
ঋষভ পন্থ
শেষ আপডেট: 24 April 2025 06:57
দ্য ওয়াল ব্যুরো: আইপিএল (IPL 2025) শুরুর আগে লখনউ সুপার জায়ান্টসের (LSG) কর্ণধার সঞ্জীব গোয়েঙ্কা (Sanjiv Goenka) একটি সাক্ষাৎকার দেন। সেখানে উঠেছিল আইপিএলে সাফল্যের প্রসঙ্গ। চেন্নাই সুপার কিংস (CSK), মুম্বই ইন্ডিয়ানসের (MI) মতো দল যেখানে বাকি টিমকে ছাপিয়ে শীর্ষ ছুঁয়েছে। অধিনায়ক হিসেবেও একাধিক খেতাব জয়ের নজির গড়েছেন রোহিত শর্মা (Rohit Sharma) ও মহেন্দ্র সিং ধোনি (MS Dhoni)।
এই নিয়ে সেদিন দৃঢ় কণ্ঠে নিজের মত রেখেছিলেন গোয়েঙ্কা। বলেছিলেন, ‘রোহিত, ধোনি দুজনেই মহান খেলোয়াড়। কিন্তু আজ থেকে দশ, কুড়ি বছর বাদে লোকে এই দুজনের পাশাপাশি সফল অধিনায়ক হিসেবে ঋষভের নাম করবে।‘
সেই সময় পাশেই বসেছিলেন পন্থ। লজ্জায় কুঁকড়ে যান লখনউয়ের নবাগত অধিনায়ক। পরিস্থিতি কিছুটা স্বাভাবিক করতে সঞ্চালক প্রশ্ন ছুড়ে দেন, ‘প্রেসার! এবার প্রচণ্ড প্রেসার! তাই তো, ঋষভ?’
চলতি আইপিলের মহা নিলামে এক কোটি, দু’কোটি নয়—সাতাশ কোটি দিয়ে ঋষভকে কিনেছে লখনউ। কিন্তু একটি ম্যাচে ৬৩ রান ছাড়া সেভাবে দু’অঙ্কের রানই তুলতে পারেননি উইকেটরক্ষক-ব্যাটসম্যান। মারাত্মক দুর্ঘটনা থেকে ফিরে ভারতকে টি-২০ বিশ্বকাপ জেতানোর অন্যতম কাণ্ডারী হয়ে উঠেছিলেন যিনি, তাঁর বিধ্বংসী ফর্ম আচমকা উবে গেল কী করে? কেন প্রত্যাশা পূরণে নাগাড়ে ব্যর্থ হয়েই চলেছেন তরুণ কিপার? কারণ কি শেষমেশ সেই প্রেসার-ই? বিশেষজ্ঞ ও লখনউ শিবিরের অন্দরে ক্রমশ দানা বাঁধছে এই প্রশ্ন।
আপাতত কোন জায়গায় দাঁড়িয়ে রয়েছেন ঋষভ, তার ভাল প্রমাণ মঙ্গলবারের ম্যাচ। প্রতিপক্ষ দিল্লি ক্যাপিটালস। ওপেনে ৮৭ রান তুলে শুরুটা খারাপ করেনি এডেন মার্করাম আর মিচেল মার্শের জুটি। কিন্তু তারপরই আচমকা গিয়ার নেমে যায়। ধীর লয়ে রান তোলে মিডল অর্ডার। যে কারণে ২০ ওভারে সর্বসাকুল্যে ১৫৯ রান ওঠে।
আর এখানেই প্রশ্ন তুলেছেন বিশ্লেষকদের একাংশ। কেন মন্থর রান উঠছে দেখেও সাত নম্বরে নামলেন ঋষভ পন্থ? সেটাও ইমপ্যাক্ট প্লেয়ার আয়ুষ বাদোনির পরে? কী এমন হল যে, আবদুল সামাদের মতো অলরাউন্ডারকে ঋষভের আগে নামতে হচ্ছে?
এতদূর পর্যন্ত তবু ঠিক ছিল। কিন্তু অন্তিম ওভারে মাত্র দু’বল খেলে দ্বিতীয় ডেলিভারিতে মুকেশ কুমারের ডেলিভারিকে যে কায়দায় মারতে গিয়ে বোল্ড হলেন ঋষভ এবং তারপর ক্রিজের উল্টোদিকে দাঁড়ানো সতীর্থ ব্যাটারের জন্য অপেক্ষা না করে ডাগ আউটের দিকে হাঁটা লাগালেন—সেই শরীরী ভাষায় স্পষ্ট ফুটে উঠছিল এক ক্রিকেটারের তলানিতে ঠেকা আত্মবিশ্বাস! এরপর গোলগোল কথায় ব্যাটিং অর্ডারে নিজের ডিমোশন এবং মেন্টর জাহির খানের সঙ্গে উত্তেজিত ভঙ্গিমায় হাত নেড়ে কথাবার্তার মধ্য দিয়ে সাফ হয়ে যায়: শুধু পন্থ নন, লখনউয়ের ড্রেসিং রুমেও অসন্তোষ ও হতাশা বাসা বেঁধেছে।
এই নিয়ে দ্বিমত নেই ইংল্যান্ডের প্রাক্তন অধিনায়ক নিক নাইটের। সাফ জানিয়েছেন, দলের অধিনায়কের চাপে থাকা ড্রেসিং রুমের পক্ষে সবচাইতে বিপজ্জনক বিষয়। আর এর মূল্য চোকাতে হবে লখনউকে। পাশে দাঁড়ালেও সতর্কবার্তা ছুড়ে দিয়েছেন লাল বলের ক্রিকেটে টিম ইন্ডিয়ার বিশ্বস্ত সেনানী চেতশ্বর পূজারা। ব্যটিং অর্ডারে নামার জায়গা পর্যন্ত বেঁধে দিয়েছেন তিনি। পূজারার সাফ দাবি: না ওপেন, না সাত নম্বর—কোথাও পন্থের নামার কথা নয়। চার নম্বরেই তিনি সবচাইতে বেশি স্বচ্ছন্দ।
এই মন্তব্য, পরামর্শ সবই ঋষভ পন্থের জন্য বিপদঘোষণা, তাঁর ফিরে আসার টোটকা হতে পারে। কিন্তু কী কারণে তরুণ ক্রিকেটারের এতটা অধঃপতন? বিশ্লেষণে উঠে এসেছে তিনটি কারণ।
১. সাদা বলের ক্রিকেটে আত্মবিশ্বাসে ঘাটতি:
গত বছর টি-২০ বিশ্বকাপে টিম ইন্ডিয়ার প্রথম পছন্দের উইকেটকিপার ছিলেন ঋষভ। কিন্তু ৮ ম্যাচে মাত্র ১৭১ রান করেন। স্ট্রাইক রেট ১৩০-এরও নীচে। ২০২৪-এর জুলাইয়ের পর দেশের হয়ে আর টি-২০ ম্যাচ খেলননি। এর খেসারত চোকান ওয়ান ডে-তে। ঋষভের জায়গা নেন কে এল রাহুল। ডাক পান চ্যাম্পিয়নস ট্রফিতে। ঋষভ এই টুর্নামেন্টে একটিও ম্যাচ খেলেননি। টেস্টে ছন্দে থাকা ব্যাটসম্যান কি একদিনের ক্রিকেট কিংবা টি-২০-তে একই রকম কার্যকরী? কোনওদিন ছিলেন? ভুক্তভোগী লখনউ সমর্থকদের একটা বড় অংশ সোশ্যাল মিডিয়ায় এহেন সওয়াল ভাসিয়ে দিয়েছেন।
২. প্রত্যাশার পাহাড়প্রমাণ চাপ:
আইপিএলের ইতিহাসে সবচেয়ে দামি খেলোয়াড়ের ট্যাগ ঝেড়েপুঁছে একটিবারও মাঠে নামতে পেরেছেন ঋষভ? ২৭ কোটির চাপে কি বেঁকে গিয়েছে পিঠ, নুয়ে পড়েছে আত্মবিশ্বাস? প্রাথমিক ধাক্কা ও অফ ফর্মের চক্করে এই জল্পনাই উসকে উঠছে। কে এল রাহুলকে সরিয়ে পন্থকে নামানো ব্যুমেরাং হয়ে গেল কিনা—ভাবছেন অনেকেই। এই সূত্রে লখনউ ড্রেসিং রুমের দমবন্ধকরা পরিস্থিতির কথাও চর্চিত হচ্ছে। রাহুল গোয়েঙ্কার টিম ছেড়ে জানিয়েছিলেন, এখানে স্বাধীনভাবে, একটু খোলামনে খেলার সুযোগ নেই। নয়া অধিনায়কও কি একই রকম পরিস্থিতির শিকার? আওয়াজ তুলেছেন অনেকেই।
৩. নেতৃত্বের পাষাণভার:
ইতিহাস বলছে, ঋষভ তখনই অপ্রতিরোধ্য হয়ে দেখা দিয়েছেন, যখন তাঁর উপর বাড়তি কোনও দায়িত্ব চাপানো হয়নি। কিন্তু লখনউয়ে আসার পর চিত্রটা পালটে গিয়েছে। শরীরী ভাষাই তার প্রমাণ। অবসাদ, সিদ্ধান্তহীনতা এবং নিতে গিয়ে বারবার হোঁচট খাওয়া—দস্তানা হাতে উইকেট পেছনে দাঁড়ানো ঋষভের হাবেভাবে স্বাভাবিক প্রাণখোলা মেজাজটাই আজ উধাও! সেটা কি আদৌ ফিরবে? ফিরলে কবে? এই প্রশ্নের উত্তরেই হয়তো লখনউ সুপার জায়ান্টসের প্লে-অফে ওঠা-না ওঠার প্রশ্নের জট লুকিয়ে।