ব্রিটেনের ভারতীয় বংশোদ্ভূতদের মধ্যে সূর্যবংশীর নামে এমনই মাতামাতি, যে গ্যালারিতে জায়গা পাওয়া মুশকিল। বিবিসি, দ্য অ্যাথলেটিকের মতো প্রথম সারির সংবাদমাধ্যমের শীর্ষস্থানীয় ক্রীড়া সাংবাদিকরা হাজির।

বৈভব সূর্যবংশী
শেষ আপডেট: 17 July 2025 13:09
দ্য ওয়াল ব্যুরো: ‘বৈভব সূর্যবংশী’ (Vaibhav Suryavanshi)—নামটা উচ্চারণ করতে ঢোঁক গিলছেন কেউ, কেউ আর্ধেক বলে থেমে যাচ্ছেন। তারপর আলগা হাসি দিয়ে বিষয়টা কোনওমতে ম্যানেজ দিচ্ছেন। কিন্তু নামের গেরো একবার পেরলে সকলে একবাক্যে স্বীকার করছেন, এই কিশোরই হতে চলেছেন ভারতীয় ক্রিকেটের (Team India) আগামী দিনের পোস্টার বয়!
শচীনকে (Sachin Tendulkar) দেখেছে ভারত, বিরাটের (Virat Kohli) গ্ল্যামার এখনও পুরোপুরি মুছে না গেলেও কেরিয়ারের অস্তাচলে কিং কোহলি। তাঁদের ছেড়ে যাওয়া আসনে যদি কেউ বসতে পারেন, তিনি সমস্তিপুরের বৈভব। এই দাবি বিহার কিংবা বাংলার নয়। দাবি উঠছে ইংল্যান্ডে। তুলছেন বিদেশি ক্রিকেট অনুরাগীদের বড় অংশ।
মঞ্চ বেঁধে দিয়েছিল আইপিএল (IPL)। ভারতীয়দের মধ্যে দ্রুততম শতরানের রেকর্ড। গুজরাত টাইটানসকে একা হাতে ধ্বংস করেন বৈভব। এক ঝলকেই উবে যাবেন বলে সন্দেহ করেছিলেন যে সমস্ত অবিশ্বাসী, হাতে ধরে ইনিংস গড়তে জানেন কি না—এই মর্মে প্রশ্ন তুলেছিলেন যে সমস্ত সংশয়ী, আইপিএলে নিয়ন্ত্রিত অর্ধশতরান এবং তারপর অনূর্ধ্ব-১৯ জাতীয় দলের জার্সিতে একের পর এক পরিণত ব্যাটিংয়ের ঝলক দেখিয়ে বিহারের এই বাঁ-হাতি ওপেনার সবাইকে ভুল প্রমাণ করেছেন। বয়স মাত্র ১৪ বছর। সম্প্রতি ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে ৭৮ বলে ১৪৩ রানের ইনিংস খেলে আইপিএলের ধাক্কায় যাঁদের ঘুম ভাঙেনি, তাঁদেরও তন্দ্রাহরণ করেছেন।
এই মুহূর্তে ইংল্যান্ড সফরে রয়েছেন ভারতের সিনিয়র পুরুষ ও মহিলা দল। টিম ইন্ডিয়ার এ এবং অনূর্ধ্ব-১৯ দলও শিবির বসিয়েছে। একদিকে হরমনপ্রীতরা যখন ইংরেজদের টি-২০-তে হারিয়ে ওয়ান ডে সিরিজ জয়ের চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি, শুভমান গিলরা পিছিয়ে পড়ে টেস্ট সিরিজে কামব্যাকের চেষ্টায়, তখন চারটি অনূর্ধ্ব-১৯ একদিনের ম্যাচে ৩৫৫ রান, স্ট্রাইক রেট ১৭৪, ২৭টি ছক্কা মারার ঈর্ষণীয় পরিসংখ্যানে নজর কেড়েছেন বৈভব।
কতটা আগ্রহ আর উন্মাদনা তাঁকে ঘিরে, বুঝিয়ে দিয়েছেন ইংল্যান্ড ও ওয়েলস ক্রিকেট বোর্ডের (ECB) বিশ্লেষক ড্যানিয়েল পিকক। বলছেন, ‘আমরা একজন ভবিষ্যতের মহাতারকাকে দেখছি। ১৪ বছর বয়সে বৈভবের মতো খেলোয়াড় দেখিনি। গোটা ইংল্যান্ড মেনে নিয়েছে—এ যেন তেন্ডুলকর-কোহলির পর নতুন যুগের সূচনা!’
ব্রিটেনের ভারতীয় বংশোদ্ভূতদের মধ্যে সূর্যবংশীর নামে এমনই মাতামাতি, যে গ্যালারিতে জায়গা পাওয়া মুশকিল। বিবিসি, দ্য অ্যাথলেটিকের মতো প্রথম সারির সংবাদমাধ্যমের শীর্ষস্থানীয় ক্রীড়া সাংবাদিকরা হাজির। বাচ্চা বাচ্চা ছেলেমেয়েদের হাতে অটোগ্রাফ বই। কেউ ছ’ঘণ্টার লম্বা জার্নি সেরে এসেছেন। সকলেই সেলফি তুলতে মরিয়া। ভারতীয় বংশোদ্ভূত অনেকে শুধু ব্যাটিংটা লাইভ দেখতে চান। লন্ডনের বেকেনহ্যামের এক খুদে বলেই ফেলল, ‘বৈভবই তো তো আমার রোল মডেল! ওর আগ্রাসী ব্যাটিংটা খুব পছন্দ করি!’
ভারতীয় টিম ম্যানেজমেন্ট যদিও ব্যুম আর ক্যামেরার ফ্ল্যাশলাইট থেকে বৈভবকে আড়ালে রাখার মরিয়া চেষ্টা চালিয়েছিল। কিন্তু ব্যর্থ হয়েছে। যত সময় গড়াচ্ছে, বাড়ছে উন্মাদনা। লন্ডনবাসী ভারতীয় সরকারি কর্মী সঞ্জীব। স্ত্রীকে নিয়ে দু’ঘণ্টার পথ পেরিয়ে এসেছেন শুধুমাত্র সূর্যবংশীকে দেখতে। ‘আমি শুধু ওকেই দেখতে এসেছি। যদি একটা সেলফি নিতে পারি, সেটাই বড় পাওনা হবে!’ বলামাত্র ছেড়েছেন দীর্ঘশ্বাস।
এই মুগ্ধতা শুধু সমর্থকদের নয়। বিপক্ষ শিবির থেকেও একইরকম সম্ভ্রম আদায় করে নিয়েছেন বৈভব। ইংল্যান্ড অনূর্ধ্ব-১৯ দলের স্পিনার র্যালফি আলবার্টের বক্তব্য, ‘ওর বিরুদ্ধে আমি পুরো ওয়ান ডে সিরিজ বল করেছি। ভেবেছিলাম টেস্টে হয়তো একটু গতি কমবে। কিন্তু একটুও না! ওর মধ্যে ভয় জিনিসটাই নেই। দারুণ ক্রিকেটার!’
ইংল্যান্ড ভারতীয় ক্রিকেটে অনেক খেলোয়াড়ের ঘুরে দাঁড়ানোর, মাথা তুলে নিজের অস্তিত্ব জাহিরের আঁতুড়ঘর। আইপিএল-কে ‘ফ্লুক’ বলা নিন্দুকরা আন্তর্জাতিক ক্রিকেটকে কষ্টিপাথর বলে মনে করেন। সেখানে নিজের জাত চিনিয়ে, বিদেশি অনুরাগীদের সম্ভ্রম কুড়িয়ে ভবিষ্যতের মানপত্র আগে থেকেই লিখে নিলেন বৈভব।