পশ্চিমবঙ্গে ভোটের সূচি ঘোষণা হয়ে গিয়েছে। তারপরও রাজ্যের শাসক দলের পাশাপাশি দলীয় রাজনীতির বাইরে থাকা বহু মানুষের মনে প্রশ্ন, ভোট কি আদৌ হবে? নাকি, রাষ্ট্রপতি শাসন জারি করে পিছিয়ে দেওয়া হবে নির্বাচন?
.jpeg.webp)
শেষ আপডেট: 22 March 2026 16:23
পশ্চিমবঙ্গে ভোটের সূচি ঘোষণা হয়ে গিয়েছে। তারপরও রাজ্যের শাসক দলের পাশাপাশি দলীয় রাজনীতির বাইরে থাকা বহু মানুষের মনে প্রশ্ন, ভোট কি আদৌ হবে? নাকি, রাষ্ট্রপতি শাসন জারি করে পিছিয়ে দেওয়া হবে নির্বাচন?
আমি গত সপ্তাহে লিখেছিলাম, ভোটার তালিকা নিয়ে জটিলতার কারণে সুপ্রিম কোর্ট মনে করলে সকলের ভোটাধিকার নিশ্চিত করে তারপর নির্বাচন করতে বলতে পারে। তখন স্বাভাবিকভাবেই বিধানসভা ও রাজ্য সরকারের মেয়াদ শেষ হয়ে গিয়ে রাষ্ট্রপতি শাসন জারি অবশ্যম্ভাবী হয়ে উঠবে। সেই সুযোগে কেন্দ্রীয় সরকার একশো দিনের কাজের প্রকল্প, প্রধানমন্ত্রী আবাস যোজনা, আয়ুষ্মান ভারতের মতো প্রকল্পগুলিতে বিপুল অর্থ ঢেলে আনুষ্ঠানিক ক্ষমতা দখলের আগে রাজ্যবাসীর মন জয়ে বাহাদুরি করার চেষ্টা করবে। সেই সঙ্গে তৃণমূল কংগ্রেসকে ভাঙার চেষ্টাও জারি থাকবে, যাতে রাষ্ট্রপতি শাসনের কারণে তারা শহিদের মর্যাদা না পায়।

তবে এসবই নির্ভর করছে সুপ্রিম কোর্টের উপর। সাধারণত, শীর্ষ আদালত ভোট ঘোষণার পর নির্বাচন কমিশনের কাজে হস্তক্ষেপ করে না। যদিও আদালতের এই অবস্থানের সাংবিধানিক ও প্রশাসনিক যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন তোলার অবকাশ আছে। সুপ্রিম কোর্টের বর্তমান প্রধান বিচারপতির বেঞ্চ অবশ্য খানিক ভিন্ন অবস্থান নিয়ে কমিশনের বহু সিদ্ধান্তকে প্রশ্ন বিদ্ধ করেছে। এসআইআরের কাজে বিচারক নিয়োগ, ট্রাব্যুনাল গঠনের মতো সিদ্ধান্ত কমিশনের প্রতি অনাস্থার নজির। এবার একটি মৌলিক প্রশ্ন সামনে এসেছে তা হল অর্ধ কোটির বেশি মানুষের ভোটাধিকার নিশ্চিত না করে ভোট হলে তা কি আদৌ বৈধ নির্বাচন হবে?
এই জটিলতার কারণে শেষ পর্যন্ত রাষ্ট্রপতি শাসনই বাংলার ভবিতব্য কি না তা সময়ই বলবে। তবে অনেকেই উল্টো মত পোষণ করে বলে থাকেন, মোদী সরকার বিগত বারো বছরে মাত্র চারটি রাজ্যে রাষ্ট্রপতি শাসন জারি করায়। যদিও তার মধ্যে দুটি, উত্তরাখণ্ড ও অরুণাচলের ক্ষেত্রে সুপ্রিম কোর্টে কেন্দ্রীয় সরকারে নাক-কান কাটা গিয়েছে।
আসলে আগের মতো এখন আর কথায় কথায় রাষ্ট্রপতি শাসন জারি সম্ভব নয়। সুপ্রিম কোর্ট একাধিক রায়ে এইব্যাপারে দিল্লির হাত-পা বেঁধে দিয়েছে। নরেন্দ্র মোদী তাই কথায় কথায় কংগ্রেস জমানার দৃষ্টান্ত তুলে ধরে দাবি করে থাকেন তাঁর সরকার রাজ্যগুলির স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ করে না। মোদীর কথা মিথ্যে নয়, কংগ্রেস সরকার, বিশেষ করে ইন্দিরা গান্ধীর সময়ে এবেলা-ওবেলা দিল্লি থেকে রাজ্য সরকার বরখাস্ত করা হত।
তাই বলে আজকের পরিস্থিতি ইন্দিরার সময়ের থেকে ভাল বলার সুযোগ নেই। বরং মোদীর ভারতে অ-বিজেপি দল শাসিত রাজ্যগুলিতে বলতে গেলে সারা বছরই কেন্দ্রের শাসন বিদ্যমান। দিল্লির এই খবরদারির জন্য সংবিধানের ৩৫৬ ধারার অপপ্রয়োগের প্রয়োজন পড়ছে না। ফলে মোদী-শাহের গায়ে রাষ্ট্রপতি শাসন জারির কলঙ্ক লেগে নেই বটে, তবু অ-বিজেপি দল শাসিত রাজ্যগুলির নাভিশ্বাস উঠেছে।
রাজ্য সরকারগুলিকে পাশ কাটিয়ে বকলমে কেন্দ্রের শাসন জারিতে সবচেয়ে বড় হাতিয়ার রাজ্যপালেরাই, আনুষ্ঠানিকভাবে রাষ্ট্রপতি শাসন জারি হলে যাঁরা রাজ্য শাসন করে থাকেন। এছাড়া কথায় কথায় ইডি, সিবিআইয়ের অভিযান, তদন্তের নামে সিবিআই, এনআইএ-এর তৎপরতা, আইন-শৃঙ্খলার প্রশ্নে রাজ্যের পুলিশ বাহিনীকে উপেক্ষা করে সারা বছর কেন্দ্রীয় বাহিনীর অতিসক্রিয়তা তো আছেই। বাংলার পথঘাটে পুলিশের পাশাপাশি আধা সেনার উপস্থিতি সমান দৃশ্যমান। কেন্দ্রীয় বাহিনীর বড় অংশ এখন বিজেপির নেতা-মন্ত্রীদের নিরাপত্তা দিতে ব্যস্ত।
অন্যদিকে, ২০১৯-এর লোকসভা নির্বাচনের সময় থেকে কেন্দ্রের পেয়াদায় পরিণত হয়েছে নির্বাচন কমিশন। ভারতের ভোট রেফারি তখন থেকে পুরোপুরি বিজেপির গোলকিপারের ভূমিকায় অবতীর্ণ।
একটা ধারণা তৈরি করা হয়েছে, সংবিধানের ৩২৪ নম্বর অনুচ্ছেদ অনুযায়ী ভোটের ব্যাপারে নির্বাচন কমিশনই শেষ কথা। একাধিক মামলায় সুপ্রিম কোর্ট অনুচ্ছেদ ৩২৪-কে অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন পরিচালনার ক্ষেত্রে একটি ‘ক্ষমতার আধার’ বা পূর্ণাঙ্গ ক্ষমতা হিসেবে ঘোষণা করলেও স্পষ্ট করে দিয়েছে, এই ক্ষমতা নিরঙ্কুশ বা ‘সর্বশক্তিমান’ নয়। শীর্ষ আদালত বলেছে, নির্বাচন কমিশন আইনের পরিপূরক হতে পারে, কিন্তু কখনই আইনকে প্রতিস্থাপন করতে পারে না।
পূর্ণাঙ্গ ক্ষমতা সম্পর্কে শীর্ষ আদালত মহিন্দর সিং গিলের মামলায় (১৯৭৮) বলে, যেখানে আইন নীরব, সেখানে অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন নিশ্চিত করার জন্য নির্বাচন কমিশনের ব্যাপক ক্ষমতা রয়েছে। এই রায় বিবেচনায় রাখলে ভারতের যুক্ত রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থায় কমিশনের উচিত ছিল এসআইআরের মতো ভোটার তালিকার সর্বজনীয় সংশোধনের আগে রাজ্য সরকারগুলিকে ডেকে কথা বলা। কাজটি যেহেতু রাজ্য প্রশাসনকেই করতে হবে, তখন তাদের মতামত নেওয়া শুধু জরুরিই নয়, বাধ্যতামূলক। কমিশন সেই রাস্তায় না হেঁটে রাজ্যের প্রশাসনিক ক্যালেন্ডার অলটপালট করে দিয়েছে। এই ভাবে সমান্তরাল শাসন কায়েম করে একপ্রকার দিল্লির জারি করেছে। স্বাধীন ভারতের ইতিহাসে এই প্রথম মুখ্য নির্বাচন কমিশনারকে সংসদে ইম্পিচ বা অভিশংসন করার প্রস্তাব আনতে বাধ্য হয়েছে বিরোধীরা।
কেন্দ্রীয় শাসনের আর এক দৃষ্টান্ত রাজ্যের অফিসারদের যখন তখন সরিয়ে দেওয়া। বকলমে তাঁদের রাজ্যের শাসকদের ‘দলদাস’ প্রমাণের চেষ্টায় নেমেছে স্বয়ং কমিশন। কমিশনের পছন্দের অফিসারদের নিরপেক্ষতা কোন কষ্টি পাথরে যাচাই করা হচ্ছে কে জানে! কেন্দ্র-রাজ্য সম্পর্কের সবচেয়ে বিপজ্জনক দিকটি হল এই বদ্ধমূল ধারণা যে কেন্দ্র আর কেন্দ্রীয় এজেন্সি মাত্রেই দক্ষ এবং নিরপেক্ষ। নিরপেক্ষতা রক্ষার নামে নির্বাচন কমিশন অ-বিজেপি শাসিত রাজ্যগুলিতে বিজেপির কথায় প্রশাসন সাজাচ্ছে। কেন্দ্রের শাসক দলের দুর্বলতা ঢাকতে স্বয়ং রেফারি নির্বাচন কমিশন সরাসরি খেলতে নেমে পড়েছে।
নির্বাচিত রাজ্য সরকারের উপর মোদী সরকারের কেন্দ্রের শাসন চাপিয়ে দেওয়ার আরও এক নজির সর্ব ভারতীয় অফিসারদের নিয়োগ, বদলিতে নিজের হাতে ক্ষমতা কুক্ষিগত করা। এখন কথায় কথায় অফিসারদের কেন্দ্রের ডেপুটেশনে ডেকে পাঠানো রেওয়াজে পরিণত হয়েছে। পান থেকে চুন খসলে অফিসারদের দিল্লিতে ডেকে ধমকানো হচ্ছে।
এর পাশাপাশি রাজ্যগুলির আর্থিক ক্ষমতা ছাঁটাই করা হয়েছে। জিএসটির হার হ্রাসের সিদ্ধান্তকে পুরোপুরি দিল্লির কৃতিত্ব দাবি করে কেন্দ্রীয় সরকার প্রধানমন্ত্রীর ছবি-সহ লাগাতার প্রচার চালাচ্ছে। অথচ, জিএসটি আইন অনুযায়ী এই কৃতিত্বের ভাগিদার রাজ্যগুলিও। কারণ জিএসটির হার সংস্কারের সিদ্ধান্ত হয় কেন্দ্র ও রাজ্যগুলিকে নিয়ে গঠিত জিএসটি কাউন্সিলে। মনে রাখতে হবে জিএসটি চালুর জ্বালানি তেল ও মদ ছাড়া বাকি সব পণ্যে রাজ্যগুলির কর আদায়ের রাস্তা বন্ধ হয়ে গিয়েছে। অন্যদিকে, মোদী সরকার সেস ও সারচার্জ বসিয়ে বিপুল টাকা আয় করছে, যার ভাগ রাজ্যগুলি পাচ্ছে না।
আসা যাক রাজ্যপালদের ভূমিকায়। বর্তমান কেন্দ্রীয় সরকারের মতো অতীতে কোনও সরকার রাজ্যপালদের রাজ্য সরকারের সঙ্গে অসহযোগিতা, বিরোধিতায় নামায়নি। বর্তমান রাজ্যপালদের মধ্যে এই ব্যাপারে চ্যাম্পিয়ন পশ্চিমবঙ্গে সদ্য নিযুক্ত আর এন রবি। তামিলনাড়ুর রাজ্যপাল থাকাকালে তিনি রাজ্য বিধানসভায় পাশ হওয়া বিল বছরের পর বছর আটকে রেখে রাজ্যের আইনসভা এবং নির্বাচিত রাজ্য সরকারের অস্তিত্ব পদে পদে অস্বীকার করেছেন। নরেন্দ্র মোদী-অমিত শাহেরা সংবিধানের প্রতি এতটাই আস্থাহীন যে সুপ্রিম কোর্টে বারে বারে ভৎর্সিত সেই রাজ্যপালকে পদ থেকে না সরিয়ে তামিলনাড়ু থেকে বাংলায় পাঠিয়েছেন। বিধানসভায় রাজ্যপালদের ভাষণে ‘মাই গভর্নমেন্ট’ বা ‘আমার সরকার’ কথাটি এখন আর তাই কোনও সাংবিধানিক তাৎপর্য বহন করে না। রাজ্যপালেরা এখন যথার্থই কেন্দ্রের কোতোয়াল।
বিল বিতর্কে দিল্লির সরকার রাষ্ট্রপতিকেও বিতর্কে জড়িয়ে দিয়েছে। যে কারণে সুপ্রিম কোর্ট বিশেষ ক্ষমতা প্রয়োগ করে রাজ্যের বিল নিয়ে সিদ্ধান্ত নিতে রাষ্ট্রপতিকেও সময় বেঁধে দিয়েছিল। শীর্ষ আদালত পরে সেই রায় প্রত্যাহার করলেও সমস্যাটি লঘু করে দেখার অবকাশ নেই।
আরও দুর্ভাগ্যের হল রাষ্ট্রপতির সাম্প্রতিক রাজ্য সফরের প্রতিক্রিয়া। আমি মনে করি, উত্তরবঙ্গ সফরে রাষ্ট্রপতির সফরে প্রশাসনিক বিধি লঙ্ঘিত হয়েছে। একই সঙ্গে বলব, ওই ঘটনায় রাষ্ট্রপতির প্রকাশ্যে ক্ষোভ প্রকাশ এবং রাজ্য সরকারের সমলোচনা, রাজ্যের আদিবাসীদের দুর্দশা নিয়ে প্রশ্ন তোলা তাঁর পদের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ ছিল না। রাজ্য সরকারের ত্রুটি-বিচ্যুতি নিয়ে যা বলার রাষ্ট্রপতির সচিবালয় লিখিতভাবে নবান্নকে জানালেই বরং সাংবিধানিক ও প্রশাসনিক বিধি অনুসরণ করা হত। দ্রৌপদী মুর্মুর মনে রাখা দরকার তিনি ভারতের রাষ্ট্রপতি, ভারত সরকারের নন।
ওই ঘটনার পর বিজেপির নেতা-মন্ত্রীরা তো বটেই, রাজ্য সফরে এসে প্রধানমন্ত্রী মোদী পর্যন্ত রাষ্ট্রপতিকে অবমাননার অভিযোগ তুলে ভোটের বাজার গরম করে গিয়েছেন। রাষ্ট্রপতির এবাবে কেন্দ্রের হাতের খেলনা হওয়া অত্যন্ত দুর্ভাগ্যের।