দ্য ওয়াল ব্যুরো: অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটি ঘোষণা করেছে করোনা প্রতিরোধে জীবনদায়ী ওষুধ ডেক্সামিথাসোন। এই স্টেরয়েড সঙ্কটাপন্ন কোভিড রোগীদের পেশীতে বা শিরার মধ্যে ইনজেক্ট করে দেখা গেছে শরীরের তীব্র প্রদাহ কমেছে, অক্সিজেন সরবরাহ স্বাভাবিক হতে শুরু করেছে। দাবি এমনটাও, ভেন্টিলেটর সাপোর্টে থাকা রোগী যাদের মৃত্যুর ঝুঁকি বেশি ছিল, তাদের এক তৃতীয়াংশই এই ওষুধের ডোজে স্থিতিশীল অবস্থায় চলে এসেছে। ডেক্সামিথাসোনের ডোজের কারণেই অক্সিজেন সাপোর্টে থাকা রোগীরাও স্বাভাবিক পরিবেশে ধীরে ধীরে শ্বাস নিতে পারছে।
করোনার ‘রিকভারি ট্রায়াল‘-এ এইচআইভির ওষুধ লোপিনাভির-রিটোনাভির, অ্যাজিথ্রোমাইসিন, রেমডেসিভির, টোসিলিজুমাবের তুলনায় ডেক্সামিথাসোনকেই এখন আগে রাখছেন অক্সফোর্ডে গবেষকরা। ইউনিভার্সিটির মেডিসিন বিভাগের ইমার্জিং ইনফেকসিয়াস ডিজিজ বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক পিটার হার্বে বলেছেন, ডেক্সামিথাসোন এমন একটি ড্রাগ যা প্রথমবার সঙ্কটাপন্ন কোভিড রোগীদের মৃত্যুর ঝুঁকি কম করেছে। সঠিক ডোজে এই ওষুধ প্রয়োগ করলে সিভিয়ার অ্যাকিউট সিন্ড্রোমে ভোগা রোগীদেরও অক্সিজেন সাপোর্ট দেওয়ার প্রয়োজন পড়ে না। এখন প্রশ্ন হল, প্রায় ৬০ বছরের পুরনো ওষুধকেই কেন জীবনদায়ী বলছেন অক্সফোর্ডের বিশেষজ্ঞরা। তার অনেক কারণ।
[caption id="attachment_230556" align="alignnone" width="1280"]
ডেক্সামিথাসোনের ট্রায়ালের দায়িত্বে থাকা গবেষক পিটার হার্বে[/caption]
রিউমাটয়েড আর্থাইট্রিস থেকে ইনফ্ল্যামেশন, সোরিয়াসিস থেকে ক্যানসারের ট্রিটমেন্ট--কর্টিকোস্টেরয়েড ডেক্সামিথাসোনের অনেক গুণ
প্রথমেই জেনে নেওয়া যাক এই ডেক্সামিথাসোন ওষুধটি কেমন। এটি আসলে কর্টিকোস্টেরয়েড। এমন স্টেরয়েড যাকে কৃত্রিমভাবে তৈরি করা হয়। মানুষের অ্যাড্রিনাল গ্রন্থি থেকে যে কর্টিসোল হরমোন নিঃসৃত হয় প্রাকৃতিকভাবে, এই কর্টিকোস্টেরয়েড ঠিক তারই অনুরূপ। এর

কাজ অনেক। মূলত ইনফ্ল্যামেশন বা প্রদাহজনিত রোগ সারানো। রিউমাটয়েড আর্থ্রাইটিস, সোরিয়াটিক আর্থ্রাইটিস, জুভেনাইল আর্থ্রাইটিস, লোপাসের মতো রোগের চিকিৎসায় এই ওষুধ ব্যবহার করা হয়। শরীরে প্লেটলেট বা অনুচক্রিকার সংখ্যা কমে গেলে যাকে বলে ‘ইডিওপ্যাথিক থ্রম্বোসাইটোপেনিক পারপারা’, সেই অবস্থাতে ৪০ মিলিগ্রাম ডোজে ডেক্সামিথাসোনের থেরাপি চলে।
তাছাড়াও যে কোনও সংক্রামক রোগের চিকিৎসাতেও ডেক্সামিথাসোলের প্রয়োগ হচ্ছে বহুদিন থেকেই। অ্যালার্জি, ত্বকের যে কোনও সংক্রামক রোগ, র্যাশ, সোরিয়াসিস সারাতেও এই ওষুধ প্রেসক্রাইব করেন ডাক্তাররা। ক্যানসার রোগীদের বিশেষত কেমোথেরাপি চলার সময় প্রদাহ কমাতে এই ওষুধের ব্যবহার হয়। মাল্টিপল মায়োলোমার ট্রিটমেন্টেও কেমোথেরাপিউটিক অ্যাজেন্ট হিসেবে এই ওষুধের ব্যবহার চলে।
ইনফ্ল্যামেশন বা প্রদাহ সারানোই যেহেতু এই ওষুধের অন্যতম মূল ভূমিকা তাই করোনার চিকিৎসাতেও ডেক্সামিথাসোনের পরীক্ষামূলক প্রয়োগ করেন অক্সফোর্ডের গবেষকরা। এক্ষেত্রে সার্স-কভ-২ ভাইরাসের সংক্রমণ হলে সাইটোকাইন নামে যে প্রোটিনের অধিক ক্ষরণের কারণে তীব্র শ্বাসকষ্ট বা কোষের ক্ষত তৈরি হচ্ছে শরীরে, সেটা সারাতেই এই ওষুধের থেরাপি করেন ডাক্তাররা। দেখা গেছে, কম ডোজে এই ওষুধ সাইটোকাইনের অধিক ক্ষরণ বা সাইটোকাইন স্টর্ম রুখে দিতে পারছে। যার কারণে তীব্র প্রদাহের হাত থেকে রেহাই পাচ্ছে রোগী। সাইটোকাইন প্রোটিন নিঃসরণের মাত্রা নির্দিষ্ট সীমায় চলে এলেই শরীরের ভারসাম্য বজায় থাকবে। ফলে ইনফ্ল্যামেশনজনিত অস্বস্তি এবং শ্বাসকষ্ট ধীরে ধীরে কমতে থাকবে।
ডেক্সামিথাসোনের রিকভারি ট্রায়াল
সাড়ে ১১ হাজার রোগীর উপরে রিকভারি ট্রায়াল চালাচ্ছে অক্সফোর্ড। তাদের মধ্যে ১৭৫ জন ন্যাশনাল হেলথ সার্ভিস (এনএইচএস)-এর স্বাস্থ্যকর্মী। গবেষক পিটার জানিয়েছেন, ২১০৪ জন রোগীর উপরে ডেক্সামিথাসোনের থেরাপি করা হয়েছে। প্রতিদিন ৬ মিলিগ্রাম ডোজে দিনে একবার করে টানা ১০ দিন অবধি ওষুধ দেওয়া হয়েছে রোগীদের। অন্যদিকে, ৪৩২১ জন রোগীকে অন্যান্য ওষুধের ট্রায়ালে রেখে তুলনামূলক পর্যবেক্ষণ করা হয়েছে। দেখা গেছে, ডেক্সামিথাসোনের ডোজে ভেন্টিলেটর সাপোর্টে থাকা সঙ্কটাপন্ন কোভিড রোগীদের ৪১ শতাংশের মৃত্যুর ঝুঁকি কম হয়েছে। অক্সিজেন সাপোর্টে রাখা হয়েছিল যাদের সেই রোগীদের ২৫ শতাংশেরই শ্বাসপ্রশ্বাসের প্রক্রিয়া স্বাভাবিক হয়েছে। ডেক্সামিথাসোনের ডোজে ১৩ শতাংশ রোগীকে এখন আর কৃত্রিমভাবে ভেন্টিলেটর বা অক্সিজেন সাপোর্ট দেওয়ার প্রয়োজন হচ্ছে না।