
শেষ আপডেট: 31 December 2019 18:30
লাল লাইন হল দিল্লি মেট্রোর প্রথম অথবা প্রাচীনতম যাত্রাপথ। দু' হাজার দুইয়ের চব্বিশে ডিসেম্বর শুরু হল দিল্লি মেট্রোর চলাচল। উত্তর-পূর্ব দিল্লির শাহদারা থেকে উত্তর-পশ্চিম অভিমুখে পুরনো দিল্লির তিশহাজারি। মাত্র সওয়া আট কিলোমিটার। পরের বছর যুক্ত হল আরও চার কিলোমিটার। তিশহাজারি থেকে ত্রিনগর বা মেট্রোর ভাষ্যে ইন্দ্রলোক স্টেশন। যাত্রী হয় তবে ভিড়ভাট্টা নেই। দু' হাজার চারের বিশে ডিসেম্বর চালু হল হলুদ লাইনের প্ৰথম পর্যায়। দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে কাশ্মীরি গেট। এই প্রথম দিল্লি মেট্রো ভূগর্ভের মধ্যে দিয়ে যাতায়াত শুরু করল। লাল লাইন তো পুরোটাই মাটির উপর স্তম্ভ বা পিলার গড়ে তার ওপরে লাইন বিছিয়ে করা হয়েছিল। ভূগর্ভের ভেতর দিয়ে ট্রেন চলাচল করলে কেমন লাগে বোঝার জন্য কাজের চেয়ে বেড়ানোর মজা উপভোগ করার জন্যই তখন হলুদ লাইন জনপ্রিয়। তবে মাস ছয়েক বাদে দু' হাজার পাঁচের তেসরা জুলাই কাশ্মীরি গেট থেকে কেন্দ্রীয় সচিবালয় পর্যন্ত মেট্রোর যাত্রাপথ সম্প্রসারিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই দিল্লির গণপরিবহণ ব্যবস্থায় রাতারাতি পরিবর্তন ঘটে গেল। এখন আর কৌতূহল নিরসন বা জয়-রাইড নয়, মেট্রো হয়ে গেল অপরিহার্য। তারপর তো সময়ের সঙ্গে বেড়েই চলেছে যাত্রী এবং ট্রেন। কোনো কোনো স্টেশন তো সারাদিনই ভিড়ে ভিড়াক্কার।
পুল বাঙ্গাশ কিন্তু ব্যস্ত স্টেশন নয়। বরং বেশ নিরুত্তাপ। কাশ্মীরি গেট স্টেশনে হুড়মুড়িয়ে যাত্রী নামাওঠার পর ট্রেন চলতে শুরু করতে না করতেই চলে আসে তিশহাজারি। আদালতের সুবাদে এখানেও ভালোই ভিড়। তার দু' মিনিটের মধ্যেই পুল বাঙ্গাশ। কোনও হইচই নেই। নিঃশব্দে গুটিকয় যাত্রীর নামাওঠা। কর্তৃপক্ষের হিসেবে গড়ে সারাদিনে সাকুল্যে হাজার পনেরোর বেশি যাত্রীর পদচিহ্ন পুল বাঙ্গাশ স্টেশনে পড়ে না।
[caption id="attachment_173185" align="aligncenter" width="450"]
মিউটিনি মেমোরিয়াল[/caption]
আসবেই বা কেন? কাছাকাছির মধ্যে দেখার মতো আছে একমাত্র মিউটিনি মেমোরিয়াল । আঠারোশো সাতন্নর সিপাহী অভ্যুত্থানের সময় যেসব ব্রিটিশ সৈন্য এবং তাদের সহযোগী ভারতীয় সেনানী প্রাণ হারায় তাদের স্মৃতিতে নির্মিত একটি স্মারকস্তম্ভ। আঠারোশো বাষট্টিতে তড়িঘড়ি একটা অষ্টভূজ ভিতের ওপর গথিক শৈলীতে দুশো মিটার উঁচু এই স্তম্ভটি গড়ে তোলা হয়। ভারতের স্বাধীনতার রজত জয়ন্তী বর্ষ উদযাপনের সময় মিউটিনি মেমোরিয়াল নাম বদলিয়ে হয়ে গেল অজিতগড়। কাশ্মীরি গেটের কাছে অবস্থিত পুরোনো টেলিগ্রাফ ভবনের সামনে থাকা অজিতগড় নিয়ে পর্যটন কর্তৃপক্ষের প্রচারও নেই। তাছাড়া প্রায় এক দশক আগে দেশ থেকে টেলিগ্রাফ ব্যবস্থা উঠে যাওয়ার পর দপ্তরটিও মোটামুটি পরিত্যক্ত। কাজেই সবমিলিয়ে অজিতগড় সম্পর্কে পর্যটকের বা দর্শকের কোনও আগ্রহ নেই। কাছাকাছি এলাকায় কাশ্মীরি গেট, তিশহাজারি, আজাদ মার্কেট, কমলা নেহরু সংরক্ষিত অরণ্য এমনকি একটু দূরের দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয়ের চত্বর সর্বক্ষণ প্রাণচঞ্চল থাকলেও পুল বাঙ্গাশ কেমন যেন পরিত্যক্ত হয়ে পড়ে আছে।
এমন এক বিচ্ছিন্ন-বিষণ্ন এলাকার নামকরণ নিয়ে কোনও কৌতূহল নেই। কারো মনে প্রশ্ন জাগে না জায়গাটার এমন একটা বিচিত্র নাম কেন হল। ইতিহাসের নথি অনুসারে সপ্তদশ শতাব্দীতে শাহজাহানের নির্দেশে যমুনা থেকে পশ্চিম অভিমুখে একটি খাল কাটা হয়েছিল। শাহজাহানাবাদের প্রধান স্থপতি আলী মর্দান খানের পরিকল্পনায় এই খালটি খনন হয়েছিল বলে এর নাম রাখা হয় আলী মর্দান খাল। মোঘল সাম্রাজ্যের সম্পূর্ণ পতনের আগেই অবিশ্যি খালটি শুকিয়ে যায়। অষ্টাদশ শতকের সূচনাপর্বে দিল্লির মসনদে বসে মোঘল উত্তরসূরি ফারুকশিয়ার রাজত্ব শুরু করার সময় জনৈক মোহাম্মদ খান বাঙ্গাশ-এর সঙ্গে বন্ধুত্ব হয়। কেন? অথবা কে এই মোহাম্মদ খান বাঙ্গাশ?
[caption id="attachment_173188" align="aligncenter" width="436"]
মোহাম্মদ খান বাঙ্গাশ [/caption]
অবিভক্ত ভারত আর আফগানিস্তানের সীমানা এলাকায় বসবাসকারী পাখতুন বাঙ্গাশ জনজাতির খাগজাই বংশের মানুষ মোহাম্মদ খান বাঙ্গাশ। যোদ্ধা হিসেবে এই জনজাতির খ্যাতি আছে। আওরঙ্গজেবের আমলে মোহাম্মদ খান বাঙ্গাশ-এর বাবা ভারতবর্ষে বসবাস শুরু করেন। এবং মোঘল ফৌজের সঙ্গে বিভিন্ন যুদ্ধে অংশ নেন। পিতার মৃত্যুর পর মোহাম্মদ খান বাঙ্গাশ এই যোদ্ধাদের নেতৃত্বে চলে এলেন। মোঘল দরবারের সঙ্গে বন্ধুত্ব অটুট রইল। তখন মোহাম্মদ খান বাঙ্গাশ-এর নিয়ন্ত্রণে রয়েছে বাহান্ন হাজার সৈন্যের এক বিশাল বাহিনী। মোঘল দরবারের অবস্থা তখন বেশ বেসামাল। ইতিমধ্যে এখনকার উত্তর প্রদেশের এক বিরাট এলাকায় মোহাম্মদ খান বাঙ্গাশ প্রতিষ্ঠা করলেন এক নতুন রাজ্য। মোঘল দরবারে অধিষ্ঠিত বন্ধু ফারুখশিয়ারের নামে রাজ্যের নাম রাখা হল,- ফারুখাবাদ। পরে এখনকার হরিয়ানার গুরগাঁও জেলায় প্রতিষ্ঠিত হল ফারুখনগর। এমন বন্ধুকে দূরে সরিয়ে রাখা যায়? কাজেই মূল শাহজাহানাবাদের বাইরে আলী মর্দান খালের ওপারে নির্মিত হল মোহাম্মদ খান বাঙ্গাশ-এর প্রাসাদ। খালের জন্য শাহজাহানাবাদের দরবারে বা চাঁদনী চকের বাজারে আসতে অনেক সময় লাগে। লোকশ্রুতি এই সময় মোহাম্মদ খান বাঙ্গাশ-এর পত্নী রাবেয়া বেগম পরামর্শ দেন যে খালের ওপর একটি সেতু তৈরি করে দিলেই সমস্যার সমাধান হতে পারে। কাজেই তৈরি হল সেতু বা পুল। এবার আর বন্ধুর নামে নয় সরাসরি নিজের বংশের নামেই সেতুর নাম হল, - পুল বাঙ্গাশ। শোনা যায় রাবেয়া বেগমের পরামর্শে এখনকার মাটিয়া মহল থেকে দিল্লি গেট পর্যন্ত যে রাস্তা গেছে সেখানে নির্মিত হয়েছিল কামরা বাঙ্গাশ নামের একটি হাভেলী। চাঁদনী চকের প্রান্তে অবস্থিত ফতেপুরী মসজিদের কাছেও নাকি সরাই বাঙ্গাশ নামের একটি সরাইখানা গড়ে উঠেছিল।
ইতিহাসের নথি, লোকশ্রুতি ইত্যাদি নিয়ে গড়ে ওঠা পুল বাঙ্গাশ-এর কাহিনী খুঁজতে গিয়ে কোনও ধ্বংসাবশেষের হদিশ পাওয়া মুশকিল। এমনকি মোহাম্মদ খান বাঙ্গাশ-এর সমাধিও এখানে নেই। সতেরোশো তেতাল্লিশে মোহাম্মদ খান বাঙ্গাশ-এর মৃত্যুর পর তাঁকে ফারুখাবাদে সমাধিস্থ করা হয়। এখনকার ফারুখবাদের হায়াৎ বাগ-এ এখনও টিকে আছে মোহাম্মদ খান বাঙ্গাশ-এর সমাধিস্মারক। স্বস্তির বিষয় সেতু বা পুল এমনকি খাল না থাকলেও জায়গাটা কিন্তু পুল বাঙ্গাশ নামেই এখনও পরিচিত। এবং মেট্রো রেলের সুবাদে দিল্লিতে সর্বজনবিদিত।
চেনা দিল্লির অচেনা কাহিনী জানার জন্য ক্লিক করুন নীচের লাইনে