রূপাঞ্জন গোস্বামী
হিমাচলের পালামপুরের ডিএভি স্কুলে পড়ত মিষ্টি চেহারার লাজুক এক ছেলে। কথা বলত খুব কম। অত্যন্ত মেধাবী। অমৃতসর থেকে পড়তে এসেছে সে। ক্লাসে বরাবরই প্রথম হয়। কিন্তু বন্ধুত্ব শেষ ছেলেটির সঙ্গেও। ক্যুইজে প্রচুর আগ্রহ। পৃথিবীর হেন তথ্য নেই সে জানে না। ছেলেটি অত্যন্ত কৃতিত্বের সঙ্গে স্কুলের গন্ডি পেরিয়ে কলেজে গেল। স্নাতক স্তরেও দুর্দান্ত ফল করল। বন্ধুরা ভেবেছিল, হয় সে বিজ্ঞানী হবে, নয় প্রফেসর। না, সে সব কিছুই হননি তিনি। ১৯৯৭ সালের আগস্ট মাসে কম্বাইন্ড ডিফেন্স সার্ভিস পরীক্ষায় বসে পড়লেন সদ্য যুবক। সেখানেও সফল। যোগ দিলেন ইন্ডিয়ান মিলিটারি অ্যাকাডেমিতে। এর পর ১২ ডিসেম্বর, ১৯৯৮, ভারতীয় সেনাবাহিনীর জাঠ রেজিমেন্টের ফোর্থ ব্যাটেলিয়নে ক্যাপ্টেন হয়ে যোগ দিলেন
সৌরভ কালিয়া। প্রথম পোস্টিংই হলো কার্গিলের কাকসার সেক্টরে। ১৯৯৯ সালের জানুয়ারিতে কার্গিলের ব্যাটেলিয়নের সঙ্গে যোগ দিলেন সৌরভ।
[caption id="attachment_83933" align="aligncenter" width="700"]
মায়ের সঙ্গে ক্যাপ্টেন সৌরভ কালিয়া[/caption]
১৫ মে, ১৯৯৯
১৯৯৯ সালের মে মাস। পাহাড়ে পাহাড়ে গত শীতে পড়া বরফ গলতে শুরু করেছে। শীতকালে প্রচুর বরফ পড়ে কাকসার সেক্টরে। তাপমাত্রা নেমে যায় শূন্যের অনেক নীচে। ন্যাড়া পাহাড় চূড়ায় থাকা ভারতীয় সেনাবাহিনীর বাঙ্কারগুলো চলে যায় বরফের তলায়। ভারতীয় সেনারা তখন বাঙ্কার ছেড়ে নেমে আসেন তাঁদের শীতকালীন পজিশনে। গ্রীষ্মকালে পাহাড় চূড়ার বরফ গলে গেলে আবার তাঁরা উঠে যান পাহাড়চূড়ার বাঙ্কারে, তাঁদের গ্রীষ্মকালীন অবস্থানে।
১৯৯৯-এর ১৫ মে সৌরভ ছিলেন ১৪ হাজার ফিট উঁচুতে বজরঙ্গ পোস্টে।
কাকসার লাংপা এরিয়ায় ভারতীয় সেনার জোরদার পেট্রল চলছে। জানার চেষ্টা হচ্ছে, কতখানি বরফ গলেছে, কবে ফেরা যাবে শীতে ছেড়ে আসা গ্রীষ্মকালীন অবস্থান গুলিতে। ১৮০০০ ফুট ওপরে, লাইন অফ কন্ট্রোলের কাছে থাকা একটি ভারতীয় পজিশনের বর্তমান অবস্থা দেখতে একটি ছ'জনের দল পাঠায় ভারতের ১২১ নং ব্রিগেড।দলে ছিলেন ২২ বছর বয়সী ক্যাপ্টেন সৌরভ কালিয়া ও পাঁচ জওয়ান। তাঁরা হলেন,
সিপাই ভিখা রাম‚
অর্জুন রাম‚
ভনওয়র লাল বাগারিয়া‚
মূলা রাম ও
নরেশ সিং। কতটা বরফ গলেছে দলটি তাঁরই পুঙ্খানুপুঙ্খ জরিপ করছিল। ক্যাপ্টেন সৌরভ কালিয়ার হাতে ছিল বাইনোকুলার। সেটা ঘুরছিল লাইন অফ কন্ট্রোলের কাছে থাকা বিভিন্ন পাহাড়ের মাথায় মাথায় ভারতের ছেড়ে আসা পজিশনগুলিতে।
[caption id="attachment_83930" align="aligncenter" width="700"]
বাবা মায়ের সঙ্গে ক্যাপ্টেন সৌরভ কালিয়া[/caption]
হঠাৎ, সৌরভ কালিয়ার নজরে পড়লো একটা ভারতীয় বাঙ্কারে কিছু মানুষের নড়াচড়া। অবাক হয়ে যায় দলটি। ভারতীয় সেনা তো গ্রীষ্মকালীন পজিশনে যায় নি। ওরা তাহলে কারা ? ভালো করে দেখলেন। পাকিস্তানি রেঞ্জার্সদের চিনে ফেললেন সৌরভ কালিয়া। সঙ্গে সঙ্গে ওয়াকিতে খবর পাঠালেন উর্দ্বতন কতৃপক্ষের কাছে। জানালেন, শত্রুসেনা ঢুকে পড়েছে ভারতীয় ভূখণ্ডে। ইতিমধ্যে বিভিন্ন শৃঙ্গ দখল করে বসা পাকিস্তানি ফৌজের বাইনোকুলারেও বুঝি ধরা পড়েছিল সৌরভ কালিয়া আর পাঁচ জওয়ানের শারীরিক ভাষা। গুলি ছুটে এল পাকিস্তানি সেনাদের দিক থেকেও।
বীরবিক্রমে সৌরভ কালিয়া ও তাঁর পাঁচ সঙ্গী গুলি করতে করতে এগিয়ে চলেলেন নির্দিষ্ট পর্বতটির দিকে। তাঁরা জানতেনও না অভিমন্যুর মতই তাঁরা ঢুকে পড়ছেন এক চক্রব্যূহে। পাক সেনা ও উগ্রপন্থীদের পাতা ফাঁদে। তাঁরা বুঝতে পারেননি, শুধু সামনে নয়, আসে পাশে এমনকী পিছনের পাহাড় গুলির ওপরেও ঘাপটি মেরে আছে অগণিত পাক সেনা। কিছুদূর এগোবার পর চারদিক থেকে গুলি আসতে থেকে। পাথরের আড়াল থেকে গুলি চালান ছ'জন বীর সেনানী। ফুরিয়ে আসছে গুলি। সাহায্য চেয়ে খবর পাঠিয়েছেন। সে সাহায্য আসার আগেই শেষ হয়ে গেল গুলি। ঘিরে ফেললো পাক সেনা। আত্মসমর্পণ করতে বাধ্য হলেন ছ'জন।
[caption id="attachment_83952" align="aligncenter" width="640"]
কাকসার সেক্টর, এখানেই টহল দেওয়ার সময় নিখোঁজ হয়ে যান ক্যাপ্টেন সৌরভ সহ ছয় ভারতীয় সেনা[/caption]
ভারতীয় সেনার ব্যাক-আপ দল, সৌরভের জানানো জায়গাটিতে এসে সৌরভদের দলটিকে খুঁজে পায়নি। রক্ত, ধস্তাধস্তি বা অন্য কোনও চিহ্ন নেই মাটিতে কিংবা পাথরে। ভারতীয় সেনা এগোতে যেতেই পাহাড়গুলির মাথা থেকে ছুটে আসতে লাগলো ঝাঁকে ঝাঁকে গুলি। প্রাণ হারালেন দুই ভারতীয় জওয়ান। ভারতীয় সেনা বুঝতে পারলো রীতিমত যুদ্ধের প্রস্তুতি নিয়ে এসেছে পাকিস্তান। নিয়ে এসেছে অত্যাধুনিক অস্ত্রশস্ত্র। পাক অধিকৃত কাশ্মীরের ভেতর দিয়ে লাইন অফ কন্ট্রোল পর্যন্ত তৈরি করে ফেলেছে সাপ্লাই লাইন। কিন্তু কোথায় গেলেন ক্যাপ্টেন সৌরভ কালিয়া আর তাঁর পাঁচ সঙ্গী?
শুরু হল পৈশাচিক অত্যাচার
সেদিনই বিকেলে পাকিস্তান অধিকৃত কাশ্মীরের স্কার্দুতে, '
স্কার্দু রেডিও' ঘোষণা করলো,
"পাকিস্তানি সেনার হাতে ধরা পড়েছে ভারতীয় সেনাবাহিনীর ক্যাপ্টেন সৌরভ কালিয়া ও তাঁর পাঁচ সঙ্গী"। পাক অধিকৃত কাশ্মীরের গোপন ক্যাম্পে, ক্যাপ্টেন সৌরভ কালিয়া ও তাঁর পাঁচ সঙ্গীর ওপর অকথ্য অত্যাচার শুরু করলো পাক বাহিনী। ১৫ মে থেকে ৭ জুন পর্যন্ত চলল অমানুষিক অত্যাচার। জেনেভা কনভেনশনকে বুড়ো আঙ্গুল দেখিয়ে। প্রথমে সৌরভ কালিয়া সারা গায়ে সিগারেটের ছ্যাঁকা দেওয়া হয়েছিল। গরম শলাকা ঢুকিয়ে দুই কানের পর্দা ফুটো করে দেওয়া হয়েছিল। তীক্ষ্ণ কিছু দিয়ে চোখ গেলে দেওয়া হয়েছিলো। মেরে মেরে সব দাঁত ভেঙে দেওয়া হয়েছিলো। মাথার খুলি ফাটিয়ে দেওয়া হয়েছিল। ঠোঁট ও চোখের পাতা কেটে নেওয়া হয়েছিলো। হাত ও পায়ের আঙ্গুল কেটে নেওয়া হয়েছিল। কেটে নেওয়া হয়েছিলো যৌনাঙ্গও। সব শেষে মাথায় গুলি করে মেরে ফেলা হয়েছিলো সৌরভ কালিয়া ও পাঁচ জওয়ানকে।
[caption id="attachment_83957" align="aligncenter" width="480"]
নায়েক গুল নামে এই পাক সেনা স্বীকার করেছিল, ক্যাপ্টেন সৌরভ কালিয়া সহ ছয় সেনাকে তারাই হত্যা করেছিল[/caption]
জন্মদিনের ঠিক ২০ দিন আগে দেশে ফেরত এসেছিল সৌরভ কালিয়ার ছিন্নভিন্ন দেহ
৯ জুন‚১৯৯৯, পাকিস্তান ফেরত দিল যুদ্ধবন্দি ক্যাপ্টেন সৌরভ কালিয়া সহ ছয় সেনার দেহ। কফিন খুলে স্তম্ভিত হয়ে গিয়েছিল ভারত। ক্ষোভে ফেটে পড়েছিল ভারত। পোস্টমর্টেম রিপোর্ট জানা গিয়েছিল মৃত্যুর আগে ২২ বছরের সৌরভ কালিয়া ও তার সাথী জওয়ানদের কী পৈশাচিক অত্যাচার সহ্য করতে হয়েছিলো। সারা ভারতে ঝড় উঠলো, কার্গিল যুদ্ধ আগেই শুরু হয়ে গেছে। ছয় জওয়ানের পৈশাচিক হত্যার খবর শুনে ভারতীয় বাহিনী তুমুল আক্রমণ করলো পাকিস্তানি সেনাকে। ১৫ জুন ভারত সরকার ডেকে পাঠালো পাকিস্তানি হাই কমিশনারকে। যুদ্ধবন্দী সংক্রান্ত
জেনেভা প্রস্তাব শোচনীয় ভাবে লঙ্ঘন করেছে পাকিস্তান।
[caption id="attachment_83938" align="aligncenter" width="250"]
পালামপুর হেলিপ্যাড থেকে বাড়ির পথে ক্যাপ্টেন সৌরভ কালিয়ার কফিন[/caption]
কী বলা হয়েছে জেনেভা কনভেনশনে?
ওই আন্তর্জাতিক প্রস্তাবের ১৩ নম্বর ধারায় স্পষ্ট বলা হয়েছে, এক জন যুদ্ধ বন্দীর সঙ্গে মর্যাদাপূর্ণ ব্যবহার করতে হবে। তার উপর কোনও শারীরিক বা মানসিক অত্যাচার করা যাবে না। সমস্ত রকম হিংসার ঘটনা থেকে তাঁকে সুরক্ষা দিতে হবে। সাধারণ মানুষের কৌতূহল নিরসনের জন্যও তার ছবি বা সেরকম কিছু দেখানো যাবে না।
তৎকালীন বিদেশ মন্ত্রী যশোবন্ত সিং পাকিস্তানের বিদেশমন্ত্রী সরতার আজিজকে জানান, পাকিস্তান ভারতীয় যুদ্ধবন্দীদের ওপর পৈশাচিক অত্যাচার করেছে এবং
জেনেভা প্রস্তাব ভেঙে তাদের মেরে ফেলেছে। ক্যাপ্টেন সৌরভ কালিয়া সহ ছয় সেনার হত্যাকারীদের চিহ্নিত করে কঠোর শাস্তির কথা বলেন। পাকিস্তান বরাবরের মতো অস্বীকার করে ভারতের এই গুরুতর আরোপ। ১৪ ডিসেম্বর ২০১২, মৃত্যুর ১৩ বছর পর পাকিস্তানের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী রহমান মালিক জানান, সৌরভ কালিয়া মারা গেছেন আবহাওয়া খারাপের জন্য।
কিছুতেই কিছু হয়নি
সৌরভের বাবা ডক্টর এন কে কালিয়া তাঁর ছেলে এবং অন্যান্য যুদ্ধবন্দিদের উপর যে পৈশাচিক অত্যাচার করা হয়েছে তার বিচার চেয়ে কেন্দ্রীয় সরকার, সুপ্রিম কোর্ট, রাষ্ট্রসংঘের মানবাধিকার কমিশনের দ্বারস্থ হয়েছিলেন। হেগের আন্তর্জাতিক আদালতে আবেদন করার দাবিও জানিয়েছিলেন। কিছুতেই কিছু হয়নি।
[caption id="attachment_83946" align="aligncenter" width="759"]
'সৌরভ স্মৃতি কক্ষ'[/caption]
হিমাচলের পালামপুরের পাহাড়ে, ক্যাপ্টেন সৌরভ কালিয়ার বাড়ি ‘
সৌরভ নিকেতন‘-এ আজও আছে '
সৌরভ স্মৃতি কক্ষ'। সেই মিউজিয়ামে আছে সৌরভ কালিয়ার ছবি‚ ইউনিফর্ম আর জুতো। বিশেষ কেউ যান না দেখতে।
ক্যাপ্টেন সৌরভ কালিয়ার স্মৃতিতে পালামপুরে ৩৫ একর জায়গায় জুড়ে হিমাচল সরকার তৈরি করেছিল '
সৌরভ বন বিহার'। তাঁর নামে আছে রাস্তা '
ক্যাপ্টেন সৌরভ কালিয়া মার্গ'। তাঁর বাড়ির মহল্লার নাম হয়েছে 'সৌরভ নগর'। অমৃতসরে আছে ক্যাপ্টেন সৌরভ কালিয়ার মূর্তিও।
[caption id="attachment_83943" align="aligncenter" width="550"]
পালামপুরে সৌরভ বন বিহারে ক্যাপ্টেন সৌরভ কালিয়ার মূর্তি[/caption]
কিন্তু তার পরেও আসে প্রশ্ন। পাকিস্তান থেকে ক্ষত বিক্ষত লাশ হয়ে ফিরেছিলেন অমর শহিদ ক্যাপ্টেন সৌরভ কালিয়া। মাত্র বাইশ বছর বয়েসে।
নায়েক গুল নামে এক পাক সেনা প্রকাশ্যে স্বীকার করেছিল, ক্যাপ্টেন সৌরভ কালিয়া সহ ছয় সেনাকে তারাই হত্যা করেছিল। না, শাস্তি পায়নি পাকিস্তান। আজও শাস্তি পায়নি ক্যাপ্টেন সৌরভ কালিয়া সহ ছয় সেনার নৃশংস খুনিরা।
উইং কম্যান্ডার অভিনন্দন বর্তমান-কে মুক্তি দিয়ে সেই দগদগে ঘায়ে প্রলেপ দিতে পারল পাকিস্তান? না, ভারতীয় সেনাবাহিনীর বুকে কিন্তু বদলার আগুন জ্বলছেই।