রূপসা দাশগুপ্ত রে
পুজোর ঠিক একটি সপ্তাহ আগে, ১৫ অক্টোবর থেকে শর্তসাপেক্ষে দেশের সমস্ত মাল্টিপ্লেক্স, সিনেমা হল ও থিয়েটার খোলার অনুমতি দিয়েছে সরকার। মাস ছয়েকের স্তব্ধতার পরে নতুন করে ছন্দে ফিরছে বিনোদন জগৎ। স্বাভাবিক ভাবেই স্বস্তি পেয়েছেন এই মাধ্যমটির সঙ্গে যুক্ত প্রতিটি মানুষ। সিনেমা তৈরির কারিগররা তো বটেই, প্রতিটি হল মালিক, টেকনিশিয়ান—সকলের জন্য এ সুসংবাদ আশার আলো নিয়ে এসেছে। সিনেমা দেখার অনুরাগীরাও খুশি এত দিনের বন্দিদশা ঘুচিয়ে বিনোদনের স্বাদ নেবেন বলে।
যেমন ধরা যাক, শিবপ্রসাদ-নন্দিতা জুটি প্রযোজিত ‘ব্রহ্মা জানেন গোপন কম্মটি’ সিনেমাটির কথা। লকডাউনের আগেই ৬ মার্চ মুক্তি পেয়েছিল ছবিটি। মুখ্য ভূমিকায় অভিনয় করেছেন ঋতাভরী চক্রবর্তী এবং সোহম মজুমদার। সিনেমাটি প্রবল জনপ্রিয় হলেও, এর কয়েক দিন যেতে না যেতেই বন্ধ হয়ে যায় সিনেমা হল। আর এই যে ১৫ তারিখ থেকে হল খুলবে, তখন ফের অনেক হলেই মুক্তি পেতে চলেছে এই ছবিটিই।

প্রযোজক শিবপ্রসাদ বলছেন, “খুবই আনন্দের বিষয়। কেন্দ্র ও রাজ্য দুই সরকারকেই আমি ধন্যবাদ জানাব যে তাঁরা এই উদ্যোগ নিয়েছেন। বহু মানুষের কর্মহীন সময় পেরোবে সিনেমা ইন্ডাস্ট্রি আবার মুখ তুলে দাঁড়াবে বলে আশা করছি। থিয়েটার কর্মীদের জন্য তো এটা আরও জরুরি। এ’e সত্যিই বড় পদক্ষেপ, আর আরও গর্বের বিষয় হল সারা দেশে পশ্চিমবঙ্গ প্রথম একটি দৃষ্টান্ত তৈরি করল। ১৫ তারিখে যে হল খুলবে, তখন আমাদেরই একটি সিনেমা চলবে, ‘ব্রহ্মা জানেন গোপন কম্মটি’। সিনেমাটি অসংখ্য মানুষের কাছে পৌঁছতে শুরু করেছিল। অনেক হল তাই এই সিনেমাটি দিয়েই ওপেন করছে। এটা আমার মনে হয় একটা ঐতিহাসিক মুহূর্ত হবে আমাদের কাছে। বহু হলমালিক এই সিনেমাটি দিয়ে হল খুলতে চেয়েছেন। এটা আমাদের কাছে একটা বড় পাওয়া।”

কিন্তু শুধুই প্রাপ্তি বা আনন্দ নয়, সেই সঙ্গে একটা বড় চিন্তাও রয়েছে বলে জানেলেন শিবপ্রসাদ। তাঁর কথায়, “হলমালিক, প্রযোজক, পরিচালক, কলাকুশলী—সকলের কিন্তু দায়িত্ব থেকে যাচ্ছে সাধারণ মানুষ বা দর্শকরা যে টিকিট কেটে হলে আসবেন, তাঁরা যেন নিশ্চিত মনে আসতে পারেন, সে বিষয়ে সকলকে আশ্বস্ত করা। সরকারি গাইডলাইন সাধারণের কাছে পৌঁছে দেওয়াটাও আমাদেরই কর্তব্য। দর্শকদের নিরাপত্তা আমাদের কাছে খুব দামি ও জরুরি।”

পরিচালক রাজ চক্রবর্তীও জানালেন, এই মাধ্যমের সঙ্গে যুক্ত সকলেই খুব খুশি স্বাভাবিক ভাবেই। তাঁর কথায়, "অনেক দিন ধরে আমাদের অনেকের কোনও কাজকর্ম ছিল না। অনেকের রুটিরুজি বন্ধ হয়ে গেছিল। আমরা অনেকে অনেক কাজ করে রেডি করে রেখেছি, সেগুলো কীভাবে কী হবে তা বুঝতে পারছিলাম না। আমারই যেমন 'হাবজি গাবজি' আর 'ধর্মযুদ্ধ' সিনেমা দুটো তৈরি হয়ে অনেক দিন ধরে পড়ে আছে। সেগুলো রিলিজ় হবে, আমি খুব খুশি। হয়তো এতদিন পরে প্রথমে একটু সমস্যা হবে, তবে আমার মনে হয় আমরা সকলে নিয়ম মেনে সিনেমা দেখাব, এটাই আস্তে আস্তে নর্মাল হয়ে যাবে। মাননীয় মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে এ জন্য ধন্যবাদ। সকলকে অনুরোধ, হলে এসে সিনেমা দেখুন, বাংলা সিনেমা আবার আগের মতো চলুক।"

পরিচালক কমলেশ্বর মুখোপাধ্যায় আবার বলছেন, “পুজোর এক সপ্তাহ আগে সিনেমা ও থিয়েটার যে খুলে যাচ্ছে, এটাকে আমি ভাল খবরই বলব। শিল্পমাধ্যমে যাঁরা কাজ করেন, বিশেষ করে থিয়েটারে এবং ফিল্মে, তাঁরা বহু দিন বসে রয়েছেন, কাজ করতে পারছেন না। অনেকে তাঁদের তৈরি কাজ দেখাতেও পারছেন না। তাঁদের জন্য হলটা খোলা জরুরি। তবে সতর্কতা আরও জরুরি। আমার মনে হয় শারীরিক দূরত্ব বজায় রাখা, পরিচ্ছন্নতা, মাস্ক পরা—এসব বিধি মেনে যদি হল খোলা যায়, আমার মনে হয় না খুব সমস্যা হবে।“

পাশাপাশি তিনি বলেন, “আর একটা জিনিস আমি একটু মাথায় রাখতে অনুরোধ করব, যাঁরা হল চালাচ্ছেন তাঁরাও কিন্তু বিপদে। দর্শকদের সংখ্যা অনেক কম হবে হয়তো, ফলে টিকিটের দাম তাঁদের বাড়াতে হতে পারে। আমি দর্শকদের অনুরোধ করব, এ বিষয়ে সহযোগিতা করতে। তবে হলমালিকদেরও বলব, খুব বেশি টিকিটের দাম যেন না বাড়ানো হয়। সকলেই তো এখন কম-বেশি আর্থিক সংকটে।”

শিবপ্রসাদ ও কমলেশ্বরের মতোই, পরিচালক অনিরুদ্ধ রায়চৌধুরীও স্বাগত জানিয়েছেন সরকারের এই সিদ্ধান্তকে। টেলিফোনে দ্য ওয়ালকে বললেন, “এটা তো খুবই ভাল খবর। সাধারণ মানুষ তো একটু বিনোদনের জন্য উদগ্রীবও হয়ে রয়েছে। এতদিন তো সকলেই ঘরবন্দি ছিলেন। ফলে বিনোদনের সূচনার এই দিকটাকে আমি স্বাগত জানাচ্ছি। কিন্তু আমার একটাই বক্তব্য, প্রোটোকল যেন সকলে মেনে চলেন। আমি আশা করছি সরকার কোনও একটা নিয়ম করবে, কতজন একসঙ্গে যাবে বা কখন যাবে—সেই নিয়ম যেন মেনে চলেন সকলে। মহামারীর সময়ে বিনোদন প্রয়োজন হলেও, সেই দায়িত্ববোধটা খুব জরুরি। আর হলগুলির উদ্দেশে আমি বলব, তাঁদের দায়িত্ব আরও বেশি। একটা হল মানে কিন্তু কেবল মালিক নয়, অনেকজন কর্মীর পরিবারও চলে হলের উপর নির্ভর করে। ফলে এই সময়ে হল খোলাটা সকলের জন্যই একটা আশার কথা হলেও, একইসঙ্গে সচেতনভাবে সমস্ত বিধি মেনে চলার পরীক্ষাও বটে।”