
শেষ আপডেট: 24 December 2022 11:11
ছবি: প্রজাপতি (Projapati)
অভিনয়ে: মিঠুন, দেব, মমতাশংকর, শ্বেতা, অম্বরীশ, খরাজ
রেটিং: ৮.৫/১০
শ্রীকৃষ্ণর এক রূপ যেমন চিরপ্রেমিকের, তেমনই তাঁর আর এক রূপ বিপ্লবের। কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধে তিনিই সারথী, তিনিই জীবনশক্তি। কৃষ্ণবর্ণের এক ছেলে সাতের দশকে নকশাল তকমা গায়ে সেঁটে বিপ্লবের আগুন জ্বেলেছিল কলকাতা শহরে। উত্তর কলকাতার অলিগলিতে সে তখন ফেরার। ঠিক সেইসময় মৃণাল সেন তাঁকে ধরে নিয়ে এলেন বড় পর্দায়, 'মৃগয়া'র কৃষ্ণকালো নায়ক রূপে। নকশাল আন্দোলনের মুখ গৌর হলেন মিঠুন চক্রবর্তী।
প্রথম ছবিতেই শ্রেষ্ঠ অভিনেতার জাতীয় পুরস্কার। বিপ্লবের রক্তে মিশে গেল সুপার হিরোর স্টারডম। প্রায় চার দশক পার করে টালিগঞ্জ পাড়ায় আর এক শ্রীকৃষ্ণ রূপী নায়কের উত্থান। নামেই তাঁর দেবতা। তিনি দেব। প্রথম ছবিতে অবশ্য তাঁর আন্তর্জাতিক মানের পরিচালক বা জাতীয় পুরস্কার জোটেনি। কিন্তু অদম্য সাহসে দেব জয় করে নিলেন বক্সঅফিস। গৌরবর্ণ নায়কদের পাশে কৃষ্ণকায় ছেলেটি জায়গা করে নিলেন স্বমহিমায়। নিরন্তর নিজের দিকেই চ্যালেঞ্জ ছুড়লেন তিনি। প্রতিটি ছবিতেই দেব আসতে শুরু করলেন নতুন অবতারে। সমসাময়িক নায়কদের তুলনায় কয়েক ধাপ উপরে উঠে গেলেন এভাবেই। শুধু তাই নয়, রাজনৈতিক মঞ্চেও সুকথায় দেব জয় করে নিলেন তাঁর নতুন বিপ্লবের পথ।
মিঠুন-দেব দুই সময়ের, দুই প্রজন্মের নায়ক। কিন্তু তাঁদের চেহারা থেকে জনগনমন অধিনায়ক ইমেজ সবেতেই ভীষণ মিল। সেই রসায়নই একশোয় একশো ভাগ মিলে গেছে অভিজিৎ সেনের 'প্রজাপতি' (Projapati) ছবিতে। তাঁদের যেন মেক আপ করে পিতা-পুত্র সাজার প্রয়োজন পড়েনি। দু'জনের এতই মিল, তাঁরা যেন আল্টিমেট বাবা ছেলে। কিন্তু যে ছবিতে 'ডিস্কো ডান্সার' মিঠুন চক্রবর্তী থাকবেন, সে ছবিতে তো মিঠুনই নায়ক হবেন। তাই 'প্রজাপতি'-তে যেন দেব নিজের নায়ক স্টারডম দিয়ে মিঠুনের স্টারডমকে কুর্নিশ জানিয়েছেন। এখানেই দেবের সৌজন্য।

'প্রজাপতি' বাবা ছেলের গল্প হলেও এ ছবি প্রজাপতি নির্বন্ধও বটে। মিঠুনের আসল নাম গৌরাঙ্গ বা গৌর, পড়াশোনা স্কটিশ চার্চ কলেজে। বাস্তবের সেই পরিচয়ই রয়েছে ছবিতে মিঠুনের চরিত্রটিরও। গৌর বাবু বিপত্নীক। মেয়ে আর ছেলেকে একাই মানুষ করেছেন বাবা আর মা উভয়ের ভূমিকা পালন করে। মেয়েকে সরকারি স্কুলের শিক্ষক জামাইয়ের কাছে পাত্রস্থ করেছেন। এবার শুধু ছেলে জয়ের বিয়ে দিতে পারলেই গৌর বাবুর সব দায়িত্ব শেষ। কিন্তু সেখানেই যত বিপত্তি। ছেলে জয় নিজে বিয়ের ওয়েডিং প্ল্যানার। অথচ তাঁর বিয়ের ফুলটিই ফুটছে না। ছেলের বৌ খুঁজতে বাবা হন্যে হয়ে ঘুরছেন, অথচ ছেলে বিয়ে করতে নারাজ।
এমন সময় জামাই শ্বশুরমশাইকে প্রস্তাব দেয়, কাশীর গঙ্গায় শালা বাবুকে ডুব দেওয়াতে পারলেই বিয়ের ফুল ফুটবে। সেই কথা মেনেই গৌরবাবু ছেলেকে নিয়ে কাশীবাসী হন ক'দিনের জন্যে। কিন্তু ছেলে গঙ্গায় ডুব দেওয়ার সঙ্গে বাবাও ডুব দিয়েছিলেন। আর তাতেই ছেলের আগেই বাবার বিয়ের ফুল ফুটে যায়। নিঃসঙ্গ বিপত্নীক গৌর বাবুর জীবনে আসেন, কলেজ জীবনের বান্ধবী কুসুম। কিন্তু সাড়ে ৭৪ বছর বয়সে বিয়ের সানাই বাজতেই পেনশনভোগী বাবার জন্য ছেলের মুখ দেখানো দায় ওঠে পাড়া প্রতিবেশীদের কাছে। চারিদিকে ছিছিক্কার পড়ে যায় বুড়োর ভিমরতী বলে। কিন্তু এই বুড়ো তো যে সে বুড়ো নন, তিনি যে মহাগুরু মিঠুন চক্রবর্তী। তাই পর্দায় তিনি এমন সব কেরামতি দেখান, যে দর্শক এক মুহূর্তের জন্য চোখ সরাতে পারবে না স্ক্রিন থেকে।

কিন্তু বাবার বিয়ে কি মানবে ছেলে? ছেলেও কি জীবনসঙ্গী খুঁজে পাবে? সব প্রশ্নের উত্তর পেতে দেখতেই হবে 'প্রজাপতি'।
অতনু রায়চৌধুরীর নিবেদনে 'বেঙ্গল টকিজ' ও দেবের প্রযোজনায়, অভিজিৎ সেনের পরিচালনায়, বড়দিনের উপহার 'প্রজাপতি' সত্যিকারের মন ভাল করা ছবি। টেনশন বিপন্ন জীবনের মাঝে এ ছবি সিনেমাহলে দেখতে গেলে হাসতে হাসতে প্রতিটি দর্শকের মন ভাল হয়ে যাবে। শুধুই কমেডি রিলিফের ছবি নয়, এ ছবি আরও এক বার্তা দেয়। ছেলেমেয়ে নিজেদের জগতে ব্যস্ত হয়ে গেলে, বাবা-মা একাকীত্বকে সাথী না করে, নিজেদের জীবনসাথী আরও একবার খুঁজে নিতে পারেন।
মিঠুন চক্রবর্তী দীর্ঘ কয়েক বছর পরে বাবার রোলে কামব্যাক করলেন বাংলা ছবিতে। ছবিতে কাজের মেয়ে থেকে পাড়ার রকবাজ ছেলেরা তাঁকে দাদু ডাকে। কিন্তু ডিস্কো কিং দাদু যে আজও বক্সঅফিসে দশ গোল দিতে পারেন, তা আবারও প্রমাণিত। এ ছবি মিঠুনের ছবি। দেবের থেকেও পর্দা জুড়ে মিঠুনই বেশি। একাই পুরো ছবিটা টেনে নিয়ে গেছেন বলে বলে ছয় মেরে। বিশেষত মিঠুনের কিছু পেন্টেট সংলাপ ও 'দুয়ারে বৌ'-এর মতো মজার কথায় পরের পর হলভর্তি হাততালি চলেছে। তিনি যে কত বড় অভিনেতা এবং আজও তিনি আট থেকে আশি সবার ভালবাসার নাম, তা গৌর মিঠুন প্রমাণ করলেন। তিনি একাই একাশো।

সেই মৃণাল সেনের 'মৃগয়া'র পর ৪৬ বছর আর একসঙ্গে জুটি বাঁধেননি তাঁরা। ১৯৭৬-এর পর ২০২২, মিঠুন চক্রবর্তী ও মমতাশংকর আবার প্রেমে পড়লেন। প্রথম যৌবনের প্রেম আজও ফুরোয়নি তাঁদের। অনবদ্য রোম্যান্টিক মুহূর্ত গড়ে উঠল দু'জনের চোখে চোখে। প্রথম এন্ট্রিতেই মমতাশংকরের নাচের ব্যাকগ্রাউন্ড দারুণ কাজে লাগানো হয়েছে ছবিতে। তবে নাচের ছাত্রীদের সঙ্গে মমতাশংকরের নিজের নাচের মুহূর্ত ছবিতে থাকলে যেন আরও মন ভরত দর্শকের। প্রতিটি দৃশ্যেই অনবদ্য মমতাশংকর, বিউটি উইথ গ্রেস। সত্তর দশকের জুটির সফল কামব্যাক সম্ভব করলেন পরিচালক অভিজিৎ, প্রযোজক অতনু ও দেব। মমতাশংকর 'প্রজাপতি' নামে আগেও একটি ছবিতে কাজ করেছিলেন সেই নয়ের দশকে। বিপ্লব চ্যাটার্জী পরিচালিত সমরেশ বসুর 'প্রজাপতি' উপন্যাস নিয়ে সেই ছবি।
এবার ছবির আরও এক নায়ক দেবের কথায় আসা যাক। তুবড়ি ফাটিয়ে, বাইকে চড়ে দেবের গ্র্যান্ড এন্ট্রি অভাবনীয়। মিঠুন চক্রবর্তীর মতো বলি-টলি কাঁপানো নায়কের সামনে দেবের স্টারডম এতটুকু ফিকে হয়নি। সমানে সমানে টক্কর দিয়েছেন দেব। 'টনিক' ছবিতে পরাণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে যতটা ভাল দেব, ততটাই তিনি ভাল মিঠুনের সঙ্গেও। বাবার জন্য সারা সমাজের প্রতি দেবের শেষ সংলাপ সবার মনের কথা হয়ে ওঠে। এই দৃশ্য দিয়েই দেব ছবির আরও এক যোগ্য নায়ক হয়ে ওঠেন।

ছবির বাকি চরিত্রদের মধ্যে দু'জনের কথা বলতেই হবে, খরাজ মুখোপাধ্যায় ও অম্বরীশ ভট্টাচার্য। খরাজ মিঠুনের প্রতিবেশী বন্ধু আর অম্বরীশ মিঠুনের জামাই। এই তিন অভিনেতার জমাটি কমেডি অভিনয় ছবির আসল ভরকেন্দ্র। তিনজনেই যে কত বড় অভিনেতা, তা প্রমাণ করে দিলেন এই ছবিতে।
আবার অম্বরীশের স্ত্রী মিঠুনের মেয়ের চরিত্রে কনীনিকা বন্দ্যোপাধ্যায়ের চরিত্রটিকেও ব্যালেন্স করেছেন পরিচালক। তিনি বলে ওঠেন, শ্বশুরবাড়ি গিয়ে কোনও বন্ধু পাননি। শাশুড়ি থেকে বরের কর্তব্য পালন করতে করতেই একা হয়ে পড়েছেন। তাই তাঁর অস্তিত্ব রাখার তাগিদ হয়ে গেছে রাগী মেজাজ।
দেবের বিপরীতে শ্বেতার অভিনয় ভাল। অভিনয়ের সঙ্গে শ্বেতার স্নিগ্ধ রূপের পরশও ছড়িয়েছেন পর্দায়। তবে মিঠুন-মমতার পাশে দেব-শ্বেতার জুটি একটু নিষ্প্রভ। কৌশানী অতিথি শিল্পী রূপে ভালই।

ছবির সঙ্গীতে (অনুপম রায়-সুরজিৎ চট্টোপাধ্যায়-রথীজিৎ) যথাযথ। 'ব্যোম ব্যোম ভোলে ব্যোম' গানটির সঙ্গে পর্দায় বেনারস দেখিয়ে গোপী ভগতের সিনেমাটোগ্রাফি দারুণ লাগে। শুভদীপ দাসের চিত্রনাট্য, সংলাপ এবং অভিজিৎ সেনের পরিচালনা ছবির মূল প্রাণশক্তি। এর উপর ভর করেই ছবিটা এগিয়েছে। দমদার সংলাপ বসেছে মিঠুন, দেব, খরাজ, অম্বরীশের মুখে। ছবি তো হিট হতে বাধ্য!
ছবির লঘু ব্যাপার বলতে ছবির ক্লাইম্যাক্সগুলো বড্ড তাড়াতাড়ি ঘটতে থাকে। কিছু চরিত্রর ভাবনার পরিবর্তন এক নিমেষেই বদলে যায়। কিছু দৃশ্য চিত্রনাট্যর থেকেও বেশি মনে হয় বিজ্ঞাপনী প্রচারের মতো করেই বানানো। ভক্তিগীতির দৃশ্য এলেই অদিতি মুন্সী এত ব্যবহৃত, যে ক্লিশে লাগে।
তবু এই ছবি নিরাশ করবে না। বড়দিনের আদর্শ ছবি 'প্রজাপতি'। বয়স্ক বাবা-মা দের সঙ্গে বা ছেলেমেয়েদের নিয়ে সপরিবার দেখুন এই ছবি। মন ভাল হবেই নিশ্চিত। টিকিটের পয়সাও উসুল হবে। সর্বোপরি, মিঠুন চক্রবর্তীর এই পর্দা কাঁপানো কামব্যাক দেখতে 'প্রজাপতি' দেখতেই হবে।
পাহাড়ী সান্যালের হাতে ছবি ছিল না একসময়, পাশে দাঁড়িয়েছিলেন উত্তম কুমার