বক্তব্যের প্রেক্ষাপট প্রায়শই হারিয়ে গিয়ে ছোট্ট ক্লিপিং হয়ে ওঠে ‘চূড়ান্ত সত্য’। সোশ্যাল মিডিয়ার ‘ভাইরাল যুগে’ যুক্তি নয়, বরং প্রতিক্রিয়াই প্রাধান্য পায় বেশি। ফলে শিল্পীরা রাতারাতি তাঁদের সৃজনশীল পরিচয় হারিয়ে রাজনৈতিক প্রতীকে পরিণত হন, যেখানে ব্যক্তি নয়, বরং ‘পক্ষ’ বা ‘বিপক্ষ’ই হয়ে ওঠে প্রধান পরিচয়।

শেষ আপডেট: 27 March 2026 14:54
জয়িতা চন্দ্র
পর্দায় তাঁরা নায়ক, কিন্তু বাস্তবের মঞ্চে? বাংলা বিনোদন জগতে এই প্রশ্ন আজ ক্রমেই প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠছে। সেলিব্রিটিদের কি কেবল বিনোদনের সীমারেখায় আবদ্ধ থাকা উচিত, নাকি সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তাঁরা হয়ে উঠবেন সমাজের সক্রিয় কণ্ঠস্বর? বর্তমানে এই দ্বিধাই টলিউডের অন্যতম বড় সংকট? নাকি চুপ থাকাই এখন টলিউডের সবচেয়ে নিরাপদ কৌশল?
অতীতে ফিরে তাকালেই দেখা যায়, এই শহরের সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডল কখনওই রাজনীতি-বিচ্ছিন্ন ছিল না। বরং শিল্প, সাহিত্য ও রাজনীতির সহাবস্থানই ছিল কলকাতার স্বর। সেই ঐতিহ্যের ধারাবাহিকতা বজায় রেখে শিল্পীরা সময়ে সময়ে নিজেদের অবস্থান স্পষ্ট করেছেন বহুবার। কখনও সরাসরি বক্তব্যে, কখনও শিল্পের ভাষায়। সেই ছবি আজও বর্তমান। ব্যক্তিগত ইচ্ছায় নিত্যদিন রাজনীতির নানা বিষয় নিয়ে নিজ-নিজ মতামত যাঁরা পোষণ করার, তাঁরা করছেন। কিন্তু ইন্ডাস্ট্রির এক বড় অংশ এই বিষয় থেকে নিজেকে বিরত রেখেছেন। অর্থাৎ তাঁরা চুপ! নিয়েছে সংযমী অবস্থান। ইন্ডাস্ট্রির এক বড় অংশ মুখ ফিরিয়েছেন এই বিষয় থেকে।
এখন প্রশ্ন হল, তাঁরা চুপ কেন? ভয়! পরিস্থিতি! নাকি এ সমাজের বুকে কাজ করছে অন্য কোনও সমীকরণ?
গণতান্ত্রিক কাঠামোয় মত প্রকাশের অধিকার যেমন সবার, তেমনই তারকারাও সেই পরিসরের অংশ। কিন্তু তাঁদের ক্ষেত্রে প্রতিটি শব্দের সঙ্গে জড়িয়ে থাকে অর্থনৈতিক ও পেশাগত ঝুঁকি, বক্স অফিস, প্রযোজকের আস্থা, ব্র্যান্ড-সম্পর্ক, এমনকি দর্শকের গ্রহণযোগ্যতাও। টলিউডের মতো সীমিত বাজারে এই চাপ আরও তীব্র, যেখানে একটি সাধারণ মন্তব্যই হয়ে উঠতে পারে বিস্ফোরক। যে সমস্যা আরও জটিল করে তুলেছে ডিজিটাল মিডিয়া।
কী এই সমস্যা?
বক্তব্যের প্রেক্ষাপট প্রায়শই হারিয়ে গিয়ে ছোট্ট ক্লিপিং হয়ে ওঠে ‘চূড়ান্ত সত্য’। সোশ্যাল মিডিয়ার ‘ভাইরাল যুগে’ যুক্তি নয়, বরং প্রতিক্রিয়াই প্রাধান্য পায় বেশি। ফলে শিল্পীরা এখন বেজায় বিপাকে। রাতারাতি তাঁরা সৃজনশীল পরিচয় হারিয়ে রাজনৈতিক প্রতীকে পরিণত হন, যেখানে ব্যক্তি নয়, বরং ‘পক্ষ’ বা ‘বিপক্ষ’ই হয়ে ওঠে প্রধান পরিচয়।

এক্ষেত্রে চুপ থাকাই ভাল: শঙ্কর চক্রবর্তী
এক্ষেত্রে চুপ থাকাই ভাল। কারণ একটাই, আমি একরকম বলব, তার নির্দিষ্ট কিছু লাইন নিয়ে এমনভাবে পোস্ট করা হবে, যার মূল অর্থই পাল্টে যাবে। এই যেমন ধরুন, আমি বলেছিলাম, ‘আমার মেয়ে মুম্বইতে লেখাপড়া করে, সেখানেই থাকে’। পরবর্তীতে দেখলাম, যার অর্থ দাঁড়িয়েছে ‘মেয়ে আমায় ছেড়ে চলে গিয়েছে, সে আমায় দেখে না’। রাজনীতির বিষয়টাও ঠিক এইরকমই।
আরও একটা বিষয়, রাজনীতি নিয়ে ব্যক্তিগত মতামত প্রকাশ করলে, আমার মনে হয়, আমার দর্শক ভাগ হয়ে যাবে। এটা আমার একান্ত ব্যক্তিগত মতামত। আমাকে সকলে অভিনেতা হিসেবে চিনুক, আমি সেটাই চাই।

মাঝখান থেকে তুলে ধরা ক'টা লাইনেই বিপদ: অনির্বাণ ভট্টাচার্য
প্রথমত, একটা ছোট্ট ক্লিপিং, রাতারাতি ভাইরাল হয়ে যাওয়ার যুগে দাঁড়িয়ে, শুধু রাজনীতি কেন, যে কোনও বিষয় নিয়ে কথা বলতে গেলেই ভেবে বলতে হয়। মানুষের কাছে পুরো সাক্ষাৎকারটা যতটা না পৌঁছায়, তার থেকে বেশি আলোচনায় উঠে আসে, কয়েক সেকেন্ডের একটা মন্তব্য, বা মাঝখান থেকে তুলে ধরা ক'টা লাইন। যা মানুষকে ভুল বোঝানোর জন্যে যথেষ্ট। বিপদ ওখানেই। কেন বললাম? কী প্রসঙ্গে বললাম? সেটা ততক্ষণে হারিয়ে গিয়ে, বিষয়টা পাল্টে যায়। একটা শব্দ এদিক ওদিক হয়ে গেলে, মানে আমুল বদলে যায়। হয়তো আমি সেটা বলতেই চাইনি, অথচ সেটাকে এমনভাবে উপস্থাপন করা হল, যা সম্পূর্ণ আলাদা। যতক্ষণে আমি সেটা নিয়ে প্রতিবাদ করব, ততক্ষণে বহু মানুষের কাছে সেটা পৌঁছিয়ে গিয়েছে। তাঁরা ভুলটাই বিশ্বাস করে ফেলেছেন। আজকের দিনে দাঁড়িয়ে প্রচারের মাধ্যমটা সঠিক নয় বলেই, যে কোনও মন্তব্য করাই বড্ড বেশি ঝুঁকি সম্পূর্ণ হয়ে উঠেছে বলে আমি মনে করি।
দ্বিতীয়ত, রাজ্য রাজনীতি নিয়ে যেটুকু আমি জানি, বুঝি, সেটা আমার ব্যক্তিগত অভিমত। তবে সমাজের সামনে নিজের মতামত রাখার জন্যে যে চর্চাটা লাগে, সেটা আমি করি না। এটা আমার পরিসরের বাইরে।
কেউ কেউ আবার মনে করেন, ওপর ওপর দেখে কোনও বিষয় মন্তব্য করা মানে তা অপরাধ। সমাজে ভুল বার্তা ছড়িয়ে দেওয়া। ব্যক্তিগত মতাদর্শ থাকতেই পারে, তবে তা নিয়ে মন্তব্য করার আগে বিষয়টা গভীরে যাওয়া প্রয়োজন। সেই জ্ঞান থাকা প্রয়োজন।

আমি মনে করি সবটা জানান জরুরি: সন্দীপ্তা সেন
রাজনীতি নিয়ে নিজেদের মধ্যে আলোচনা করলাম, সেখানে ঠিক-ভুল নিয়ে বিতর্ক হল, ততটা পর্যন্ত চলতে পারে। তবে সকলের সামনে নিজের মতামত রাখার জন্যে যতটা জ্ঞান থাকা প্রয়োজন, ততটা আগ্রহ আমি রাজনীতি নিয়ে কখনও দেখাইনি। আমরা ওপর-ওপর দেখে মন্তব্য করতে পারি, তবে পাবলিক প্ল্যাটফর্মে কিছু বলার আগে আমি মনে করি বিষয়টা বিশদে জানান জরুরি। তাই এই বিষয়ে কথা বলা থেকে আমি বিরত থাকি, আর এটা আমার একান্ত ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত।
তবে এই পরিস্থিতিতে নীরবতা অনেকের কাছে নিরাপদ আশ্রয় বলে মনে হতে পারে। কিন্তু নীরবতা কি সত্যিই নিরপেক্ষ? সামাজিক অন্যায়, সহিংসতা বা বৈষম্যের সময়ে চুপ থাকা অনেক ক্ষেত্রেই প্রশ্ন তোলে। আবার মুখ খুললেই জুড়ে যায় রাজনৈতিক তকমা। সমর্থন করলে ‘ঘনিষ্ঠতা’র অভিযোগ, সমালোচনা করলে ‘বিরোধিতা’র ছাপ। এই দ্বিমুখী চাপে শিল্পীর স্বাধীন সত্ত্বা ক্রমশ সংকুচিত হয়ে যাচ্ছে। বাস্তবতার নিরিখে এই পথ একেবারেই সহজ নয়। বর্তমান জনপরিসরে মত প্রকাশের সঙ্গে সঙ্গেই তার গায়ে লেগে যায় রাজনৈতিক রং। ফলে যে কোনও মন্তব্যই হয়ে ওঠে ঝুঁকিপূর্ণ, আর সেই ঝুঁকি এড়িয়ে যাওয়ার লক্ষ্যেই চুপ একাংশ। নেপথ্যে কি শুধুই সোশ্যাল মিডিয়া ইন্টারপ্রিটেশন? নাকি সমান্তরালে চলতে থাকা অন্য সমীকরণ? এ প্রশ্ন থেকেই যায়।