দ্য ওয়াল ব্যুরো: কয়েক দিন আগে হাতের শিরা কেটে আত্মঘাতী হয়েছিলেন প্রাক্তন আইজি গৌরব দত্ত। আত্মহত্যার কারণ নিয়ে মুখ খোলেনি পুলিশ। আজ, সোমবার বিস্ফোরক অভিযোগ আনলেন গৌরব দত্তের স্ত্রী। তাঁর দাবি, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সরকারের কাছে ক্রমাগত 'অপমানিত' ও 'হেনস্থা' হওয়ার কারণেই এই চরম পদক্ষেপ করেছেন গৌরব।
গত মঙ্গলবার বিধাননগরের বাড়িতে হাতের শিরা কাটা অবস্থায় উদ্ধার হয় ১৯৮৬ ব্যাচের আইপিএস অফিসার গৌরব দত্তের দেহ। গত বছরেই স্বেচ্ছা-অবসর নেন তিনি। সূত্রের খবর, তাঁকে এক রকম বাধ্য করা হয় অবসর নিতে। আত্মহত্যা করার আগে তিনি তাঁৎ এক সহকর্মীকে একটি চিঠি লেখেন। পুলিশ জানিয়েছে, ওই চিঠিটিই কার্যত গৌরবের সুইসাইড নোট। ওই চিঠিতেও তিনি তাঁকে দশ বছর ধরে হেনস্থা করার জন্য মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে দুষেছেন বলে জানা গিয়েছে।
ওই চিঠিতে গৌরব লেখেন, "পশ্চিমবঙ্গের বর্তমান মুখ্যমন্ত্রী আমায় দশ বছর ধরে হেনস্থা করছেন। কোনও কারণ ছাড়াই আমার প্রতি এই আক্রমণাত্মক মনোভাব কেন, আমি জানি না। আমায় ক্রমাগত অপমান করছেন উনি।"
গৌরব দত্তের স্ত্রী সোমবার সাংবাদিকদের জানিয়েছেন, তিনি স্বামীর মৃত্যুর বিচার চান। তিনি বলেন, "আমার স্বামী সারা জীবন কাজের স্বার্থে নিজেকে উৎসর্গ করেছেন। ওঁর সঙ্গে যেটা হল, সেটা যেন অন্য কোনও অফিসারের সঙ্গে না হয়। আমি বিচার চাই, আমি এর শেষ দেখে ছাড়ব।"
তিনি আরও বলেন, "গত দশ বছর ধরে ওঁকে কোথাও পোস্টিংই দেওয়া হয়নি, দু'টো ভিত্তিহীন মামলার জন্য। একটা হল, মানবাধিকার লঙ্ঘনের জন্য, অন্যটা ভিজিল্যান্স কমিশন সম্পর্কিত। শুধু এই জন্য গত দশ বছর ধরে ওঁর ফাইলগুলো আটকে রাখা হয়েছে।"
ন'বছর আগে, ২০১০ সালে সাসপেন্ড হন গৌরব। তাঁর বিরুদ্ধে বড় অভিযোগ আনেন এক পুলিশ কনস্টেবলের স্ত্রী। তিনি দাবি করেন, শারীরিক সম্পর্ক স্থাপনে রাজি না হওয়ায় তাঁর স্বামীকে মারধর করেছেন গৌরব। সেবার ন'মাসের জন্য সাসপেন্ড হন তিনি। ২০১২ সালে আবার তাঁকে ঘিরে বিতর্ক হয়। সেবার আর্থিক অনিয়মের অভিযোগ ওঠে তাঁর বিরুদ্ধে।
গৌরব দু'বারই দাবি করেছিলেন, তিনি নির্দোষ। তিনি চক্রান্তের শিকার। এর পরে ২০১৮ সালে স্বেচ্ছা অবসর নেন গৌরব। তার পর থেকেই তাঁর অবসর-সংক্রান্ত সমস্ত নথি সরকারি ফাঁসে আটকে আছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
গৌরব দত্তের স্ত্রী বলেন, "ওঁর সমস্ত প্রাপ্য আটকে দেওয়া হয়েছে। যে ভাবে সম্ভব, সে ভাবেই হেনস্থা করা হয়েছে ওঁকে। উনি অনেক বার মুখ্যমন্ত্রীর কাছে আবেদন করেছেন, অন্য সরকারি অফিসারদের কাছেও গিয়েছেন। কিন্তু কোনও সাহায্য মেলেনি। দশ-দশটা বছর ধরে আটকে আছে সমস্ত কাগজ, কী করে মিলবে প্রাপ্য!"
তাঁর দাবি, গৌরব দত্তের সঙ্গে সরকারি ভাবে যে আচরণ করা হয়েছে, তা অত্যন্ত অপমানজনক। গৌরব মুখ্যমন্ত্রীকে চিঠি পর্যন্ত লিখেছিলেন, কিন্তু উত্তর আসেনি। গৌরবের স্ত্রীয়ের অভিযোগ, "উনি যখন বারবার জিজ্ঞেস করেছেন রাজ্য সরকাকে, যে ওঁর বিরুদ্ধে রুজু হওয়া মামলার ফাইলগুলি কী অবস্থায় আছে, তখন উত্তর পেয়েছেন, ফাইলগুলি হারিয়ে গিয়েছে।"
তাঁর আরও অভিযোগ, গত সপ্তাহের মঙ্গলবার গৌরবের মৃত্যু হওয়ার পরে পুলিশ সমস্ত তথ্য-প্রমাণ নিয়ে চলে গিয়েছে।
অন্য দিকে, এই ঘটনার ফায়দা তুলতে উঠে পড়ে লেগেছে বিরোধীরা। আইপিএস অফিসার গৌরব দত্তর মৃত্যুর ঘটনায় মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে গ্রেফতার করার দাবি জানালেন বিজেপি নেতা মুকুল রায়।
মুকুল বলেন, ‘বাংলায় এই প্রথম কোনও (প্রাক্তন) আইপিএস অফিসার নিজের মৃত্যুর জন্য মুখ্যমন্ত্রী বা দলের নেতাকে দায়ী করলেন।' ইতিমধ্যে গৌরবের সুইসাইড নোটটি সোশ্যাল মিডিয়ায় ভাইরাল হয়েছে। তাতে টাকা বাকি রাখা ছাড়া আরও একটি বিষয়ের উল্লেখ আছে সেটি গৌরবকে কম্পালসারি ওয়েটিঙে রাখা সংক্রান্ত। দীর্ঘ দিন কম্পালসারি ওয়েটিঙে থাকার পর ১৯৮৬ ব্যাচের এই আইপিএস অফিসার গত বছরের ৩১ ডিসেম্বর অবসর নেন। তখন থেকেই তাঁর ভাতা বকেয়া রয়েছে বলে ওই নোটে দাবি করেন গৌরব।
রাজ্য সরকারের তরফে এ ব্যাপারে সরকারি ভাবে কিছুই বলা হয়নি। তবে সূত্র বলছে গৌরব যে সমস্ত বকেয়ার কথা জানিয়েছেন তার কোনওটাই তাঁর প্রাপ্য নয় কারণ তিনি কম্পালসারি ওয়েটিঙে ছিলেন।