দ্য ওয়াল ব্যুরো: সারা গায়ে র্যাশ। তীব্র প্রদাহ, জ্বর। কখনও হাত, পা, মুখ ও জিভের রঙ বদল। আবার কখনও আচমকাই হৃদস্পন্দন বন্ধ হয়ে যাওয়া, এক বিরল রোগে আক্রান্ত হচ্ছে নিউ ইয়র্কের শিশুরা। তিন শিশুর মৃত্যু হয়েছে ইতিমধ্যেই। তাদের মধ্যেও দেখা দিয়েছিল এইসব উপসর্গ। নিউ ইয়র্কের গভর্নর অ্যান্ড্রু এম কুয়োমো বলেছেন, এমনই এক বিরল রোগে আক্রান্ত হচ্ছে শিশুরা যে রোগের সঙ্গে করোনাভাইরাসের যোগসূত্র রয়েছে। মনে করা হচ্ছে, ভাইরাসের সংক্রমণের পরেই এমন রোগ দেখা দিচ্ছে শিশুদের মধ্যেই।
শহরের ৭৩টি শিশুর মধ্যে দেখা দিয়েছে এমনই সব উপসর্গ। আশ্চর্যের ব্যাপার হল এই শিশুরা সকলেই কোভিড পজিটিভ। নিউ ইয়র্কের স্বাস্থ্য দফতরের মত, প্রাথমিকভাবে মনে করা হচ্ছে শিশুদের মধ্যে যে রোগ ধরা পড়ছে সেটা কাওয়াসাকি ডিজিজ Kawasaki Disease)। এমন এক সিন্ড্রোম যা মূলত শিশু ও কম বয়সীদের শরীরেই হানা দেয়। এই রোগ খুবই বিরল। ডাক্তারদের সমীক্ষা বলে বছরে ১০০ জন শিশুর মধ্যে হয়তো একজনের শরীরে ধরা পড়ে। কিন্তু করোনার সংক্রমণ শিশুদের শরীরেও থাবা বসানোর পর থেকে দেখা যাচ্ছে কাওয়াসাকির মতোই উপসর্গ ধরা পড়ছে শিশুদের মধ্যে। শুরুতে এই রোগের উপসর্গ ফুটে উঠলে চিকিৎসায় সারানো সম্ভব, একেবারেই ছোট বাচ্চা হলে কাওয়াসাকির প্রভাবে হৃদপিণ্ডের গতি আচমকা বন্ধ হয়ে যেতে পারে।
নিউ ইয়র্কের স্বাস্থ্য দফতর জানাচ্ছে, গত সপ্তাহ থেকেই কোভিড পজিটিভ শিশুদের মধ্যে কাওয়াসাকি রোগের মতো উপসর্গ দেখা যাচ্ছে। এ সপ্তাহে এমনই বিরল রোগে আক্রান্ত শিশুর সংখ্যা বেড়েছে।
[caption id="attachment_219237" align="aligncenter" width="620"]
নিউ ইয়র্কের গভর্নর অ্যান্ড্রু এম কুয়োমো[/caption]
কী এই কাওয়াসাকি রোগ?
বিশেষজ্ঞরা বলেন কাওয়াসাকি বিরলের মধ্যে বিরলতম ঘটনা। এই রোগের প্রকৃত কারণ আজও খুঁজে পাওয়া যায়নি। শিশু ও কমবয়সীদের মধ্যে এই রোগ বেশি দেখা গেছে। কাওয়াসাকিকে বলা হয় ‘অটোইনফ্লামেটরি ভাসকুলিটিজ’ যেখানে শরীরে তীব্র প্রদাহ শুরু হয়। আক্রান্ত হতে পারে হার্ট। দেখা গেছে কাওয়াসাকি রোগাক্রান্তদের হার্টের ধমনীতে প্রদাহ শুরু হয় এবং ধমনী ফুলে যায়। শরীরে রক্ত চলাচল বাধা পায়। কাওয়াসাকি রোগে হার্ট অ্যাটাক সাধারণত হয় না, কিন্তু যদি দীর্ঘসময় এই রোগের চিকিৎসা না হয় তাহলে হার্টের ধমনী ব্লক হয়ে শরীরে রক্ত চলাচল বন্ধ হয়ে যাবে।

কী কী উপসর্গ দেখা দেয় কাওয়াসাকি রোগে?
এই রোগ হলে শরীরে তাপমাত্রা বেড়ে যায়, প্রবল জ্বর আসে। ভাইরাসের সংক্রমণ হলে যেমন জ্বর হয়, শিশুদের অনেকটা সেই ধরনের জ্বর আসে। সেই সঙ্গে গা, হাত-পায়ে ব্যথা, পেট ব্যথা, অনেক সময় পেটের সমস্যা, পেট খারাপও হতে পারে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কাওয়াসাকিতে শিশুদের মুখ, জিভ ও ত্বকের রঙে বদল দেখা দেয়। হয় চামড়া ফ্যাকাসে হয়ে যায়, না হলে লাল র্যাশ দেখা দেয় সারা শরীরে। অনেক শিশুদের ক্ষেত্রে এই রোগের কারণে ত্বকের রঙে নীলচে ছোপ পড়তেও দেখা গেছে। সেই সঙ্গে ঝিমুনি, শরীরে অস্বস্তি, প্রস্রাবের সমস্যাও দেখা দেয়। মুখে ও গলায় সাঙ্ঘাতিক ব্যথা হয়, শিশুদের জল ও খাবার খাওয়ানো যায়না। ঘন ঘন শ্বাস পড়তে থাকে আবার অনেকের ক্ষেত্রে শ্বাসকষ্ট শুরু হয়। কাওয়াসাকিতে যদি হার্ট মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্থ হয় তাহলে বুকে ব্যথা শুরু হয়, হৃদস্পন্দন থেমেও যেতে পারে।
কাওয়াসাকি রোগ সারানো সম্ভব। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ভাইরাস, ব্যাকটেরিয়ার সংক্রমণে সাধারণত এই রোগ হয় না। শিশুদের জন্মগত হার্টের সমস্যা থাকলে বা পরে দেখা দিলে সেখান থেকে এই রোগ হতে পারে। যদিও এই রোগের সঠিক কারণ সম্পর্কে এখনও বিশদে কিছু জানাতে পারেনি চিকিৎসাবিজ্ঞান। করোনাভাইরাসের সংক্রমণে কীভাবে কাওয়াসাকি রোগ হতে পারে, সেটাই চিন্তার বিষয় হয়ে উঠছে চিকিৎসকমহলে। প্রাথমিকভাবে গবেষকরা মনে করছেন, করোনার সংক্রমণ যেহেতু হৃদপেশীতেও ছড়াতে পারে তাই সেখান থেকেই কাওয়াসাকির রোগ হলেও হতে পারে।
নিউ ইয়র্কের জিনোম সেন্টার অ্যান্ড রকফেলার ইউনিভার্সিটির গবেষকরা বলছেন, কাওয়াসাকির মতো বিরল রোগ যদি করোনার সংক্রমণে ছড়িয়ে পড়তে থাকে তাহলে সেটা চিন্তার কারণ। চলতি সপ্তাহেই পাঁচ বছরের একটি শিশুর মৃত্যু হয়েছিল এমনই এক বিরল রোগে। মৃত্যুর কারণ ধরা পড়েছিল ‘পেডিয়াট্রিক মাল্টিসিস্টেম ইনফ্লামেটরি’, যা সাধারণত কাওয়াসাকির কারণেই হয়ে থাকে। গভর্নর কুয়োমো বলছেন করোনাভাইরাসই এই রোগের কারণ সেটা এখনও স্পষ্ট নয়, মনে করা হচ্ছে। গবেষকরা কারণ খতিয়ে দেখছেন।
উপসর্গ ও রোগের ধরনে বদল আনছে মারণ ভাইরাস
মানুষের শরীরে যত বেশি সংক্রমিত হচ্ছে করোনাভাইরাস ততই ভোল বদলে যাচ্ছে তার। সংক্রমণের ধরন ও উপসর্গেও নতুনত্ব আনছে এই ভাইরাস। আয়ারল্যান্ডের গবেষকরা বলেছেন, এই ভাইরাসের সংক্রমণে ঘন হয়ে রক্ত জমাট বাঁধছে ফুসফুসে। এই ব্লাড-ক্লটের কারণে থেমে যাচ্ছে শ্বাসের প্রক্রিয়া। মৃত্যু হচ্ছে রোগীর। নিউ ইয়র্কের মাউন্ট সিনাইয়ের নেফ্রোলজিস্টরা বলছেন, করোনা পজিটিভ রোগীর কিডনি ডায়ালিসিস করতে গিয়ে দেখা গেছে, সেখানেও ব্লাট ক্লট হয়ে রয়েছে। এই ভাইরাস এমনভাবে সংক্রমণ ছড়াচ্ছে গোটা শরীরে, যে জায়গায় জায়গায় রক্ত জমাট বেঁধে যাচ্ছে। হার্টেও রক্ত জমাট বেঁধে হৃদরোগে আক্রান্ত হচ্ছেন করোনা রোগী। মাউন্ট সিনাইয়ের ফুসফুস বিশেষজ্ঞ ডাক্তার হুমান পুওর বলেছিলেন, মেকানিক্যাল ভেন্টিলেটর সাপোর্টে রাখা ১৪ জন রোগীকে পরীক্ষা করে দেখা গিয়েছিল এদের প্রত্যেকেরই ফুসফুসে রক্ত ঘন হয়ে জমাট বেঁধেছিল।
[caption id="attachment_219249" align="aligncenter" width="480"]
‘কোভিড টো’[/caption]
করোনার সংক্রমণে আরও এক ধরনের উপসর্গ দেখা যাচ্ছে যেখানে রোগীর ত্বকেই আশ্চর্য বদল হচ্ছে। বিশেষত পায়ের গোড়ালি, আঙুলে জ্বালাপোড়া ক্ষত, ঘা হতে দেখা গেছে অনেক রোগীরই। চিকিৎসকরা এই রোগকে বলছেন ‘কোভিড টো’ (COVID toes)। বাহ্যিক কোনও উপসর্গ নেই, কিন্তু হঠাৎ করেই দেখা যাচ্ছে পায়ের আঙুলে বা গোড়ালিতে লালচে-বেগুনি রঙের র্যাশ বা ঘা হচ্ছে। যন্ত্রণাদায়ক সেই ক্ষত সাধারণ অ্যান্টিবায়োটিক ওষুধেও সারছে না। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এমন উপসর্গ করোনার প্রি-সিম্পটম হতে পারে।