Date : 15th Apr, 2026 | Call 1800 452 567 | info@thewall.in
নববর্ষে রাজ্যপালের মুখে ‘পরিবর্তনের’ ডাক! ‘লাটসাহেব’কে নিয়ে ছেড়ে কথা বললেন না মমতাওস্যালাড খেলেই সুস্বাস্থ্য নয়! ভুলেও কাঁচা খাবেন না এই ৩ সবজি, কারণ জানুনইরানকে কি অস্ত্র দিচ্ছে চিন? শি জিনপিংয়ের চিঠির পর জল্পনা ওড়ালেন ট্রাম্প'দেশু ৭'-এ অনির্বাণ, এবার ‘বাইক অ্যাম্বুলেন্স দাদা’য় কোন নায়কের এন্ট্রিতে চমক?এখনই সুরাহা নেই! রান্নার গ্যাসের আকাল চলতে পারে আরও ৪ বছর, দুশ্চিন্তা বাড়বে ভারতের আমজনতার?লোকসভার আসন বেড়ে হচ্ছে ৮৫০, কতটা লাভ বাংলার? সবচেয়ে বেশি ও কম সিট বাড়ছে কোন রাজ্যে?নববর্ষে কলকাতা সফরে আইওসি-র শীর্ষ কর্তা, এলপিজির বাস্তব পরিস্থিতি দেখতে হাজির গ্যাসের দোকানেও৮ হাজার লিটার গঙ্গাজল, গরু আর রুপোর কলসী! ফিরে দেখা জয়পুরের মহারাজার আজব লন্ডন-সফরগুয়ার্দিওলা-পরবর্তী ফুটবলের নমুনা মেলে ধরেছে কোম্পানি আমলের বায়ার্ন! আজ সামনে রিয়ালআশা ভোঁসলের শেষযাত্রায় যাননি শাহরুখ-সলমন! বিতর্কের অবসান ঘটিয়ে সামনে এল আসল কারণ

আতঙ্কের মেঘে ঢাকা 'গ্যাং-ল্যান্ড', যেখানে বীরের সম্মান পায় নৃশংস গ্যাংস্টারেরা

রূপাঞ্জন গোস্বামী 'গ্যাং-ল্যান্ড' নামে ভারতেও কোনও রাজ্য নেই। তবুও বিশাল এই এলাকাটির অস্তিত্ব আছে উত্তর-পশ্চিম ভারতের সাধারণ মানুষ ও পুলিশের কাছে। পাঞ্জাবকে কেন্দ্র করে হরিয়ানা, দিল্লি ও হিমাচলকে নিয়ে গড়ে উঠেছে গ্যাংস্টারদের কাল্পনিক রাজ্য

আতঙ্কের মেঘে ঢাকা 'গ্যাং-ল্যান্ড', যেখানে বীরের সম্মান পায় নৃশংস গ্যাংস্টারেরা

শেষ আপডেট: 12 June 2021 13:45

রূপাঞ্জন গোস্বামী

'গ্যাং-ল্যান্ড' নামে ভারতেও কোনও রাজ্য নেই। তবুও বিশাল এই এলাকাটির অস্তিত্ব আছে উত্তর-পশ্চিম ভারতের সাধারণ মানুষ ও পুলিশের কাছে। পাঞ্জাবকে কেন্দ্র করে হরিয়ানা, দিল্লি ও হিমাচলকে নিয়ে গড়ে উঠেছে গ্যাংস্টারদের কাল্পনিক রাজ্য 'গ্যাং-ল্যান্ড'। যেখানকার নীতি হল, 'মারো এবং মরো।' জীবনটাকে বেশি লম্বা করার দরকার নেই। তবে মৃত্যুর আগে রাজার মত বেঁচে নাও।" মুম্বাইয়ের দাউদ ইব্রাহিম, ছোটা রাজন, আবু সালেম, অরুণ গাওলি, ছোটা শাকিল, মায়া ডলাস, দিলিপ বুয়া, রবি পূজারী, ভরত নেপালি, ইজাজ লাকড়াওয়ালার মত গ্যাংস্টারেরা উঠে এসেছিল বস্তি থেকে। কিন্তু গ্যাং-ল্যান্ডের গ্যাংস্টারেরা আসে উচ্চবিত্ত পরিবার থেকে। বেশিরভাগই ধনী কৃষক, অনাবাসী ভারতীয়, পুলিশ অফিসার বা ব্যবসায়ীর কলেজে পড়া সন্তান। [caption id="attachment_2312620" align="aligncenter" width="600"] গ্যাং-ল্যান্ডের কয়েকজন কুখ্যাত গ্যাংস্টার[/caption] এদের মধ্যে কেউ আবার জাতীয় স্তরের অ্যাথলিট, কেউ বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র নেতা, কেউ গায়ক। এরা ব্যবহার করে ব্র্যান্ডেড জামা কাপড়, সানগ্লাস, ঘড়ি ও দামি গাড়ি। এরা যেকোনও গ্রামে ঢুকলে প্রণাম করে গ্রামবাসীরা। এদের সামনে মাথা ঝোঁকায় রাজনৈতিক নেতারা। না চাইতেই গাড়ির সিটে রেখে দেওয়া হয় টাকা। যার নাম 'প্রোটেকশন মানি'। এই জীবন পাওয়ার জন্য এরা হাতে তুলে নেয় বন্দুক। জড়িয়ে যায় বন্দুক ও বদলার এক ভয়ঙ্কর জগতে। বন্দুক ও বদলার এই ভয়ঙ্কর জগৎ পাঞ্জাবকে ঘিরে শুরু হয়েছিল ষাটের দশকে। তখন পাঞ্জাব, হরিয়ানা ও উত্তরপ্রদেশে চলছিল সবুজ বিপ্লব। এর ফলে এক শ্রেণীর কৃষকের সম্পত্তি ক্রমশ বৃদ্ধি পেয়েছিল। পরিবার ও সম্পত্তির সুরক্ষার জন্য বন্দুক বাড়িতে রাখতে শুরু করেছিলেন বিত্তশালী কৃষকেরা। জীবনের অঙ্গ হয়ে গিয়েছিল বন্দুক। যার প্রভাব পড়েছিল খালিস্তানি আন্দোলনে। ১৯৮৫ সালে পাঞ্জাব ইউনিভার্সিটির ছাত্র নেতা প্রভজিন্দর সিং ডিম্পি, তার প্রতিদ্বন্দ্বী ছাত্রনেতা মাখন সিংকে গুলি করে মেরেছিল ক্যাম্পাসের মধ্যে। এরপর বিত্তশালী কৃষক পরিবারের সন্তান ডিম্পি তৈরি করেছিল প্রথম গ্যাং। অপরাধ থেকে সংগ্রহ করা অর্থের অনেকেটাই বিলিয়ে দেওয়ায়, সাধারণ মানুষের কাছে ডিম্পি হয়ে উঠেছিল রবিন হুড। ডিম্পির জীবনযাত্রায় আকর্ষিত হয়েছিল বহু উচ্চবিত্ত পরিবারের যুবক। যারা বিত্তশালী কৃষক পরিবারের সন্তান হয়েও চাষ করতে আগ্রহী ছিল না। যাদের লক্ষ্য ছিল ডিম্পির মত খ্যাতি  প্রভাব ও প্রতিপত্তি অর্জন করা। পুলিশের গুলিতে ২০০৬ সালে চন্ডীগড়ে মারা পড়েছিল ডিম্পি। অপরাধী ডিম্পির পথ বেছে নিয়েছিল ঝকঝকে চেহারার বেশ কিছু যুবক। এইভাবেই গ্যাংল্যান্ডের জমিতে এসেছিল জাসবিন্দার সিং রকি, লাভলি বাবা, সুখা কাহলোঁ, ভিকি গৌন্ডার, দাভিন্দর বাম্বিহা, শেরা খুবান, গুরবক্স সেওয়েওয়ালা, তিরাথ সিং, হ্যারি চাঠঠা, প্রেমা লাহোরিয়া, লরেন্স বিশ্নোই, রুপিন্দর গান্ধি, বান্টি ধিলোঁ, মনপ্রীত মান্না ও প্রভদীপ সিং, সুপ্রীত সিং জাম্পিরা। এসেছিল পুলিশ কর্তার সন্তান ও জাতীয় স্তরের হ্যামার থ্রোয়ার জয়পাল সিং ভুল্লার। ২০২১ সালের ৯ জুন কলকাতার নিউটাউনে পুলিশের সঙ্গে এনকাউন্টারে নিহত হয়েছে এই জয়পাল সিং ভুল্লার। এই গ্যাংস্টারেরা মূলত সুপারি নিয়ে খুন, অপহরণ, হাইওয়ে ডাকাতি, ব্যাঙ্ক ডাকাতি, সম্পত্তি কেনাবেচা, প্রোটেকশন মানি আদায়, এটিএম ভাঙা, ড্রাগ পাচার, অস্ত্র পাচার করে। এদের মধ্যে যে যত নৃশংস হতে পারবে তার তত সম্মান। একবার একটি দলের গ্যাংস্টার প্রতিপক্ষ গ্যাংস্টারকে গুলি করে মেরেও ক্ষান্ত হয়নি। মৃতদেহের ওপর গাড়ি চালিয়েছিল কয়েকশো বার। রাস্তা থেকে বেলচা দিয়ে চেঁচে তুলতে হয়েছিল মৃতদেহ। ঠিক এতটাই নৃশংস এই গ্যংস্টারেরা। এদের মাথার দাম লক্ষ লক্ষ টাকা হলেও, সুখে দুঃখে সাধারণ মানুষের পাশে থাকায় এরাই একদিন হয়ে যায় 'মসিহা'। নবীন প্রজন্মের এই গ্যাংস্টারেরা সোশ্যাল মিডিয়ায় ভীষণ সক্রিয়। সোশ্যাল মিডিয়াই তাদের নির্মমতার প্রচার ও প্রসারের অন্যতম মাধ্যম। গ্যাং-ল্যান্ডের গ্যাংস্টারেরা মনে করে, কোনও হত্যা তখনই সম্পুর্ণ হবে, যখন সেই হত্যার দায় সবার সামনে নেওয়া হবে। এই ক্ষেত্রে ফেসবুক হল এদের অন্যতম হাতিয়ার। ২০১৬ সালের এপ্রিল মাসে, গ্যাংস্টার জসবিন্দার সিং রকিকে হিমাচলের পারওয়ানুতে গুলি করে মেরেছিল বিরোধী গ্যাংস্টারেরা। পরদিনই নিজের ফেসবুক পেজে সে হত্যার কৃতিত্ব নিয়েছিল সম্প্রতি কলকাতায় নিহত গ্যাংস্টার জয়পাল ভুল্লার। একই কৃতিত্বের দাবি করেছিল একদা জয়পালের বন্ধু থেকে শত্রু হয়ে যাওয়া ভিকি গোউন্ডার। দু'জনেই আজ নিহত পুলিশের গুলিতে। [caption id="attachment_2312647" align="aligncenter" width="461"] গ্যাংস্টার জয়পাল ভুল্লার[/caption] কিন্তু তাদের ফেসবুক পেজে গেলে দেখা যাবে, বেশিরভাগ পোস্টের কমেন্টে লেখা আছে, 'রেস্ট ইন পিস', 'মিস ইউ ভাই', 'স্টিল লাভ ইউ ব্রাদার'। আর লেখা আছে বদলা নেওয়ার কথা। হ্যাঁ, এক গ্যাংস্টার নিহত হলে তার পেজে অসম্মান জনক কমেন্ট বা ছবি পোস্ট করে বিরোধী পক্ষের লোকেরা। সে সব কমেন্ট মোছা হয় না। বদলার আগুন বুকে জ্বলতে দেওয়ার জন্য সযত্নে রেখে দেওয়া হয় কমেন্ট বক্সে। ঠিক সময়ে শুরু হয়ে যায় ভয়াবহ 'গ্যাং ওয়ার'। তবে গ্যাং-ল্যান্ড ও সোশ্যাল মিডিয়াতে রাজত্ব একজনেরই। তার নাম সুখা কাহালোঁ। গ্যাং-ল্যান্ডের বেতাজ বাদশা। শান্ত, নম্র, সবসময় হাসিমুখে থাকা সুখা কাহালোঁর ছবি দেখে কেউ বিশ্বাসই করতে পারবেন না যে এই যুবকটি ছিল পাঞ্জাব, হরিয়ানা, হিমাচলের ত্রাস। ফেসবুককে তার প্রচারের অন্যতম হাতিয়ার করেছিল সুখা। ফেসবুকে নিজের প্রোফাইলের নাম দিয়েছিল 'সুখা কাহালোঁ শার্প শ্যুটার'। [caption id="attachment_2312669" align="aligncenter" width="552"] সুখা কাহালোঁ[/caption] নিজের পেজে নিজের পরিচয় দিতে গিয়ে সুখা লিখেছিল,"পঁচ্চিশ পিন্দা ছা চার্চা, জাট তে ৩০২ দা পারচা"। সে বোঝাতে চেয়েছিল, বেশিরভাগ মানুষ কথা বলে পঁচিশটি গ্রাম নিয়ে, কিন্তু এই জাঠের কাছে আছে ধারা ৩০২ বা খুনের পর্চা। তাই চর্চা করতে হলে আমাকে নিয়ে করো। সুখার বিরুদ্ধে পাঞ্জাব হরিয়ানা, রাজস্থান এমনকি বাংলাতেও দায়ের করা হয়েছিল খুন, খুনের চেষ্টা ও অপহরণের চল্লিশটি মামলা। নিজের অসংখ্য ছবি সুখা আপলোড করেছিল তার অফিসিয়াল পেজে। তার মধ্যে একটি ছবিতে দেখা যায়, সুখা একটি ক্ষেতে বসে আছে অগুনতি বন্দুক নিয়ে, ছবিটির ক্যাপশনে লেখা ছিল বলিউডের 'নায়ক' সিনেমার একটা কলি, "জুলমি বড়া, দুখদায়ক হুঁ ম্যায়"। কিছু ফেসবুক অ্যাকাউন্টে সে নিজের পেশার জায়গায় লিখেছিল, পেশাদার খুনি এবং তার বাড়ি ক্রাইম সিটিতে। [caption id="attachment_2312673" align="aligncenter" width="429"] সুখা কাহালোঁর ফেসবুক পেজ[/caption] নিজের নির্মমতা সোশ্যাল মিডিয়াতে প্রচার করার জন্য বেপরোয়া হয়ে গিয়েছিল সুখা। ২০১৩ সালে কাপুরথালা জেলে বন্দি থাকার সময়, জেলের ভেতরে বিপক্ষ গ্যাংয়ের শ্যুটারকে মেরে আধমরা করে দেওয়ার ভিডিও পোস্ট করেছিল নিজের ফেসবুক পেজে। ভাইরাল হয়েছিল ভিডিও। সবকটি ন্যাশনাল চ্যানেল দেখিয়েছিল। গ্যাং-ল্যান্ডে সুখার প্রতিপত্তি আকাশ ছুঁয়েছিল। পাঞ্জাবের কর্তারপুরের কাহালোঁ গ্রামে ১৯৮৭ সালে জন্মেছিল সুখবীর সিং কাহালোঁ। ধনী কৃষক পরিবারের সন্তান। তার বড় ভাইয়ের নাম সোনু কাহালোঁ। বাবা সর্দার সুদর্শন সিং ও মা হরজিন্দর কউর দুই ছেলেকে রেখে পাড়ি দিয়েছিলেন আমেরিকা। ছেলেরা ভিসা পায়নি বলে সঙ্গে নিয়ে যেতে পারেননি। ড্রাগের নেশায় জড়িয়ে পড়েছিল সুখবীর। জড়িয়ে পড়েছিল ড্রাগের সঙ্গে জুড়ে থাকা অপরাধ জগতে। জীবনে এসেছিল প্রেম। ২০০৮ সালে, ২১ বছর বয়সে বিয়ে করেছিল সুখবীর। বউ চাকরি পেয়ে পাড়ি দিয়েছিল অস্ট্রেলিয়া। সঙ্গে গিয়েছিল সুখবীরও। কিন্তু বউয়ের সঙ্গে ঝামেলা হওয়ায় ২০১০ সালে ফিরে এসেছিল ভারতে। [caption id="attachment_2312674" align="aligncenter" width="600"] সুখা কাহালোঁ তখন অস্ট্রেলিয়ায়[/caption] ভারতে এসে সুখা চলে গিয়েছিল জলন্ধর। যেখানে আগে থেকেই লাভলি বাবা নামে এক গ্যাংস্টার নিজের গ্যাং চালাচ্ছিল। লাভলি বাবার সঙ্গে আগে থেকেই বন্ধুত্ব ছিল সুখবীরের। লাভলি বাবার ডেরাতেই সুখবীরের সঙ্গে পরিচয় হয়েছিল আর এক নৃশংস গ্যাংস্টার ভিকি গৌন্ডারের। তিনজনের গভীর বন্ধুত্ব এক সময় বদলে গিয়েছিল ভয়াবহ শত্রুতায়। একটি মেয়ে, যাকে সুখা বোন বলত, তাকে কেন্দ্র করে লাভলি বাবা ও সুখবীরের সম্পর্ক তিক্ততার চরমে এসে পোঁছেছিল। সুখবীর বুঝেছিল, হয় তাকে লাভলি বাবাকে মারতে হবে, না হলে লাভলি বাবার গুলিতে তাকে মরতে হবে। প্রথম সুযোগেই ভিডিপুর গ্রামের এক জিমে লাভলি বাবাকে খুন করেছিল সুখবীর। ২০১০ সালের এই ঘটনার পর সুখবীরের প্রিয় বন্ধু ভিকি গৌন্ডার হয়ে উঠেছিল সুখবীরের চরম শত্রু। সুখবীরকে খুন করার শপথ নিয়েছিল ভিকি। নিজের ফেসবুক পেজের মাধ্যমে ভিকি তা প্রকাশ্যে জানিয়েও দিয়েছিল। [caption id="attachment_2312679" align="aligncenter" width="600"] লাভলি বাবা (বামে), সুখা কাহলোঁ ও ভিকি গৌন্ডার[/caption] অন্যদিকে সুখবীর নিজেই তৈরি করে নিয়েছিল আলাদা গ্যাং। সুখবীর সিং থেকে তার নাম হয়ে গিয়েছিল সুখা কাহালোঁ। পুলিশ হন্যে হয়ে খুঁজে বেড়াচ্ছিল সুখাকে। ২০১২ সালের জানুয়ারি মাসে দিল্লি থেকে গ্রেফতার করা হয়েছিল সুখাকে। নিয়ে যাওয়া হয়েছিল পাটিয়ালার নাভা জেলে। কিন্তু জুন মাসেই জেল থেকে পালিয়েছিল সুখা। জেল থেকে পালিয়ে সুখা গিয়েছিল উত্তরপ্রদেশে। ইয়ামিন নামে এক দাগী অপরাধীর সঙ্গে কাজ করা শুরু করেছিল। কিন্তু বখরা নিয়ে ঝামেলা হওয়ায় সুখার গলায় ছুরি চালিয়ে দিয়েছিল ইয়ামিন। মৃত ভেবে সুখাকে ফেলে দিয়েছিল যমুনা নদীতে। কিন্তু সুখা মরেনি। অবিশ্বাস্যভাবে বেঁচে ফিরেছিল। তবে ২০১২ সালের ৬ নভেম্বর, হাওড়া স্টেশনে হরিয়ানা পুলিশের হাতে ধরা পড়েছিল সুখা। চিকিৎসার জন্য কলকাতায় আসছিল সে। এরপর জেল থেকেই সুখা চালিয়ে যাচ্ছিল তার অপরাধের সাম্রাজ্য। জেলের বাইরে সুখার নির্দেশ পালন করে চলেছিল লরেন্স বিষ্ণোই, জাগগু ভগবানপুরিয়া, প্রীত ফাগোয়ারা, কালি শ্যুটার, সোনু কাংলা, ইন্দর স্রান, আনমোল বিষ্ণোই ও সুখার প্রিয় বন্ধু দলজিৎ ভানা। [caption id="attachment_2312687" align="aligncenter" width="600"] গ্যাংয়ের কিছু সদস্যের সঙ্গে সুখা কাহলোঁ[/caption] ঠিক একই সঙ্গে জেলের বাইরে চলছিল লাভলি বাবার মৃত্যুর বদলা নেওয়ার প্রস্তুতি। লাভলি বাবার ভাই সোনু বাবার সঙ্গে ২০১৫ সালের জানুয়ারির মাসে কোর্টে দেখা হয়েছিল সুখার। সোনু বাবা চড় মেরেছিল সুখাকে। সুখা বলেছিল জেল থেকে বেরিয়ে সোনুকে সে দাদার কাছে পৌঁছে দেবে। সোনু জানত, সুখা জেল থেকে বেরিয়ে এলে কেউ বাঁচবে না। তাই সোনু বাবা, প্রেমা লাহোরিয়া ও ভিকি গৌন্ডার জেলেই সুখাকে মারার ছক কষেছিল। সে খবর পেয়ে গেছিল সুখা। তাই জেল থেকে পালাবার প্ল্যান করেছিল। কিন্তু সামনে ছিল ২৬ জানুয়ারি। চতুর্দিকে পুলিশের টহল চলছিল। তাই সুখা সিদ্ধান্ত নিয়েছিল ২৬ জানুয়ারির পর জেল থেকে পালাবে। [caption id="attachment_2312692" align="aligncenter" width="405"] জেলবন্দি সুখা কাহালোঁ[/caption] ২০১৫ সালের ২১ জানুয়ারি। একটি মামলার শুনানির জন্য নাভা জেল থেকে সুখাকে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল জলন্ধরের কোর্টে। শুনানির পর সুখা ও অন্য এক আসামিকে নিয়ে এক নম্বর জাতীয় সড়ক ধরে নাভা জেলে ফিরছিল পুলিশ ভ্যান। ভ্যানে ছিল ছ'জন সশস্ত্র পুলিশ। বিকেল তখন ঠিক সাড়ে চারটে। ভ্যানটির সামনের রাস্তা জুড়ে দাঁড়িয়ে পড়েছিল দুটি 'টয়োটা ফরচুনা'। গাড়ি থেকে নেমে এসেছিল পনেরো জন আততায়ী। প্রত্যেকের মুখ ঢাকা এবং হাতে ছিল স্বয়ংক্রিয় রাইফেল। ভ্যানে থাকা অন্য আসামি ও পুলিশদের পালাতে বলেছিল আততায়ীরা। তারপর হাতকড়া পরা সুখার ওপর চালিয়েছিল কুড়ি রাউন্ড গুলি। ঝাঁঝরা দেহ নিয়ে ভ্যানের মধ্যে মুখ থুবড়ে পড়েছিল রক্তাক্ত সুখা। সুখার ছিন্নভিন্ন দেহটি মাটিতে নামিয়ে, সেটির চারদিকে ঘুরে ঘুরে ভাংড়া নেচেছিল আততায়ীরা। সেটার ভিডিও করে ফেসবুকে আপলোড করে দিয়েছিল। নিজেদের ও সুখার পেজে। পথের কাঁটা সরে যাওয়ার আনন্দে সেদিন সারারাত ফূর্তি করেছিল ভিকি গৌন্ডার, প্রেমা লাহোরিয়া ও সোনু বাবার গ্যাং। [caption id="attachment_2312693" align="aligncenter" width="600"] এই ভ্যানে করেই জেলে ফিরছিল সুখা[/caption] শোকে ভেঙে পড়েছিল সুখার ফ্যানেরা। সুখার ফেসবুক পেজে কমেন্টের বন্যা বয়ে গেছিল। ভিকি গৌন্ডার ও সোনু বাবাকে মারার শপথ নেওয়া হয়েছিল কমেন্টের মাধ্যমেই। ২০১৮ সালে পুলিশের গুলিতে মারা গিয়েছিল ভিকি গৌন্ডার ও প্রেমা লাহোরিয়া। সোনু বাবা কাপুর থালা জেলে বন্দি। জেলের ভেতরেই তার ওপর একের পর এক প্রাণঘাতী হামলার চেষ্টা হয়ে চলেছে। সোনু জানে তারও সময় ঘনিয়ে আসছে। খুনের বদলা একমাত্র খুন দিয়েই উসুল করে গ্যাং-ল্যান্ড। ছ'বছর আগে মারা গেলেও, পাঞ্জাব হরিয়ানার এক শ্রেণীর যুবকের কাছে সুখা কাহলোঁ আজও এক রক্তাক্ত মহাকাব্যের মহানায়ক হয়ে বেঁচে আছে। আজও, সুখার নামে ফেসবুকে কয়েক ডজন পেজ চলে। সেখানে নিয়মিত সুখার বীরত্ব ও মহানুভবতা নিয়ে পোস্ট করা হয়। সুখার জীবনী দেওয়া আছে উইকিসেলেবে। সুখাকে নিয়ে তৈরি হয়েছিল পাঞ্জাবী সিনেমা 'শ্যুটার' (ছবিটিকে ব্যান করা হয়েছিল)। [caption id="attachment_2312694" align="aligncenter" width="600"] সুখার জীবন নিয়ে তৈরি পাঞ্জাবী সিনেমা শ্যুটারের পোস্টার[/caption] 'শ্যুটার' সিনেমাটির ট্রেলারের জন্য বানানো হয়েছিল 'শ্যুট দা অর্ডার' গান। ইউটিউবে যেটির ভিউ ১০৩ মিলিয়ন। গানটিতেই উঠে এসেছে সুখা কাহালোঁ সহ গ্যাং-ল্যান্ডের সমস্ত গ্যাংস্টারের মনের কথা। যা গানটির কয়েকটি লাইন এরকম, "সুরমে মারদে নাই বালিয়ে, জাহান তে অমর হো জান্দে, হো কান্ডা গাডদা সিরে দা জাগ ফ্যান বান গায়া হো ইয়ার শুরু তোঁ হি মাফিয়াদা ম্যান বান গায়া হসলা গাদার হো গায়া নি, হো তেরে ইয়ার নু পাতলিয়ে নারে শ্যুট দা অর্ডার হো গায়া নি, হো তেরে ইয়ার নু পাতলিয়ে নারে। শের দে বরাবর হো গায়া নি, হো তেরে ইয়ার নু পাতলিয়ে নারে" বাংলায় তর্জমা করলে দাঁড়ায়, "বীরদের মৃত্যু হয় না। পৃথিবীতে তারা অমর হয়ে থেকে যায়। সে (সুখা) হত্যা করেছিল বড় বড় গ্যাংস্টারদের। তাই পৃথিবী তার ফ্যান হয়ে গিয়েছিল। শুরু থেকেই সে ছিল মাফিয়া ম্যান। সাহস তাকে আরও শক্তিশালী করেছে হে সুন্দরী মেয়ে। দেখামাত্র গুলি করার অর্ডার বেরিয়েছে তোমার প্রিয়তমের নামে। সিংহের সমান হয়ে গেছে তোমার প্রিয়তম।" গুলি করে মারার ওয়ারেন্ট বের হওয়াতে সত্যিই খুশি হয়েছিল সুখা। গ্যাংয়ের সদস্যদের বলেছিল এতদিনে তার তরক্কি (উন্নতি) হল। [caption id="attachment_2312700" align="aligncenter" width="600"] ফেসবুকে নিজের ছবি নিয়মিত আপলোড করত সুখা[/caption] সিনেমাটি তৈরির হওয়ার পর পাঞ্জাব ইউনিভার্সিটির প্রফেসর রাজেশ গিল বলেছিলেন, "যেভাবে একজন খুনিকে বীর শহিদের সম্মান দেওয়া হচ্ছে তার ফল ভুগতে হবে সমাজকে। আমি জানি না এর শেষ কোথায়।" সত্যিই কেউ জানে না এর শেষ কোথায়। যে যুবকেরা তাদের অকালে মৃত্যু নিশ্চিত জেনেও, সামান্য কটা দিন রাজার মত বাঁচার জন্য ছুটে যায় গ্যাং-ল্যান্ডে। তাদের মৃত্যু পথ থেকে ফিরিয়ে আনা ভীষণ ভীষণ কঠিন। তবে পাঞ্জাব ও হরিয়ানা পুলিশ গ্যাং-ল্যান্ডকে জনশূন্য করতে বদ্ধপরিকর। তাই গ্যাংস্টারদের সংখ্যা সাড়ে ছশো থেকে নেমে এসেছে একশোতে। হয়ত আর কয়েক বছরের মধ্যেই উধাও হয়ে যাবে আতঙ্কের কুয়াশা ছড়ানো 'গ্যাং-ল্যান্ড'। তারই অপেক্ষায় আছে সারা দেশ।

```