দ্য ওয়াল ব্যুরো: ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণ প্রায়ই তাঁর শিষ্য ও ভক্তদের কাছে শিশুর মত আবদার করতেন এখানে-ওখানে নিয়ে যাওয়ার জন্য। বিশাল এই জগতকে জানার এক অসীম আগ্রহ ছিল তাঁর। শুধু ধর্মীয় স্থানই নয়, শিশুসুলভ আগ্রহ নিয়ে শ্রীরামকৃষ্ণ ঘুরে দেখেছেন বাদুড়বাগানের বিদ্যাসাগরের বাড়ি, মেছুয়াবাজার পল্লী, কোম্পানি বাগান, স্টার থিয়েটার, জোড়াসাঁকো ঠাকুরবাড়ি, রাধাবাজারের বেঙ্গল ফটোগ্রাফের স্টুডিও, লাটসাহেবের বাড়ি, ফোর্ট উইলিয়াম, জগন্নাথ ঘাট, কয়লা ঘাট থেকে গড়ের মাঠ।
এইভাবেই একদিন শ্রীরামকৃষ্ণ পৌঁছে গিয়েছিলেন কলকাতার জাদুঘরেও। কথামৃতে, ২-৩-১৮৮৪, ৯-৩-১৮৮৪ এবং ২৩-১০-১৮৮৫ তারিখগুলির বিবরণে ঠাকুরের জাদুঘর দর্শনের বর্ণনা আছে। জাদুঘরে গিয়ে গিয়ে দেখেছিলেন মানুষের কঙ্কাল। বিস্মিত শ্রীরামকৃষ্ণ মজা করে বলেছিলেন, সোসাইটিতে (জাদুঘর) মানুষের কঙ্কাল যেমন তার দিয়ে শক্ত করে জোড়া আছে, তাঁর অশক্ত দেহটাও সেরকম শক্ত হলে মায়ের নামকীর্তন করতে পারতেন আরও ভালভাবে। পাথর বা ফসিল হয়ে যাওয়া পশুর অবয়ব দেখে দিয়েছিলেন সাধুসঙ্গের উপমা। বলেছিলেন, পশু যেমন পাথর হয়ে যায় , সাধুসঙ্গের ফলে মানুষও সাধু হয়ে যায়।
এর ঠিক আগের মাস, অর্থাৎ ফেব্রুয়ারিতে ঘটেছিল মজার একটি ঘটনা। বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ, সমাজ সংস্কারক, দার্শনিক, লেখক, অনুবাদক, ঐতিহাসিক শিবনাথ শাস্ত্রী গিয়েছিলেন দক্ষিণেশ্বর। ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণ তাঁকে আলিপুর চিড়িয়াখানা দেখাতে নিয়ে যাওয়ার আবদার করে বসেছিলেন। সেখানে গিয়ে তিনি সিংহ দেখতে চান বলে জানিয়েছিলেন। “সিংহ জগজ্জননী দেবী দুর্গার বাহন”... বলতে বলতে ভাবসাগরে ডুবে গিয়েছিলেন শ্রীরামকৃষ্ণ।
কিন্তু সেদিন শিবনাথ শাস্ত্রীর অন্য কাজ থাকায় জানালেন, তিনি নিজে ঠাকুরকে চিড়িয়াখানায় নিয়ে যেতে পারবেন না। আবার ঠাকুরের কথা এড়ানোর ক্ষমতাও তাঁর নেই। তাই সাত-পাঁচ ভেবে ঠাকুরকে তুলে নিয়েছিলেন নিজের গাড়িতে। চিড়িয়াখানা দেখতে যাবেন সেই আনন্দে ঠাকুর বালকের মত উৎফুল্ল হয়ে উঠেছিলেন। ধোপদুরস্ত পোশাক পরে উঠে পড়েছিলেন শিবনাথ শাস্ত্রীর গাড়িতে। মা দুর্গার বাহনকে স্বচক্ষে দেখবেন, এই আনন্দে বিভোর ঠাকুরের মুখে ফুটে উঠেছিল অনাবিল এক বালখিল্য হাসি।
সে দিনটি ছিল ১৮২৪ সালের ফেব্রুয়ারি মাসের ২৪ তারিখ। ঠাকুরের চিড়িয়াখানা দেখার কথা আছে শিবনাথ শাস্ত্রীর স্মৃতিকথায়, আছে কথামৃতের ২৪-২-১৮৮৪ তারিখের বিবরণেও। সুখিয়া স্ট্রিট পর্যন্ত ঠাকুরের সঙ্গে এসেছিলেন শিবনাথ শাস্ত্রী। তার পরে তিনি নিজের কাজে চলে গিয়েছিলেন। আর তখন গাড়িতে উঠেছিলেন, ঠাকুরের 'লরেন', পরবর্তীকালের বীর সন্ন্যাসী স্বামী বিবেকানন্দ। আনন্দ চাপতে না পারা ঠাকুরকে নিয়ে আলিপুর চিড়িয়াখানায় প্রবেশ করেছিলেন নরেন্দ্রনাথই।
প্রায় চল্লিশ একর বিশাল জায়গা জুড়ে থাকা আলিপুর চিরিয়াখানায় ছিল বিশ্বের নানা দেশের নানা পশুপাখি। কিন্তু ঠাকুর তো দেখবেন সিংহ! তাই নরেন্দ্রনাথ খুঁজে খুঁজে ঠাকুরকে নিয়ে উপস্থিত হয়েছিলেন সিংহের খাঁচার সামনে। জানা যায়, পশুরাজকে দেখেই স্তম্ভিত হয়ে গিয়েছিলেন ঠাকুর। তাঁর বাহ্যজ্ঞান লুপ্ত হয়ে গিয়েছিল। এক অতীন্দ্রীয় জগতে বিরাজ করতে শুরু করেছিলেন। এক অদ্ভুত সমাহিত চেহারা হয়ে গিয়েছিল তাঁর।

পরবর্তীকালে শ্রী শ্রী ঠাকুর নিজেই তাঁর অভিজ্ঞতার ব্যক্ত করেছিলেন ভক্তদের কাছে। বলেছিলেন, "চিড়িয়াখানা দেখাতে লয়ে গিছলো। সিংহ দর্শন করেই আমি সমাধিস্থ হয়ে গেলাম। ঈশ্বরীয় বাহনকে দেখে ঈশ্বরীয় উদ্দীপন হলো। তখন আর অন্য জানোয়ার কে দেখে! সিংহ দেখেই ফিরে এলাম।"
পশুরাজকে দেখে সম্মোহিত ঠাকুরের পরে আর কখনও আলিপুর চিড়িয়াখানার অন্য পশুপাখি দেখার কথা মনে হয়নি। তাঁর সারা মন জুড়ে বিরাজ করছিল মা দুর্গার বাহন। গিরিরাজ হিমালয় মহিষাসুর বধের সময় দেবী দুর্গাকে বাহন হিসেবে দান করেছিলেন সিংহ। সেদিন স্বচক্ষে সেই সিংহ দর্শন করেছিলেন শ্রীরামকৃষ্ণ। আজও চিড়িয়াখানার ফলক আগত পর্যটকদের জানায় সেই ঘটনার কথা। দর্শকরা রোমাঞ্চিত হন সিংহের খাঁচার সামনে গিয়ে।
১৩৪ বছর আগে এই খাঁচার সামনেই পদধূলি পড়েছিল বাঙালির ইতিহাসের উজ্জ্বলতম নিহারীকা ও তার উজ্জলতম নক্ষত্রটির। আজ তাঁদেরই একজন, স্বামী বিবেকানন্দর জন্মদিনও বটে।