Date : 15th Apr, 2026 | Call 1800 452 567 | info@thewall.in
৭ শতাংশ ফ্যাট, ৫০ শতাংশ পেশি! যে ডায়েট মেনে চলার কারণে রোনাল্ডোর এখনও যন্ত্রের মতো সচলগুগল এখন অতীত, AI দেখে ওষুধ খাচ্ছেন মানুষ! বেশিরভাগ রোগ চিনতে না পেরে জটিলতা বাড়াচ্ছে চ্যাটবট 'ডাহা মিথ্যে তথ্য দিয়েছে রাজ্য', সুপ্রিম কোর্টে ডিএ মামলার শুনানি পিছতেই ক্ষুব্ধ ভাস্কর ঘোষBasic Life Support: চলন্ত ট্রেনে ত্রাতা সহযাত্রীই! সিপিআরে মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরলেন মহিলামহিলা বিল পেশ হলে রাজ্য অচলের ডাক স্ট্যালিনের, কেন্দ্রের সিদ্ধান্তকে কেন ষড়যন্ত্র বলছে ডিএমকে আজ চ্যাম্পিয়নস লিগের মহারণ! উদ্দীপ্ত এমিরেটসের কতটা ফায়দা নিতে পারবে আর্সেনাল? দ্রুত রোগা হওয়ার ইনজেকশন শেষ করে দিচ্ছে লিভার-কিডনি? ভুয়ো ওষুধ নিয়ে সতর্ক করলেন চিকিৎসকরাপ্রথম দফার ভোটে কেন্দ্রীয় বাহিনীর সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে নামছে ৪০ হাজার রাজ্য পুলিশ, কোন জেলায় কত‘ভয় নেই, আমিও কারও বাবা...’ সব পুরুষ সমান নয় - বার্তা নিয়ে মুম্বইয়ের রাস্তায় ছুটে চলেছে এই অটোহরর নয়, এক ব্যক্তিগত ক্ষতের গল্প—‘দ্য মামি’ নিয়ে মুখ খুললেন পরিচালক

আজও দাপট দেখায় এই উপজাতি, সাইবেরিয়ার হাড় হিম করা পরিবেশে

রূপাঞ্জন গোস্বামী উত্তর দিকে উত্তর মহাসাগর। দক্ষিণে কাজাখিস্তান, মঙ্গোলিয়া ও চীন সীমান্ত। পূর্বে প্রশান্ত মহাসাগর এবং পশ্চিমে উরাল পর্বতমালা। মাঝখানে এক কোটি একত্রিশ লক্ষ বর্গ কিলোমিটার এলাকা জুড়ে অবস্থান করছে তুষারমরু সাইবেরিয়া। বছরে মাত

আজও দাপট দেখায় এই উপজাতি, সাইবেরিয়ার হাড় হিম করা পরিবেশে

শেষ আপডেট: 21 April 2020 04:03

রূপাঞ্জন গোস্বামী
উত্তর দিকে উত্তর মহাসাগর। দক্ষিণে কাজাখিস্তান, মঙ্গোলিয়া ও চীন সীমান্ত। পূর্বে প্রশান্ত মহাসাগর এবং পশ্চিমে উরাল পর্বতমালা। মাঝখানে এক কোটি একত্রিশ লক্ষ বর্গ কিলোমিটার এলাকা জুড়ে অবস্থান করছে তুষারমরু সাইবেরিয়া। বছরে মাত্র ৮ থেকে ১০ সপ্তাহ থাকে গ্রীষ্মকাল। এই তীব্র ও অসহনীয় ঠান্ডার জন্য সাইবেরিয়ার সাদা বুকে সবুজের দেখা মেলে খুব কম। চুড়ান্ত খাদ্যাভাবের খুবই অল্প কিছু প্রাণী নিজেদের অস্ত্বিত্ব টিকিয়ে রাখতে পেরেছে সাইবেরিয়াতে। এদের মধ্যে আছে বাঘ, আমুর চিতা, মেরু বিড়াল, বাদামি ভাল্লুক, বলগা হরিণ, কস্তুরী হরিণ, গোরাল, হরিণ, নেকড়ে, রাকুন ও হাসকি কুকুর, কাঠবেড়ালী। মানুষের বসবাসের পক্ষে অনুপযুক্ত আবহাওয়া মনে হলেও, এক লাখ বছর আগে এই সাইবেরিয়াতেই গড়ে উঠেছিল মানুষের বসতি। সাইবেরিয়ার একটু উষ্ণ অংশের বিভিন্ন শহরে সভ্য ও আধুনিক মানুষ বাস করলেও, সাইবেরিয়ার মৃত্যুশীতল পরিবেশে দাপট একদল মানুষেরই, তাদের নাম 'ডলগ্যান'। [caption id="attachment_211241" align="alignnone" width="1024"] ডলগ্যান উপজাতি।[/caption] ডলগ্যানদের দেখতে পাওয়া যায় মধ্য ও পূর্ব সাইবেরিয়াতে। এই উপজাতিটি অত্যন্ত  স্বাধীনচেতা। অনেক নৃবিজ্ঞানীর মতে  ডলগ্যানরা মধ্য এশিয়ার লড়াকু তাতারদের বংশধর। এশিয়া থেকে হাজার হাজার বছর আগে তারা সাইবেরিয়া গিয়েছিল খাদ্যের সন্ধানে। রাশিয়ার মধ্যে বাস করেও, আজও ডলগ্যান উপজাতি সভ্যতা থেকে নিজেদেরকে ইচ্ছা করেই দূরে রেখেছে। তুষারঝড় ও হাড়হিম করা ঠান্ডার মধ্যে প্রতিনিয়ত লড়াই করে বেঁচে থাকতে হয়  ডলগ্যানদের।
ডলগ্যানরা যাযাবর
গ্রীষ্মকালে ডলগ্যানরা দলবেঁধে যায় উত্তরের দিকে। শীতের সময় আবার ফিরে আসে দক্ষিণে দিকে, একই পথ ধরে। প্রত্যেক বছর উত্তর-দক্ষিণের হিসাব ঠিক থাকলেও, যাত্রাপথ পরিবর্তন করে ডলগ্যানেরা। পুরনো রুটে ফিরে আসে তিন বছর অন্তর অন্তর। আফ্রিকার মাসাই উপজাতিদের বাঁচার রসদ যেমন গরু, সাইবেরিয়ার ডলগ্যানদের তেমন বলগা হরিণ। এই বলগা হরিণেরা যাযাবর ডলগ্যানদের জোগায় খাদ্য ও বস্ত্র, স্লেজ গাড়ি টেনে এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় নিয়ে যায় গোটা গ্রামকে। গড়ে আটশো কেজি ওজনের এই বিশাল শিংওয়ালা হরিণগুলির ওপর নির্ভর করেই বেঁচে রয়েছে ডলগ্যান উপজাতি। [caption id="attachment_211242" align="aligncenter" width="600"] উপযুক্ত জায়গায় গ্রাম পাতার জন্য এগিয়ে চলেছে ডলগ্যান উপজাতিরা।[/caption] প্রতিটি ডলগ্যান গোষ্ঠিতে কয়েকশো বলগা হরিণ থাকে। কয়েকশো মাইল বরফের ওপর দিয়ে যাওয়ার পর, কোথাও বলগা হরিণদের খাবার জন্য ঘাস বা গুল্ম পাওয়া গেলে সেখানেই অস্থায়ী গ্রাম পেতে ফেলে ডলগ্যানরা। স্লেজ থেকে নামানো হয় ডলগ্যানদের চলমান বাড়ি। বাক্স বা শঙ্কু আকৃতির বাড়িগুলির নাম ‘চাম’। শঙ্কু আকৃতির বাড়িগুলি সাধারণত একটি কক্ষের হয়। বাক্স আকৃতির বাড়িগুলিতে দুটি কক্ষ থাকে। গোষ্ঠীর প্রতিটি পরিবারের নিজস্ব একটি বাড়ি থাকে। প্রতিটি পরিবারের ছেলেদের বিয়ের পর আলাদা বাড়ি বানিয়ে নিতে হয়। ডলগ্যানদের বাড়িগুলিতে একটা জানলা থাকে। বাড়ির ভেতরে সারাদিন জ্বলে চর্বির প্রদীপ। কার্বন-ডাই-অক্সাইড বের করে দেওয়ার জন্য থাকে বিশেষ ধরনের চিমনি। [caption id="attachment_211244" align="alignnone" width="2048"] ঘরের ভেতরে ডলগ্যান পরিবার।[/caption]
সারাদিন কাজে ব্যস্ত থাকে ডলগ্যানরা
স্লেজ থেকে অসংখ্য বাড়ি নামিয়ে, নির্জন জায়গাটিতে অস্থায়ী গ্রাম তৈরি করে ফেলার পর, ডলগ্যানরা তাদের অনান্য কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়ে। এক একটি অস্থায়ী গ্রামে গ্রামবাসীর সংখ্যা ৫০ থেকে ৬০০ জন পর্যন্ত হতে পারে। গ্রামের বাচ্চা থেকে বুড়ো সবাইকেই দেখা যায় সারাদিন কিছু না কিছু কাজ করতে। ডলগ্যান নারীরা পরিবারের জন্য খাবার বানায়। বিভিন্ন পশুর পশম ও চামড়া দিয়ে দিয়ে পোশাক, বিছানার চাদর, তাঁবু তৈরি করে। বলগা হরিণের পায়ের চামড়া দিয়ে জুতো বানায়। বিভিন্ন পশু পাখির নাড়িভুঁড়ি শুকিয়ে ও পাকিয়ে এরা সুতোর কাজ চালায়। নারীদের আরেকটি কাজ হল, গ্রামের নিরাপত্তারক্ষীদের দেখভাল করা। এক একটি ডলগ্যান গ্রামে পঞ্চাশ থেকে ষাটটা চুকচা বা হাস্কি প্রজাতির কুকুর থাকে। ভয়ঙ্কর বদমেজাজি কিন্তু পরিশ্রমী কুকুরগুলিকে ডলগ্যানরা প্রচণ্ড ভালবাসে। কুকুরগুলি গ্রামের নিরাপত্তা দেওয়া ছাড়াও, প্রয়োজনে স্লেজ টানে ও  বলগা হরিণদের চরার সময় চোখে চোখে রাখে। যাতে কোনও বলগা হরিণ দলছুট না হয়। [caption id="attachment_211246" align="aligncenter" width="964"] বলগা হরিণেরা চরে বেড়াচ্ছে,,পাহারায় আছে ডলগ্যানরা।[/caption] ডলগ্যান পুরুষদের কাজের শেষ নেই। তারা  শিকারে যায়। কাঠ, হাড়, চামড়া দিয়ে শিকারের অস্ত্র তৈরি করে। স্লেজ গাড়িতে বহনযোগ্য মাছ ধরার নৌকা তৈরি করে। বলগা হরিণদের দেখভাল করে ও হরিণগুলির প্রজনন ঘটায়। হরিণের গা থেকে পশম তোলে। বরফের তলায় জমিয়ে রাখা মাছ বা মাংস কুড়ুল দিয়ে কাটে। জ্বালানি কাঠ জোগাড় করে। গ্রীষ্মকালে দূর থেকে স্লেজে করে পরিষ্কার বরফ খন্ড নিয়ে আসে খাবার জল বানাবার জন্য। শহরে যায় বলগা হরিণের মাংস, জমাট দুধ, পশম ও চামড়া বেচে প্রয়োজনীয় খাবার দাবার, লবণ, ওষু্‌ধ, বাসনপত্র কিনে আনতে। স্থানান্তরের সময় গ্রাম গুটিয়ে স্লেজে বোঝাই করে।
আদিম খাদ্যে  আজও পেট ভরে ডলগ্যানদের
আজও ডলগ্যানেরা শিকারের মাধ্যমেই খাবার জোগাড় করে। কারণ তারা কৃষিকাজ জানে না। ডলগ্যানদের গ্রামে একাধিক পরিবার মিলে এক একটি শিকারের দল গঠন করে। এরকম দশ বারোটি দল এক সাথে শিকারে বার হয়। শিকার করে কয়েক ধরনের হরিণ, খরগোশ, শিয়াল, পাখি। জমে যাওয়া নদীর বুকে গর্ত করে বিশেষ কায়দায় মাছও ধরে। তারপর গ্রামে ফিরে শিকার করা পশুপাখির মাংস ও মাছ, সমান ভাগে ভাগ করা হয় প্রতিটি পরিবারের জন্য। ভাগ হয়ে যাওয়া পশুপাখির মাংস ও মাছ পর বরফে গর্ত খুঁড়ে রেখে দেওয়া হয়। কখনও আবার স্লেজে রেখে বরফ চাপা দিয়ে রেখে দেওয়া হয়। খাবার সময় প্রয়োজন মত প্রকৃতির ডিপ-ফ্রিজ থেকে বের করে নেওয়া হয়। [caption id="attachment_211248" align="aligncenter" width="600"] বরফে রেখে দেওয়া হয়েছে বল্গা হরিণের মাংস।[/caption] ডলগ্যানদের প্রধান খাবারগুলি হল, বলগা হরিণ, পাহাড়ি ভেড়া, খরগোশ, হাঁস ও বিভিন্ন পাখির মাংস। এছাড়াও তারা খায় মাছ ,পাখির ডিম ও বলগা হরিণের দুধ। আটা জাতীয় খাবার খুব কমই খায় ডলগ্যানরা। সবজি প্রায় খায় না বললেই চলে। গ্রীষ্মের সময় মাশরুম সংগ্রহ করে রাখে শীতে খাওয়ার জন্য। সাধারণত নভেম্বর মাসে ডলগ্যানেরা মাংসের জন্য পোষা বলগা হরিণ কাটে। কারণ শীতকালে অবিশ্বাস্য ঠাণ্ডা ও তুষারপাতের মধ্যে অনেক সময় পাঁচফুট দূরের বস্তু দেখা যায় না। শিকার করা তো দূরের কথা, ঘরগুলি থেকে বেরোনোও তখন সম্ভব হয় না। তখন বলগা হরিণের মাংস, জমাট দুধ, রক্ত, চর্বি আর বরফে কাঠ হয়ে থাকা মাছই ডলগ্যানদের প্রধান খাদ্য হয়ে ওঠে। ডলগ্যানদের রান্না করার পদ্ধতি খুবই সাধারণ। ডেকচিতে মাছ বা মাংস সেদ্ধ করে তাতে কয়েক ধরণের জড়িবুটি ও একটু লবন ফেলে দেওয়া। ডলগ্যানরা বলগা হরিণের দুধও খায় লবণ ফেলে। হিমায়িত কাঁচা মাছ বা পশুর মেটে পাতলা ফালি করে কেটে লবণ ছড়িয়ে কাঁচা খায়। ডলগ্যানদের খাবারে চিনির ব্যবহার নেই বললেই চলে। বরফে জমানো দুধ ও চর্বির টুকরো সারাক্ষণ মুখে রেখে লজেন্সের মতো চুষে খায় ডলগ্যানরা। [caption id="attachment_211249" align="aligncenter" width="652"] লবণে জারানো কাঁচা মাছের টুকরো, খেতে হবে গাছের ডাল দিয়ে তৈরি কাঁটা দিয়ে।[/caption]
ডলগ্যানদের সমাজে বয়স্করা পান সর্বোচ্চ সম্মান
ডলগ্যান সমাজে বয়স্ক নারী পুরুষদের কথাকে সবাই বেদবাক্য বলে মানে। বয়স্কদের কাজ গ্রামবাসীদের মধ্যে একতা ধরে রাখা ও বিয়ের ঘটকালি করা। সাধারণত চারপুরুষ দূরের সম্পর্কে বিয়ে হতে বাধা নেই। তুতো ভাইবোনদের মধ্যেও বিবাহ হয়, তবে কম। প্রেম করে বিয়েও হয়। কিন্তু বিয়ের আগে বাড়ির সবচেয়ে বয়স্ক মানুষটির অনুমতি নিতে হবে। তিনি অনুমতি দিয়েই দেন, কারণ এখনও ডলগ্যানদের সমাজে প্রেম করলে বিয়ে করা বাধ্যতামূলক। বিয়েতে কনেপক্ষ যৌতুক হিসাবে দেয় বলগা হরিণ, মাছ ধরার নৌকা বা শহুরে বাসনপত্র। বিয়ে হয় কনের বাড়িতে। তিনদিন ধরে চলে খানাপিনা। আত্মীয়রা দূরদূরান্ত থেকে আসে স্লেজ গাড়ি চালিয়ে। [caption id="attachment_211251" align="aligncenter" width="556"] ডলগ্যানদের আকাশে অরোরা বোরিয়ালিস।[/caption] .জন্মের মতোই মৃত্যু আসে ডলগ্যানদের জীবনে। মৃত্যুর পর মৃতদেহ দুদিন বাড়িতে শুইয়ে রাখা হয়। তৃতীয় দিন বিকেল বেলায় বরফের সমাধিতে শুইয়ে দেওয়া হয় মানুষটিকে। মৃত মানুষটি পুরুষ হলে সঙ্গে দেওয়া হয় তির ও ধনুক। নারী হলে দেওয়া হয় চিরুনি ও ছুঁচ সুতো। অস্থায়ী গ্রামটির এমন এক জায়গায় সমাধিস্থ করা হয় মানুষটিকে, যে জায়গাটিকে পরবর্তীকালে সহজে চিহ্নিত করা যাবে। সমাধির ওপরে কাঠ দিয়ে ক্রস চিহ্ন তৈরি করা হয়। সেই রাতে বলগা হরিণের মাংসের ভোজ দেওয়া হয়। সন্তানেরা বলগা হরিণের মাথাটি রেখে আসে হয় সমাধির ওপর। হিমশীতল তুষারমরুর বরফের নীচে শুয়ে থাকে রুদ্ধশ্বাস ও লড়াকু জীবন শেষ করা এক ডলগ্যান। তিন বছর পর এই রুটেই ফিরে আসবে তার সন্তানেরা, সেই আশা নিয়ে।
আরও পড়ুন:পৃথিবীর সবচেয়ে দূরে থাকা দ্বীপে বাস করে আধুনিক মানুষ! আছে ইন্টারনেটও!

```