
শেষ আপডেট: 10 July 2018 08:30
অনূর্ধ্ব ১৯ খেলায়[/caption]
যে চরম দারিদ্র, আর্থিক অনটনকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে আজ তিনি বিশ্বকাপের মঞ্চে সোনার বুটের দৌড়ে সেই কাহিনী কোনও উপন্যাস বা রুদ্ধশ্বাস সিনেমার থেকে কোনও অংশে কম নয়। বেলজিয়ামে জন্ম হলেও বাবা-মা কঙ্গোর বাসিন্দা। বাবা বেলজিয়ামের ঘরোয়া লিগে খেললেও সেরকম নাম করতে পারেননি। তাই আর্থিক স্বাচ্ছন্দ্যও ছিল না। “স্কুল থেকে বাড়ি ফিরে দেখতাম সেই এক খাবার। রুটি আর দুধ। একদিন দেখলাম মা দুধের মধ্যে কিছু মেশাচ্ছেন। প্রথমে বুঝতে পারিনি। পরে বুঝলাম দুধ কমে যাওয়াতে জল মিশিয়ে পরিমাণ বাড়াচ্ছেন মা। তখন বুঝেছিলাম আমরা শুধু গরীব নই, আমরা ভেঙে পড়েছি।” নিজের ছোটবেলার কথা বলছিলেন লুকাকু।
তাঁর মা বাড়ির সামনের বেকারি থেকে পাউরুটি চেয়ে নিয়ে আসতেন। পরে টাকা পেলে মিটিয়ে দিতেন দাম। শুধু খাবারই নয়, অন্য কোনও স্বাছন্দ্যও ছিল না তাঁদের। আর্থিক অনটনের কারণে প্রথমে টিভি বিক্রি করতে হয়। বিল মেটাতে না পারায় ইলেক্ট্রিসিটি কেটে দেওয়া হয়। এমনকী স্টোভে জল গরম করে শীতকালে স্নান করতে হতো। কিন্তু কোনও কিছুতেই ভেঙে পড়েননি লুকাকু। মনের মধ্যে পুষে রেখেছিলেন রাগ আর জেদ। এই জেদকে পাথেয় করেই এগিয়ে গিয়েছেন জীবনে।
[caption id="attachment_17667" align="alignleft" width="300"]
অ্যান্ডারলেখ্ট সিনিয়র দলে [/caption]
ছোট থেকেই ফুটবল খেলতে ভালবাসতেন লুকাকু। তাই স্বপ্ন দেখতেন ফুটবলার হওয়ার। একদিন তো মা’কে কথাও দিয়ে ফেলেছিলেন, সব সমস্যার সমাধান করে দেবেন তিনি। বাবার কাছে জিজ্ঞাসাও করেন পেশাদারী ফুটবল কত বছর বয়স থেকে খেলা যায়? বাবা উত্তর দেন ১৬ বছর। ছ’বছরের লুকাকু মা’কে বলেছিলেন আর তো কয়েকটা দিন। কথা রেখেছেন তিনি। ১৬ বছর ১১ দিন বয়সে প্রথম পেশাদারী ফুটবলার হিসেবে খেলতে নামেন।
বাড়িতে টিভি না থাকায় খেলা দেখতে পারতেন না। স্কুলে বন্ধুদের মুখে শুনতেন। আর মাঠে সেভাবে খেলার চেষ্টা করতেন। “ফুটবল খেলার সময় সবাই বলে মানসিক শক্তির কথা। আমি সবথেকে বেশি শক্তিশালী। কারণ অন্ধকার ঘরে মাটিতে শোয়ার অভিজ্ঞতা আমার আছে। জল মেশানো দুধে পাউরুটি ডুবিয়ে খাওয়ার অভিজ্ঞতা আমার আছে। আমি যখনই ফুটবল খেলেছি, সেই খেলাকে ফাইনাল ভেবে খেলেছি। সেটা পার্কে বন্ধুদের সঙ্গেই হোক কিংবা স্কুলে টিফিনেই হোক। যখনই ফুটবলে শট মেরেছি, চেষ্টা করেছি বলের চামড়া ছিঁড়ে দেওয়ার। কারণ আমি খেলতে আসিনি, এসেছি আমার দারিদ্র মুছে ফেলতে।”
স্কুলে পড়ার সময়ই বেশ লম্বা ছিলেন লুকাকু। তাই খেলার সময় অনেকেই প্রশ্ন করতেন, কত বয়স তাঁর। এমনকী ১১ বছর বয়সে লিয়ের্স যুব দলের হয়ে খেলার সময় তো অনেক ছেলের বাবা-মা এসে তাঁর আই.ডি কার্ড দেখতে চান। মনের মধ্যে অপমান চেপে রেখে কার্ড দেখিয়েছিলেন তিনি। কিন্তু তারপর মাঠে বাকি খেলোয়াড়দের নাকানি-চোবানি খাইয়ে ছেড়েছিলেন।
[caption id="attachment_17668" align="alignright" width="300"]
নিজের বাড়িতে [/caption]
ভালো বা বড় ফুটবলার হওয়া তাঁর লক্ষ্য ছিল না। তাঁর লক্ষ্য ছিল বেলজিয়ামের ইতিহাসে সবথেকে ভালো ফুটবলার হওয়া। আর সেই কারণেই তাঁর কাছে ফুটবল খেলাটা ছিল একটা মিশন। মনের মধ্যে আগুন রেখে খেলতেন। আর সেই আগুন ঝরে পড়ত মাঠে। ১২ বছর বয়সে যুব দলের সঙ্গে খেলার সময় ৩৪ ম্যাচে ৭৬ গোল করেছিলেন লুকাকু।
সেই খবর দেওয়ার জন্য ফোন করেছিলেন নিজের দাদুকে। কঙ্গোয় থাকা তাঁর দাদু ছিলেন তাঁর অন্যতম বড় ভরসার জায়গা। ফোন করার পর দাদু হঠাৎ লুকাকুকে বলেন, তাঁর মায়ের খেয়াল রাখার জন্য। কথা দিয়েছিলেন দাদুকে। কিন্তু তখন বুঝতে পারেননি। কিন্তু পাঁচ দিন পরেই যখন দাদুর মারা যাওয়ার খবর পান, তখন বুঝতে পারেন কেন দাদু সেদিন ওই কথা বলেছিলেন।
অ্যান্ডারলেখ্টের অনূর্ধ্ব ১৯ দলে ঢুকে পড়েন ১৬ বছরের আগেই। কিন্তু খেলার সুযোগ পাচ্ছিলেন না। এদিকে ১৬ পূর্ণ হতেও আর বেশি দেরি নেই। মা’কে কথা দিয়েছেন ১৬ বছরের আগেই পেশাদার ফুটবলার হবেন। তাই একদিন কোচের সঙ্গে বাজি লাগিয়ে ফেললেন, কোচ যদি তাঁকে খেলার সুযোগ দেন তাহলে তিনি ডিসেম্বর মাসের মধ্যেই ২৫ গোল করবেন। আর যদি তিনি ২৫ গোল করতে পারেন তাহলে কোচ তাঁদের রোজ প্যানকেক করে খাওয়াবেন। কোচ রাজি হয়ে পালটা বলেন, যদি তিনি ২৫ গোল করতে না পারেন তাহলে গোটা মরশুম তাঁকে বেঞ্চে বসেই কাটাতে হবে। কিন্তু কোচ হয়তো জানতেন না, এক ‘ক্ষুধার্ত’ ছেলের সঙ্গে তিনি বাজি ধরেছেন। ডিসেম্বর নয়, নভেম্বর মাসের মধ্যেই ২৫ গোল করে ফেলেছিলেন তিনি। এক মাস আগেই ক্রিসমাস এসেছিল তাঁর জীবনে।
[caption id="attachment_17671" align="alignleft" width="300"]
বেলজিয়ামের হয়ে গোল করে উৎসব [/caption]
১৩ মে, ২০০৯। প্রথম পেশাদারী চুক্তি করেছেন। কিন্তু কবে খেলার সুযোগ পাবেন জানেন না। তাই বাড়িতে নতুন টিভি কিনে এনেছেন অ্যান্ডারলেখ্ট বনাম স্টান্ডার্ড লিগের ফাইনাল দেখবেন বলে। হঠাৎ ম্যাচের আগের দিন ফোন পেলেন। অ্যান্ডারলেখ্টে যোগ দেওয়ার জন্য তাঁকে ডাকা হচ্ছে। আনন্দে পাগল হয়ে গিয়েছিলেন সেদিন। তড়িঘড়ি দলের সঙ্গে যোগ দেন। বন্ধুরা টিভিতে তাঁকে অ্যান্ডারলেখ্টের খেলোয়াড়দের সঙ্গে নামতে দেখে অবাক হয়ে গিয়েছিলেন। টিভিতে খেলা না দেখে মাঠে তিনি কী করছেন সেই প্রশ্নই করে বন্ধুরা। আসলে তাড়াহুড়োর চোটে কাউকে বলে আসা হয়নি তাঁর। ২৪ মে, ২০০৯। স্বপ্ন পূরণের দিন লুকাকুর। ম্যাচের ৬৩ মিনিটের মাথায় ১৬ বছর ১১ দিন বয়সে পরিবর্ত হিসেবে মাঠে নামেন লুকাকু। সেই ম্যাচে তাঁর দল হেরে গেলেও নিজের আগমণ বার্তা দিয়েছিলেন গোল করে। তাই লুকাকু জানান কোনদিন ভুলবেন না সেই গোলের কথা।
সেই শুরু তাঁর যাত্রার। পরের বছর লিগ জিতলেন। আফ্রিকার ‘প্লেয়ার অফ দ্য ইয়ারে’র তালিকায় দ্বিতীয় হলেন। হঠাৎ করেই বেলজিয়ান মিডিয়ার নজর পড়ল তাঁর উপর। ক্লাব ফুটবলে চেলসিতে যোগ দিলেন। কিন্তু সেখানে খুব একটা ভালো মরশুম গেল না। শুরু হলো সমালোচনা। “যখন ভালো খেলতাম মিডিয়া লিখত রোমেলো লুকাকু, বেলজিয়ান স্ট্রাইকার। যখন খারাপ খেলতাম তারাই লিখত, রোমেলো লুকাকু, কঙ্গো বংশোদ্ভূত বেলজিয়ান স্ট্রাইকার। আমার খেলা কারও পছন্দ না হতেই পারে। কিন্তু আমি ব্রাসেলসে জন্মেছি, বড় হয়েছি। স্বপ্ন দেখেছি ভিনসেন্ট কোম্পানির মতো খেলোয়াড় হওয়ার। আমি একটা লাইন ফরাসী ভাষায় শুরু করে ডাচ ভাষায় শেষ করতে পারি, তার মাঝে স্প্যানিশ-পর্তুগীজও ঢুকিয়ে দিতে পারি। কিন্তু আমি বেলজিয়ান। এটাই আমার পরিচয়।” দৃপ্ত কণ্ঠে বলেন লুকাকু।
[caption id="attachment_17670" align="alignright" width="300"]
মায়ের সঙ্গে লুকাকু, কথা রেখেছেন তিনি [/caption]
তাঁর নিজের দেশের লোকেরাই অনেকে চাননি তিনি সফল হন। নিজেই বলেছেন এই কথা। তিনি যখন চেলসি, ওয়েস্ট ব্রমউইচ আলবিয়ানে খারাপ খেলেছেন তখন এই লোকগুলো হেসেছে। কিন্তু তাদের গুরুত্ব দিতে নারাজ লুকাকু। “যখন আমরা খেতে পাচ্ছিনা, তখন এই লোকগুলো কোনও সহানুভূতি দেখায়নি। তাই পরে কে কী বলল, তাতে তিনি কিছুই মনে করেন না। কারণ তিনি, শুধু তিনিই জানেন দশ বছর টিভিতে ফুটবল খেলা না দেখতে পাওয়ার কষ্ট, বাবার ছেঁড়া জুতো পরে দিনের পর দিন খেলার যন্ত্রণা।”
২০০২ সালে রোনাল্ডোর খেলা দেখার সময় ভাবেননি ১২ বছর পর সুযোগ পাবেন বিশ্বকাপ খেলার। শুধু তাই নয় চার বছর পর রাশিয়া বিশ্বকাপে সোনার বুটের দৌড়ে থাকবেন তিনি। ফ্রান্স প্রতিবেশী দেশ হওয়ায় পছন্দ করতেন ফ্রান্সের খেলা। পছন্দের খেলোয়াড় ছিলেন থিয়েরি অঁরি। কিন্তু টিভিতে কোনদিন তাঁর খেলা দেখতে পাননি লুকাকু। এখন সেই অঁরির কাছেই প্রস্তুতি নিচ্ছেন তিনি। প্রত্যেকটা দিন অঁরি হাতে ধরে তাঁকে বুঝিয়ে দিচ্ছেন কীভাবে আরও ক্ষুরধার হয়ে উঠতে হবে গোলের সামনে।
জীবনে লড়াই করেছেন। সমস্ত প্রতিবন্ধকতাকে ভেঙে গুঁড়িয়ে দিয়ে এগিয়ে গিয়েছেন নিজের লক্ষ্যে। হয়েছেন বেলজিয়ামের সর্বকালের সেরা স্ট্রাইকার। কিন্তু আক্ষেপ থেকে গেছে একটাই। দাদু দেখে যেতে পারলেন না। “আমার মনে হয় আরেকবার যদি কঙ্গোয় দাদুকে ফোন করতে পারতাম। প্রিমিয়ার লিগ, ম্যাঞ্চেস্টার ইউনাইটেড, চ্যাম্পিয়ন্স লিগ, বিশ্বকাপ কিছুর কথা বলতাম না। খালি বলতাম, আমি কথা রেখেছি দাদু। দেখ তোমার মেয়ের খেয়াল রেখেছি। এখন কত আনন্দে আছে তোমার মেয়ে। ঘরের মেঝেতে আর ইঁদুর ঘুরে বেড়ায় না। আমাদের আর মাটিতে শুতে হয় না। জল মেশানো দুধে পাউরুটি ভিজিয়ে খেতে হয় না। কেউ আর আমার আই.ডি দেখতে চায় না। সবাই এখন আমার নাম জানে।”