বিশেষজ্ঞদের মতে, নতুন এই শুল্কনীতি রফতানির খরচ ৩০ থেকে ৩৫ শতাংশ বাড়িয়ে দিতে পারে। ফলে আমেরিকামুখী অর্ডার ৪০ থেকে ৫০ শতাংশ কমে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

প্রতীকী ছবি
শেষ আপডেট: 8 August 2025 11:00
দ্য ওয়াল ব্যুরো: ভারত থেকে আমদানি হওয়া পণ্যের উপর ৫০ শতাংশ শুল্ক চাপিয়েছে আমেরিকা। এর জেরে ওয়ালমার্ট, অ্যামাজন, টার্গেট ও গ্যাপ-এর মতো একাধিক মার্কিন রিটেল জায়ান্ট ভারতের অর্ডার আপাতত বন্ধ করে দিয়েছে। এখানকার জামা-কাপড়ের একাধিক ব্যবসায়ী জানিয়েছেন, তাঁরা ইতিমধ্যেই মার্কিন ক্রেতাদের কাছ থেকে চিঠি ও ইমেল পেয়েছেন, যাতে পরবর্তী নির্দেশ না আসা পর্যন্ত জামা-কাপড়ের চালান বন্ধ রাখতে বলা হয়েছে।
এই সিদ্ধান্তে প্রবল চাপে পড়েছে ভারতের বস্ত্র শিল্প। বিশেষত এমন সংস্থাগুলি, যারা আমেরিকাকেই মূল বাজার হিসেবে দেখে ব্যবসা করে থাকে। ওয়েলস্পান লিভিং, গোকালদাস এক্সপোর্টস, ইন্দো কাউন্টট, ট্রিডেন্ট-র মতো বড় রফতানিকারক সংস্থাগুলি তাদের মোট রফতানির ৪০ থেকে ৭০ শতাংশই পাঠায় আমেরিকায়। ফলে ব্যবসায় বড়সড় ধাক্কার আশঙ্কা করছে তারা।
বিশেষজ্ঞদের মতে, নতুন এই শুল্কনীতি রফতানির খরচ ৩০ থেকে ৩৫ শতাংশ বাড়িয়ে দিতে পারে। ফলে আমেরিকামুখী অর্ডার ৪০ থেকে ৫০ শতাংশ কমে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। এতে ভারতীয় শিল্প প্রায় ৪ থেকে ৫ বিলিয়ন ডলারের ক্ষতির মুখে পড়তে পারে। টাকার অঙ্কে যার পরিমাণ প্রায় ৩৩,০০০ থেকে ৪১,০০০ কোটি টাকা।
কেন এই শুল্ক?
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প একটি এক্সিকিউটিভ অর্ডার সই করে ঘোষণা করেছেন, ভারত থেকে আসা পণ্যের উপর ৫০ শতাংশ শুল্ক ধার্য করা হবে। এর মধ্যে ২৫ শতাংশ ইতিমধ্যেই কার্যকর হয়েছে বৃহস্পতিবার থেকে। বাকি ২৫ শতাংশ লাগু হবে অগস্টের শেষে। ট্রাম্পের অভিযোগ, ভারত ‘পরোক্ষভাবে বা প্রত্যক্ষভাবে’ রাশিয়া থেকে তেল আমদানি করে চলেছে। আর সেই কারণেই এই শাস্তি।
আমেরিকা-রাশিয়া সম্পর্ক তলানিতে। সাম্প্রতিক সময় ট্রাম্পকে বহুবার বলতে শোনা যায়, 'পুতিনের মাথা খারাপ হয়েছে, সকালে ভাল কথা বলছেন, রাতে বোমা মারছেন' এমন অনেক কথা। পরে ইউক্রেনের সঙ্গে ঝামেলাতেও মধ্যস্থতা করেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট। কিন্তু সম্পর্কে উন্নতি না হওয়ায় রাশিয়ার মিত্র দেশগুলির ওপর শুল্ক চাপাতে শুরু করেন তিনি। ট্রাম্পের এক্সিকিউটিভ আদেশে লেখা হয়েছে, 'রাশিয়া থেকে তেল আমদানি করছে এমন দেশের উপর অতিরিক্ত শুল্ক আরোপ করা আমার কাছে উপযুক্ত এবং প্রয়োজনীয় মনে হয়েছে।'
এই সিদ্ধান্তের পরিপ্রেক্ষিতে তীব্র প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে দিল্লি। বিদেশ মন্ত্রকের তরফে বলা হয়েছে, 'আমেরিকার এই সিদ্ধান্ত অন্যায্য, অযৌক্তিক এবং অবিচারপূর্ণ। আমাদের রাশিয়া থেকে তেল আমদানির বিষয়টি পুরোপুরি বাজার পরিস্থিতি এবং ১.৪ বিলিয়ন মানুষের জ্বালানির নিরাপত্তা সুনিশ্চিত করতেই নেওয়া হয়েছিল।'
সরকারের দাবি, ইউক্রেন যুদ্ধ শুরুর পর পশ্চিমের বহু দেশ তেল আমদানির উৎস বদলে ফেলে। সেই সময় আমেরিকা নিজেরাই ভারতকে রাশিয়া থেকে তেল নিতে উৎসাহ দিয়েছিল, যাতে বৈশ্বিক জ্বালানির বাজার স্থিতিশীল থাকে। এখন সেই আমেরিকাই আবার নতুন করে শুল্ক চাপিয়ে ভারতকে আক্রমণ করছে।
বিদেশ মন্ত্রক স্পষ্ট জানিয়েছে, 'যে দেশগুলি আজ ভারতকে দোষারোপ করছে, তারা নিজেরা রাশিয়ার সঙ্গে বিপুল বাণিজ্য করছে। ইউরোপীয় ইউনিয়ন ২০২৪ সালে রাশিয়ার সঙ্গে ৬৭.৫ বিলিয়ন ইউরোর পণ্যের ব্যবসা করেছে। ২০২৩ সালে পরিষেবার ব্যবসাও ছিল ১৭.২ বিলিয়ন ইউরো। শুধু তাই নয়, চলতি বছরে ইউরোপের তরল প্রাকৃতিক গ্যাস আমদানিও রেকর্ড ছুঁয়েছে, ১৬.৫ মিলিয়ন টন।'
ভারতীয় পরিকাঠামোর সঙ্গে তুলনা করে মন্ত্রকের দাবি, 'ওই দেশগুলোর রাশিয়ার সঙ্গে বাণিজ্যের পরিমাণ ভারতের থেকে অনেক বেশি। ফলে শুধুমাত্র ভারতকে টার্গেট করা সম্পূর্ণ পক্ষপাতদুষ্ট।'
বিশ্বে ভারতের অবস্থান এখন টেক্সটাইল ও পোশাক রফতানিতে ষষ্ঠ। কিন্তু আমেরিকার নতুন শুল্কের ফলে ভারতের রফতানির বাজার চলে যেতে পারে বাংলাদেশ বা ভিয়েতনামের হাতে। কারণ ওই দেশগুলির উপর আমেরিকার শুল্ক মাত্র ২০ শতাংশ। সেই জায়গায় ভারতের ক্ষেত্রে তা দাঁড়াবে ৫০ শতাংশে।
এই পরিস্থিতিতে ভারতের পোশাক শিল্প একযোগে সরকারের কাছে হস্তক্ষেপের দাবি জানিয়েছে। শিল্পমহলের মত, 'জাতীয় স্বার্থে আমরা হয়তো কিছুটা ক্ষতি সহ্য করতে পারি। কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে সুরক্ষার জন্য কেন্দ্রকে দ্রুত কূটনৈতিক হস্তক্ষেপ করতে হবে।'
এনিয়ে দিল্লির তরফে কোনও প্রতিক্রিয়া দেওয়া হয়নি।