
গ্রাফিক্স: শুভ্র শর্ভিন
শেষ আপডেট: 25 February 2025 16:59
দ্য ওয়াল ব্যুরো: ‘ব্যাট-বলের খেলা’। ‘বাইশ গজের লড়াই’। ক্রিকেটকে (Cricket) যতই বস্তুগত, কেঠো বিশেষণের খোপে পুড়ে ফেলা হোক না কেন, এর আসল জ্বালানির নাম একটাই—আগ্রাসন, আগ্রাসন আর আগ্রাসন! যেটা কখনও ভেসে আসে স্ট্যান্ড থেকে মাঠে। কখনও মাঠ থেকে উড়ে যায় স্টেডিয়ামে।
বোলার (Bowler) বল করবে। ডেলিভারি ভাল হলে কিংবা ব্যাটসম্যান (Batsman) ভুল করলে সে আউট হবে। এই হচ্ছে মোদ্দা কথা। তবু, ওই যে বলা হল, বস্তুগত যুক্তিবুদ্ধি দিয়ে যে ক্রিকেট চলে না! তাহলে স্রেফ ‘জেন্টলমেনস গেম’ হিসেবে শ্বেতশুভ্র জার্সি গায়ে সারা দুনিয়ায় ব্রিটিশ-বাহিত সহবত ও সৌহার্দ্যের পথেই খেলা হত। টেস্ট থেকে ওয়ান ডে পেরিয়ে কালের নিয়মে চিয়ারলিডার-শোভিত টি-২০ দেখে ফেলেছে আমজনতা। ফলে অভিরুচির গ্রাফও উঠেছে, নেমেছে। ক্রিকেটারদের পারস্পরিক সৌজন্যও কখনও কখনও ডিঙিয়েছে তার স্বাভাবিক চৌহদ্দি।
হয়তো এরই প্রতিফলন ধরা পড়ে উচ্ছ্বাসে। স্পিনারের লক্ষ্যভেদী বল যখন ব্যাটসম্যানকে বোকা বানিয়ে স্ট্যাম্পের বেল ছিটকে ফেলে, তখন স্রেফ খাতায় আরও একটা উইকেট জুড়ে যাওয়ার বদলে কখনও তার মাথায় ঘাই মারে দু’দেশের রাজনৈতিক টেনশন, কখনও আঁচ ফেলে ব্যক্তিগত অসূয়া। ফলে চোখে চোখ রেখে চলে উচ্ছ্বাস প্রদর্শন। যেখানে সেলিব্রেশনের চাইতে গুরুতর হয়ে ওঠে আগ্রাসন, বিশুদ্ধ আনন্দের জায়গা নেয় উগ্র দাপট। এরই প্রতিফলন ভারত-পাক ম্যাচে আবরার আহমেদের উল্লাস। যেখানে চাপা ঔদ্ধত্যের পাশাপাশি কিঞ্চিৎ অবমাননাও মিশে রয়েছে। দুই মুলুকের সকলেই এই একটি বিষয়ে অন্তত একমত।
অবশ্য আবরার একা নন। এর আগেও এমন বেশ কিছু শালীনতা-ডিঙোনো ‘সেন্ড-অফ’ নিয়ে বাইশ গজে বিতর্কের ঢেউ উঠেছে।
অ্যান্ড্রু সাইমন্ডস বনাম হরভজন
২০০৮ সালে অনিল কুম্বলের নেতৃত্বে ভারতীয় টেস্ট টিম যায় অস্ট্রেলিয়া সফরে। একাধিক কারণে সেই ট্যুর স্মরণীয়। যার মধ্যে অন্যতম অ্যান্ড্রু সাইমন্ডস ও হরভজন সিংয়ের আকচা-আকচি। ‘মাঙ্কি-গেট’ বিতর্ক বলে যা ক্রিকেটের ইতিহাসে চর্চিত হয়ে এসেছে। সাইমন্ডস অভিযোগ করেন, হরভজন তাঁকে ‘মাঙ্কি’ (হনুমান) বলেছেন। এই বিশেষ শব্দটি অস্ট্রেলিয়ায় বর্ণবিদ্বেষমূলক বলে গণ্য করা হয়। মাঠের লড়াই মাঠের বাইরে পর্যন্ত গড়ায়। ম্যাচ রেফারি, আইসিসিকেও হস্তক্ষেপ করতে হয়। সেই সিরিজের দ্বিতীয় টেস্ট ছিল অ্যাডিলেডে। যেখানে হরভজনকে ছক্কা হাঁকিয়ে ইচ্ছে করে ‘হনুমানে’র ভঙ্গিতে উচ্ছ্বাস দেখান সাইমন্ডস। স্টেডিয়ামে বসা দর্শকদের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে উত্তেজনা। যার জন্য পরে সমালোচনার মুখে পড়েন প্রয়াত অস্ট্রেলীয় অলরাউন্ডার। ক্ষমাও চান তিনি।
বিরাট কোহলি বনাম স্টিভ স্মিথ
অনিয়ন্ত্রিত আগ্রাসনের জন্য বারেবারেই সমালোচনার মুখে পড়েছেন বিরাট কোহলি। ২০১৭ সালে যা নিয়ে প্রবল চর্চা শুরু হয়। সেবার টি-২০ সিরিজ খেলতে মাঠে নামে ভারত। প্রথম ম্যাচ ছিল ওভালে। সেখানে স্টিভ স্মিথ আউট হওয়ার পর তাঁর দিকে উত্তেজিত ভঙ্গিতে তেড়ে যান বিরাট। আর হাত তুলে স্মিথকে ড্রেসিং রুমে ফিরে যাওয়ার ‘নির্দেশ’ দিতে থাকেন। অনেকের চোখেই এমন মাত্রাছাড়া সেন্ড-অফ ‘অসম্মানজনক’ ও ‘কুরুচিকর’ ঠেকেছিল।
রাবাডা বনাম স্মিথ
মৌখিক নয়, বোলারদের আগ্রাসন কখনও কখনও শরীর ছুঁয়েছে। ২০১৮ সালের টেস্ট ম্যাচ। মুখোমুখি অস্ট্রেলিয়া-দক্ষিণ আফ্রিকা। সেখানে স্টিভ স্মিথকে আউট করে উচ্চকিত চিৎকারে পাশ দিয়ে হেঁটে যাওয়ার সময় অস্ট্রেলীয় ব্যাটসম্যানের কাঁধে ধাক্কা মারেন দক্ষিণ আফ্রিকার পেসার। এই নিয়ে মাঠেই অশান্তি লেগে যায়। যা মাঠের বাইরেও সংক্রমিত হয়। দুটি ম্যাচের জন্য নির্বাসিত হয়েছিলেন রাবাডা।
হর্ষিত রানা বনাম মায়াঙ্ক আগরওয়াল
গত বছর আইপিএল টুর্নামেন্টও বোলারের অশোভন আচরণের জন্য শিরোনামে এসেছিল। উপলক্ষ্য সানরাইজার্স হায়দরাবাদ বনাম কলকাতা নাইট রাইডার্স। কেকেআর-এর হর্ষিত রানা মায়াঙ্ককে আউট করে তার উদ্দেশে বাড়িয়ে দেন ফ্লাইং কিস। একদম চোখে চোখ রেখে, হাতের নাগালে দাঁড়িয়ে। যদিও সেই ‘উড়ন্ত চুম্বন’কে ভাল চোখে দেখেনি আইপিএল কর্তৃপক্ষ। বিতর্কিত অঙ্গভঙ্গির শাস্তি হিসেবে হর্ষিতকে একটি ম্যাচের জন্য ব্যান করা হয়।
মার্লন স্যামুয়েলস বনাম বেন স্টোকস
২০১৫ সালের ২৩ এপ্রিল। ইংল্যান্ডের মুখোমুখি ওয়েস্ট ইন্ডিজ। সেই ম্যাচে বেন স্টোকসকে আউট করেন মার্লন স্যামুয়েলস। তারপর ইংল্যান্ডের ব্যাটার যখন ড্রেসিং রুমে ফিরে যাচ্ছেন, সেই সময় স্যামুয়েলস তাঁর দিকে ‘স্যালুট’ ছুড়ে দেন। স্রেফ ইংরেজ শিবির নয়, শালীনতার, ভব্যতার লক্ষণরেখা অতিক্রমের অভিযোগে স্যামুয়েলসের বিরুদ্ধে খড়্গহস্ত হয়ে ওঠে সারা বিশ্ব। এরপরও বারকয়েক একই সেলিব্রেশন করতে দেখা যায় তাঁকে। কিন্তু ঘরে-বাইরে চাপ বাড়তে থাকায় অবশেষে নিরস্ত হন মার্লন।