দ্য ওয়াল ব্যুরো: মরার আগে কি খুব খিদে পেয়েছিল অবনীর? পাঁচ দিন ধরে তো কিছুই জোটেনি তার কপালে। মৃত শরীর কাঁটাছেঁড়া করে পাকস্থলীতে মিলেছে শুধুই গ্যাস। তারা ছানারা এখন কোথায়? মায়ের সঙ্গে তারাও তো ছিল অভুক্ত ? এখনও কি বেঁচে আছে তারা, নাকি মায়ের হত্যাকাণ্ড দেখে ক্লান্ত দু’টি চোখ অপেক্ষা করছে আসন্ন মৃত্যুর?
বাঘ মারার খেলা শেষ। যুদ্ধ জয়ের পর তৃপ্তির হাসি শিকারীদের মুখে। ‘মানুষখেকো’ অবনীর কবল থেকে রক্ষা পেয়ে স্বস্তির শ্বাস ফেলেছেন গ্রামের মানুষরাও। কিন্তু অবনীর মৃত্যু বাস্তবে হয়েছে কি? পাঁচ বছরের ‘টি১’ (অবনীর সাঙ্কেতিক নাম) জন্ম দিয়েছে একটার পর একটা বিতর্কের। ময়নাতদন্তের রিপোর্টে প্রতিদিনই উঠে আসছে নতুন নতুন তথ্য। বাঘিনীর মৃত্যু নিয়ে দানা বাঁধছে রহস্য।
ময়নাতদন্তের দায়িত্বপ্রাপ্ত চিকিৎসক ডঃ অজয় এবং ডঃ বিএম কাদু বলেছেন, ‘‘অবনীর মৃত্যু হয়েছে মাত্রাতিরিক্ত রক্তক্ষরণ ও শ্বাসনালী ফেটে গিয়ে।’’ মরার সময় সে ছিল অভুক্ত। পাকস্থলীতে কোনও খাবার ছিল না। ডঃ নবীন কুমারের মতে, একটা পূর্ণবয়স্ক বাঘ ২০ দিন পর্যন্ত না খেয়ে বেঁচে থাকতে পারে। তার জন্য দিনে বার তিনেক তাকে জল খেতে হয়। শিকার ধরে খাবার পর, সেই খাবার হজম হতে সময় লাগে ৮-১০ ঘণ্টা। বিপাক এবং বর্জ্য বার হতে মোট সময় লেগে যায় চারদিন। ময়নাতদন্তে দেখা গেছে অন্তত সাত দিন ধরে অভুক্ত ছিল সে। অর্থাৎ মৃত্যুর কয়েকদিন আগে পর্যন্ত কোনও শিকার তার নাগালে আসেনি।
আর শিকার ধরবেই বা কী করে?? মহারাষ্ট্রের পান্ধারকাওড়া জঙ্গলে হঠাৎ করেই ‘মানুষখেকো’ হয়ে ওঠা বাঘিনীকে মারার জন্য তো সিপাহী-শাস্ত্রী-লোকলস্কর নিয়ে আস্ত একটা যুদ্ধের আয়োজন করা হয়েছিল। ফাঁদ পাতা হয়েছিল যত্রতত্র। অন্য বাঘিনীদের মূত্র ছড়িয়ে, পারফিউম স্প্রে করে ডেকে আনা হয়েছিল তাকে। তার পর একটা গুলি, আর একটা বাঘের মৃত্যু। অবনী হত্যার মূল কারিগর শিকারী আসগর আলির বয়ান অনুযায়ী, বিগত তিন-চার মাস শুধু পালিয়ে বেড়াচ্ছিল বাঘিনী। তার সঙ্গেই ছিল তার দু’টি ন’মাসের ছানা। তারাও আত্মগোপন করেছিল মায়েরই সঙ্গে। অবনী যখন শিকারীদের পাতা ফাঁদে আত্মসমর্পণ করতে বাধ্য হয়, মায়ের আড়াল থেকে লুকিয়ে তারাও ছিল সে হত্যাকাণ্ডের অন্যতম প্রত্যক্ষদর্শী।
আরও পড়ুন: একটা বাঘিনীর মৃত্যু, না মানবিকতার হত্যা? ‘মানুষখেকো’ অবনী তুলে দিল অজস্র প্রশ্ন
হায়দরাবাদ টাইগার কনজারভেশন সোসাইটির বাঘ বিশেষজ্ঞদের মতে, একটি শাবকের পাকাপোক্ত হতে সময় লাগে অন্তত ২০ মাস। এর মধ্যেই তাকে শিকার ধরা থেকে জঙ্গলের নিয়মকানুন শেখায় তার মা। শিকারী রক্তচক্ষু থেকে বাঁচতে তারা হয়তো অভুক্ত লুকিয়ে রয়েছে কোথাও। অথবা অপেক্ষা করছে নির্মম মৃত্যুর।

নেহেরু জুলজিক্যাল পার্কের বন্যপ্রাণি বিশেষজ্ঞ ডঃ নবীন কুমারের কথায়, ০.৫ সেন্টিমিটার ব্যাসের একটি বুলেট এফোঁড়-ওফোঁড় করে দিয়েছে বাঘিনীর হৃৎপিন্ড ও ফুসফুস। রিপোর্ট বলছে, অজ্ঞান করার জন্য যে সূঁচ ছোড়া হয়েছিল সেটা বাঘের চামড়ার ভিতর প্রবেশই করেনি। তাহলে সে অজ্ঞান হল কী ভাবে? আশ্চর্যের কথা, গুলিটাও ছোড়া হয়েছিল একই সময় যখন সূঁচ ফোঁটানোর চেষ্টা করা হয় অবনীকে। বাঘ শিকারী নবাব শফাত আলি ও তাঁর ছেলে আসগর আলি সাফাইয়ে জানিয়েছিলেন, অজ্ঞান করার মুহূর্ত খানেক পরেই জেগে ওঠে বাঘিনী। প্রতিআক্রমণের আশঙ্কায় তাই সঙ্গে সঙ্গেই তাকে গুলি করা হয়। কিন্তু, ময়নাতদন্তের রিপোর্ট বলছে অজ্ঞান করার প্রচেষ্টার কথাটা নেহাতই ধাপ্পা হতে পারে। কারণ বাঘিনী অজ্ঞান হয়নি। নাগপুরের বন্যপ্রাণি বিশেষজ্ঞ ডঃ জেরিল বানাতের মতও তাই।

অবনীর শিকার পদ্ধতি নিয়েও উঠেছে প্রশ্ন। ডঃ নবীন কুমার জানিয়েছেন, সামনে থেকে নয়, বরং পাশ থেকে গুলি করা হয়েছে বাঘিনীকে। গুলি তার ঘাড়ের নীচ দিয়ে সোজা চুকে পাঁজরের মধ্যে প্রবেশ করেছে। বাঘ বিশেষজ্ঞদের মতে, বাঘ শিকারের পদ্ধতি তা বলে না। শিকারী ও বন কর্মীদের কথামতো, অবনী ছিল শিকারীদের জিপের খুব কাছেই। তাহলে তাকে সামনে থেকে সোজাসুজি গুলি না করে পাশ থেকে গুলি করা হল কেন? উঠছে সে প্রশ্নও। কী ধরনের বন্দুক দিয়ে তাকে মারা হয়েছে সেটাও ভাবার বিষয়।
পান্ধারকাওড়ায় এখন খুশির হাওয়া। বাঘ মেরে বিজয়ীর গর্ব। আড়াল থেকে সেটাই হয়তো শূন্যদৃষ্টিতে দেখে যাচ্ছে অবনীর ছানারা। মনে মনে হয়তো ভাবছে, গুলির পরবর্তী নিশানা কারা? তারা নয়তো?
The Wall-এর ফেসবুক পেজ লাইক করতে ক্লিক করুন