
শেষ আপডেট: 22 March 2024 18:11
দ্য ওয়াল ব্যুরো: ইট-পাথরের গাঁথনিগুলো এখনও শিহরণ জাগায়। এই জায়গায় এলে মনে হবে ‘টাইম ট্রাভেল’ করছি। অন্তঃস্থলে গেঁথে থাকা প্রাচীন বাংলার ঐতিহ্য ও সংস্কৃতি টেনে নিয়ে যায় ইতিহাসের ফেলে যাওয়া এইসব নিদর্শনের কাছে। চিনা পরিব্রাজক হিউয়েন সাঙ যে স্থানটিকে নালন্দা বিশ্ববিদ্যালয়ের থেকেও প্রাচীন বলে উল্লেখ করেছেন, সেই জায়গাটা কিন্তু আমাদের এই বাংলাতেই। স্বাধীন ঐক্যবদ্ধ বাংলার প্রথম রাজধানী। ইতিহাস কোনওদিনও ভুলবে না মুর্শিদাবাদ জেলার কর্ণসুবর্ণকে। বাংলার মর্মে মর্মে গেঁথে আছে কর্ণসুবর্ণ। চরম ব্যস্ততার মাঝে হাতে কিছুটা সময় পেলে সহজেই ঘুরে আসতে পারে বাংলার প্রথম রাজধানী থেকে।
বহরমপুর থেকে ৯ কিলোমিটার দক্ষিণ-পশ্চিমে। মাটির নীচে চাপা পড়ে থাকা ইতিহাস এখানে দু'হাত বাড়িয়ে কাছে ডাকে। ভাবতেই অবাক লাগে, প্রাচীন বাংলার প্রথম রাজধানী শহর এখন চরম অবহেলিত। ইতিউতি ছড়িয়ে রয়েছে ভগ্নপ্রায় ধ্বংসস্তূপ। হিউয়েন সাঙের বর্ণনা যেন অক্ষরে অক্ষরে মিলে যায়।
এখন যে জায়গাটা দেখলে ভগ্ননগরী বলে মনে হবে, তাই একসময় ছিল মহানগরী। বাংলার প্রথম স্বাধীন ও সার্বভৌম রাজা শশাঙ্কের সাম্রাজ্যের রাজধানী। সে সময় এই নগরের নাম ছিল ‘কানসোনা’। সপ্তম শতকে চিনা পরিব্রাজক হিউয়েন সাঙ-এর ভ্রমণ বৃত্তান্ত বৃত্তান্ত 'জিউ জি'-তে কর্ণসুবর্ণকে বর্ণনা করা হয়েছে 'কিলোনসুফলন' হিসেবে। নিজের ভ্রমণ বৃত্তান্ততে হিউয়েন সাঙ লিখেছিলেন তিনি তান-মো-লি-তি (তাম্রলিপ্তি, তাম্রলিপ্ত) থেকে কিলোনসুফলনে (কর্ণসুবর্ণ) পৌঁছন। গৌতম বুদ্ধ, সম্রাট অশোকের পায়ের ছাপ পড়েছে এই নগরীতে। শোনা যায়, গৌতম বুদ্ধ এই নগরীতে সাত দিন কাটিয়েছিলেন। কিন্তু আশ্চর্যের ব্যাপার হল, কর্ণসুবর্ণ এখনও সেভাবে পর্যটন কেন্দ্র হয়ে উঠতে পারল না। প্রাচীন বাংলার ইতিহাসে যাঁদের আগ্রহ, তাঁরা স্বাধীন বাংলার প্রথম রাজধানীকে অনুভব করতে বারে বারেই ছুটে যান। সাধারণ পর্যটকরা যান ভগ্নস্তূপ দেখতে। গাইডের কাছে কর্ণসুবর্ণের ইতিহাস শুনতে শুনতে শিহরিত হন।
বাঙালির পর্যটন মানচিত্রে কর্ণসুবর্ণ এখনও সেভাবে জায়গা করেনি। রক্তমৃত্তিকা মহাবিহারের ধ্বংসাবশেষ রয়েছে। একসময় এই নগরীর ভেতরে অসংখ্য বৌদ্ধ মঠ ছিল, ছিল অনেক মন্দির। ঐতিহাসিকদের মতে, ৫৯৩ থেকে ৬৩৮ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে বাংলা শাসন করেছিলেন শশাঙ্ক। আবার ভিন্ন মতও আছে। অনেকে বলেন রাজা শশাঙ্ক ৫৯০ থেকে ৬২৫ খ্রিষ্টাব্দ অবধি স্বাধীন বাংলার নৃপতি ছিলেন। ছোট ছোট রাজ্যকে একসূত্রে গেঁথে তিনি গড়ে তুলেছিলেন স্বাধীন গৌড় সাম্রাজ্য। আর তাঁর সাম্রাজ্যের রাজধানী করেছিলেন তৎকালীন কানসোনা বা কর্ণসুবর্ণকে। সিংহাসনে আরোহণের দিন থেকেই গণনা শুরু হয় বাংলা বর্ষপঞ্জি বা বঙ্গাব্দ। ইতিহাসবিদরা বলেন, বাংলা ক্যালেন্ডার তৈরির কৃতিত্ব শশাঙ্কেরই।
স্বাধীন বাংলার প্রথম রাজধানী যেমন মুর্শিদাবাদে, তেমনি, বাংলার শেষ স্বাধীন নবাবের রাজধানীও ছিল এই মুর্শিদাবাদ। গুপ্তদের পতন ও শশাঙ্কের উত্থানের কাহিনী বেশ রোমাঞ্চের। মুর্শিদাবাদের রাঙামাটি গ্রামের রাজবাড়িডাঙায় খননকার্য চালিয়ে এক প্রাচীন বৌদ্ধ মঠের ধ্বংসস্তূপ পাওয়া গেছে। এটাই ছিল রক্তমৃত্তিকা মহাবিহার। তার কাছেই রাক্ষসীডাঙা ঢিবিতে খননকাজ চালিয়েও পাওয়া গেছে প্রাচীন স্থাপত্যের ভাঙাচোরা অংশ। মনে করা এটিই ছিল রাজা শশাঙ্কের রাজপ্রাসাদ। ভগ্নপ্রায় স্থাপত্যের প্রতিটি ইট খ্রিষ্টীয় সপ্তম শতাব্দীর বাংলার ঐতিহ্য বহন করছে।
চিনা পরিব্রাজক হিউয়েন সাঙ-এর বর্ণনাতে আছে বাংলার কানসোনা নাকি বিহারের নালন্দা বিশ্ববিদ্যালয়ের থেকেও প্রাচীন। এখানে বৌদ্ধ ধর্মের উত্থান হয়েছিল রাজা শশাঙ্কের সময়। সুপ্রাচীন বৌদ্ধ মঠের পাশাপাশি অসংখ্য হিন্দু মন্দিরের ধ্বংসাবশেষও পাওয়া গেছে। হিউয়েন সাঙ কর্ণসুবর্ণকে নিয়ে বলেছেন, একসময় বাংলার সমৃদ্ধ নগরী ছিল এটি। এখানকার মানুষজন ছিলেন ধনী। নগরের সমৃদ্ধি ও প্রাচুর্য সেই নিদর্শনই বহন করছে। চাষাবাদ হত নিয়মিত, নগরী ফুলে ফুলে শোভিত ছিল। আবহাওয়া ছিল নাতিশীতোষ্ণ। মানুষজন ছিল বন্ধুত্বপূর্ণ। আর সবচেয়ে বড় কথা হল, শিক্ষা ও সংস্কৃতির অন্যতম পীঠস্থান ছিল কর্ণসুবর্ণ। শোনা যায়, কর্ণসুবর্ণের সমৃদ্ধি দেখে বাংলার এই রাজধানী দখল করতে চেয়েছিলেন থানেশ্বরের সম্রাট হর্ষবর্ধন, কামরূপের রাজা ভাস্করবর্মন এবং আরও বেশ কিছু শাসক।
শশাঙ্কের পর তাঁর ছেলে মানবদেবের সময় থেকেই কর্ণসুবর্ণের গৌরব স্তিমিত হতে শুরু করে। একসময় যে নগরী ছিল রাজনৈতিক-প্রশাসনিক-সামরিক ও সাংস্কৃতিক সমৃদ্ধির প্রতীক, তাই শশাঙ্কের পরবর্তী সময় থেকে অর্থাৎ ওই শতাব্দীর শেষ থেকেই বিস্মৃতির অতলে তলিয়ে যায়। পাল ও সেনদের কোনও দলিলেই এমন একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজধানী শহরের কোনও উল্লেখই পাওয়া যায়নি। তাই হয়ত এই সময়ে দাঁড়িয়েও বাংলার গৌরবময় সেই রাজধানী শহর কেবলমাত্র কিছু ইট-পাথর ভগ্নপ্রায় স্থাপত্যের সাক্ষ্য বহন করে আছে। গুটিকয়েক বাঙালি কর্ণসুবর্ণের স্বর্ণযুগকে মনে রেখেছে আজও।
কীভাবে যাবেন—
বারহাওয়া-আজিমগঞ্জ-কাটোয়ার লুপ লাইনে রয়েছে কর্ণসুবর্ণ রেলওয়ে স্টেশন। কলকাতা ও হাওড়া থেকে উত্তরবঙ্গগামী প্যাসেঞ্জার ও এক্সপ্রেস ট্রেন এই স্টেশনের উপর দিয়েই যায়।
সড়কপথে গাড়ি করে বহরমপুর উত্তরপাড়া থেকে বাঁ দিকে যাদুপুর মোড় হয়ে যাওয়া যেতে পারে। বহরমপুর মোড় থেকে যাদুপাড়া প্রায় ২ কিলোমিটার।
কলকাতা থেকে খুব সহজেই এখানে পৌঁছে যাওয়া যায়। কলকাতা থেকে ট্রেনে বা বাসে করে মুর্শিদাবাদে পৌঁছে গেলেই হল। শিয়ালদহ স্টেশন থেকে মুর্শিদাবাদ যাওয়ার একাধিক ট্রেন রয়েছে। এক বেলাতেই পৌঁছে যাওয়া যায়। তাছাড়া অনেক বাস আছে। সরকারি বাস ছাড়ে ধর্মতলা থেকে। মুর্শিদাবাদ পৌঁছে সেখান থেকে গাড়ি ভাড়া করে যাওয়া যাবে কর্ণসুবর্ণতে।
কর্ণসুবর্ণ থেকে আরও নানা জায়গায় ঘোরা যাবে। সেখান থেকে যেতে পারেন হাজার দুয়ারি, বিষ্ণুপুর কালীবাড়ি, নিজামত ইমামবাড়া, ফুটি মসজিদ। এমনকী মিরজাফরের বংশের সমাধিক্ষেত্র জাফরাগঞ্জ সমাধিক্ষেত্র রয়েছে সেখানে। রয়েছে কাটরা মসজিদ। আমেরিকান চার্চ ও আছে। কাজই একবার মুর্শিদাবাদে যেতে পারলে অনেক কিছু একসঙ্গে দেখা হয়ে যাবে।