশে ছড়িয়ে থাকা নানা রকম জিনিসের ছবি আঁকতে ভালবাসে। আকাশ, জানলা, টিভি, মা, সূর্যমুখী ফুল-- বাদ নেই কিছুই। সাঁতার কাটতে ভালবাসে সারা। ভালবাসে ওর বোন ভেরোনিকার সঙ্গে খেলতে। স্কুলের দাবা-ক্লাবেও দারুণ তুখোড় সদস্য এই সারা। সারার মা ক্যাথরিনের কথায়, "এমন জিনিস খুব কম আছে, যা ও করতে চায় না।"
তিনি আরও বলছিলেন, "সারা এইটুকু মেয়ে হলে কী হবে, ও যেন নিজেই একটা অনুপ্রেরণা! আমি রোজ অবাক হই ওকে দেখে, ওর চেষ্টা দেখে। ও কী করে সব রকম কাজে ঝাঁপিয়ে পড়ে, কী করে যে সমস্ত বাধাকে তুড়ি মেরে উড়িয়ে দেয়, তা কাছ থেকে না দেখলে বিশ্বাস করার মতো নয়।"
সারার স্কুলের প্রিন্সিপাল ক্যাথি স্মিথ জানিয়েছেন, জুন মাসের ১৩ তারিখে নিকোলাস ম্যাক্সিম ন্যাশনাল অ্যাওয়ার্ড হাতে পাবে সারা। একটি ট্রফির সঙ্গে ৫০০ ডলারের অর্থমূল্যও তুলে দেওয়া হবে সারার হাতে।
সারার কথায়, "আমার খুব ভাল লাগছে। আমার সবই করতে ভাল লাগে। কখনও ভাবিনি, এত বড় পুরস্কার পাব।"