
শেষ আপডেট: 12 June 2021 17:39
বাথরুম পরিষ্কার করার অ্যাসিড খেয়েছে এড়োয়ালির রবীন দত্ত। আধবোতল খেতে পেরেছিল, বাকিটা কলঘরের মেঝে খেয়েছে। পুরোনো শ্যাওলা ক্ষয়ে পরিষ্কার সাদা হয়ে গেছে জায়গাটা। উঠানে সজনে গাছে ফুল এসেছে অনেক। ভর দুপুরে কুসুম বিছানো পথ বেয়ে পাড়ার ছেলেরা রবীনকে বের করে রিক্সা ভ্যানে তুলেছে। মুখে সাদা ফ্যানা তখন, চোখের মণি ঠেলে বেরিয়ে এসেছে। গোঙাচ্ছে আর জড়ানো গলায় চিৎকার করে বলছে রবীন- 'জ্বলে গেল, পুড়ে গেল'।
শেষ রাতে মর্গ থেকে বডি ছেড়েছিল। খাদ্যনালি পুড়ে কয়লা। জল খেতে চাইছিল। মুখে দিলে কষ বেয়ে গড়িয়ে পড়ছে গলায়। হাত পায়ের খিল ছেড়ে দিয়েছে। শুধু ধুকপুক করছে নাছোড় এক দীপশিখা। লোকে বলে হৃদয় থেকে ষোলো যব নীচে নাকি থাকে ওই ব্রহ্মবস্তু।
আজ নিয়ে তিনদিন হল। অপঘাতে মরলে কাজ ওই তিনদিনের মাথায়। পিণ্ড দিতে হবে, নাহলে কেঁদে কেঁদে মরবে জীবাত্মা। সন্ধেবেলায় খোলে বোল উঠবে, নামগান হবে, তার শব্দে ওই অশরীরী ছটফট করবে। কিন্তু কোথায় পালাবে সে? রবীন এখন প্রেতযোনির বাসিন্দা, জলচল নয় আমাদের সংসারে।
ওর ঘরে একখানি পেরেক পুঁতে দিয়েছে ভট্চায পুরোহিত। ওই লোহার কীলক দূরে সরিয়ে রাখবে প্রেত।
ওধারে জানলা, তারপর পুঁটি পুকুর, রেললাইন, তারও পরে আকাশ ধু ধু জংলা জমি অবাধ আকাশ। বাড়ির হাঁসগুলোকে সন্ধেবেলায় শ্যামা পুকুরপাড় থেকে গলা তুলে ডাকে, চই চই চই। দল বেঁধে তারা ঘরে ফেরে।
গেরস্ত বাড়ির আঙিনায় দীপ জ্বলে ওঠে। শঙ্খ বাজে গৃহলক্ষ্মীর থানে। ভরভরন্ত সংসার। হাসি গান আর আনন্দে উজ্জ্বল। শুধু একজন নাই। অনেক রাতে, যখন চাঁদ ওঠে একফালি বা মেঘে ঢাকা পড়ে যায় নক্ষত্রদল, ঘুরে বেড়ায় অচেনা বাতাস, পুঁটি পুকুরের ওপারে ঘন শটিবন আর বাবলা গাছের জঙ্গল ভেদ করে কে যেন ডাকে 'মা! মা'!
পৃথ্বীশ আসার কয়েকদিন আগে ঋষা এমনই এক ডাক শুনে ঘুম থেকে জেগে উঠেছিল। তখন নিশুত রাত। বারান্দায় এসে পশ্চিমের বাগানের দিকে চেয়ে রইল কিছুক্ষণ। জনহীন রাত্রে কোথাও একটি হুতোম প্যাঁচা ডেকে উঠল। মুঠি ভরা নক্ষত্রের মতো জোনাক জ্বলছে চারপাশে। ঘরে ফিরে আলো জ্বালাতে গিয়ে দেখল কারেন্ট অফ। দরজার বামদিকে একখানি লণ্ঠন জ্বলছে। সেটিকে বিছানায় নিয়ে প্রপিতামহ শঙ্করনাথ ভট্টাচার্যের পুরাতন খাতাটি খুলে বসল ঋষা। গতকাল সিন্দুকের ভেতরে একটি গোপন দেরাজ থেকে খুঁজে পেয়েছে। লাল বিবর্ণ মলাট। এই ধরনের খাতায় একসময় সেরেস্তার হিসাব লেখা হত। কালি অস্পষ্ট হয়ে এসেছে, কোথাও পাতা প্রায় ঝুরঝুরে, যেন স্পর্শ করলেই হাহাকারের মতো ভেঙে যাবে। মাথা নীচু করে ক্ষীণ আলোয় ঋষা দেখল দিন-তারিখ ছাড়া কতগুলি বাক্য টানা হাতের লেখায় শঙ্করনাথ লিখেছেন,
'আজ বৈকালে মেঘ করিয়া আসিল। কেমন অভিমানী যুবতির বেদনার মতো আঁধারে আচ্ছন্ন হইল চরাচর। আমি জানলার পাশে বসিয়া চাহিয়া রইলাম। সামনের গাছটিতে দিনান্তের মলিন আলো আসিয়া পড়িয়াছে, কতগুলি শালিখ ডালে ডালে নাচিয়া বেড়াইতেছে। তাহাদের আনন্দ দেখিয়া পুবদেশ হইতে বৃষ্টি আসিতেছে।
বাতাস বহিতেছে। নওল কিশোরের মনোবেদনার ন্যায় চঞ্চল বাতাস। যেন কেহ বহুদূর দেশে বাঁশি বাজাইতেছে। অলস বসিয়া বসিয়া শুনিতেছি আর আপনাদিগের কথা মনে পড়িতেছে।
তিনজনকে একত্রে মনে পড়িতেছে। ইদানীং আপনাদিগের কথা ভাবিলেই আমার মনে কৈশোরকাল ভাসিয়া উঠে! কতবার ভাবিয়াছি, শাপলা ভরা দিঘির পৈঠায় আপনাদিগকে লইয়া বসিয়া থাকিব। চৈত্রের দ্বিপ্রহর, কতগুলি জলফড়িং উড়িয়া বেড়াইতেছে। খাঁ খাঁ রৌদ্র, দিঘির পাড়ে সুপারি বন তিন চারটি তালগাছ, তাহার পর আদিগন্ত প্রান্তর। কয়েক পা হাঁটিলেই একটি নদী চোখে পড়িবে। নদীটির নাম কীর্তনখোলা। যাইবেন আমার সহিত নদীচরে?
আসলে সংসার ওইরূপ একটি নদীচর। যখন জন্ম হইয়াছিল তখন জীবন লইয়া কত আশা ছিল, স্বপ্ন ছিল। সেসকল কিছুই পূর্ণ হইল না। আমারও হয় নাই। কাহারও হয় না। উহাই স্বাভাবিক। কিশোরকালের কথা মনে করিলে দেখিতে পাই, সেই দিনটি আর আজ এই মধ্য যৌবনের দিনটি, দুটিই নূতন। দুটিই অনন্য। তাহাদের মাঝখান দিয়া বহিয়া গিয়াছে পথ। পথের দুইপার্শ্বে কত মানুষ কত বেদনা আনন্দ অভিমান! মেলা বসিয়াছে। নাগরদোলা চড়িয়া কত মানুষ উঠিতেছে নামিতেছে। ওই বালক ভেঁপু কিনিয়া বাবার হাত ধরিয়া বাজাইতে বাজাইতে গৃহের পথে ফিরিতেছি। কেমন রৌদ্র আর মেঘ উঠিয়াছে ভুবনডাঙায়! আমিও যাইতেছি! এর তুল্য আনন্দ আর নাই।
পথের ধুলায় পড়িয়া থাকা ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র মণি গাঁথিয়া যে মালাখানি তৈয়ার করিব তাহাই আমার পুরস্কার। অন্তরে যে অপরূপ সুর বাজিবে তাহা অস্ত সবিতার মতো উজ্জ্বল। ওই যে সকলে ফিরিতেছে, উহারা ফিরিবে নিজ নিজ গৃহে। অথচ আমি ফিরিব না। আমার সহিত যাইবেন?
কীর্তনখোলার চরে নৌকো বাঁধিয়া রাখিয়াছি। পূর্বগামী বাতাসে ভর করিয়া ভাসিয়া যাইব। কত দূর দেশে যাইতে হইবে... কত সংসার আনন্দ বেদনা পার হইয়া... কত অপমান অভিমান লাঞ্ছনা যশ কীর্তি সব পার হইয়া ভাসিয়া যাইবে ক্ষুদ্র ডিঙাখানি। দূর হইতে দূরতম দ্বীপে ভাসিয়া যাইবে। বাতাস বৈরাগী হইয়া গান গাহিবে। আলো ফুটিবে শিশুর হাসি হইয়া। আমরা সকলে অবাক চোখে চাহিয়া দেখিব।
অপরাহ্ণে মেঘছায়াতলে বসিয়া এইসকল ভাবিতেছিলাম, হঠাৎ মনে পড়িল আমার কথা। মন ফিরিয়া আসিল। কত অসমাপ্ত কাজ পড়িয়া রহিয়াছে। কর্মক্ষয় যে এখনও হয় নাই, কী করিব!
শ্রাবণসন্ধ্যা বড় মলিন। দূর আকাশে দরিদ্র বালক বালিকার মতো মেঘ ভাসিয়া যাইতেছে। আপনাদিগের পটচিত্রখানি কতদিন পরিষ্কার করি নাই। আজ করিব। একটি দীপ জ্বালিব। তারপর সম্মুখে বসিয়া আপনাদিগকে দেখিব, শুধুই দেখিব। কোনও কথা কহিব না, চাহিয়া থাকিব অপলক।
সেইরূপ আপন করিয়া ভালবাসিতে হয়তো পারি নাই কিন্তু চাহিয়া থাকিতে তো পারি, উহাতেই আমার আনন্দ।'
সায়ন্তন ঠাকুর, গদ্যকার, সরল অনাড়ম্বর একাকী জীবনযাপনে অভ্যস্ত। পূর্বপ্রকাশিত উপন্যাস নয়নপথগামী ও শাকম্ভরী। প্রকাশিত গল্পগ্রন্থ, বাসাংসি জীর্ণানি।