
শেষ আপডেট: 17 November 2022 11:53
দ্য ওয়াল ব্যুরো, পূর্ব বর্ধমান: করোনা আতঙ্কে মাঝের দুটো বছর এমনই গেছে। কার্তিক লড়াইয়ের (Katwa Kartik Lorai) কথা চিন্তাও করতে পারেননি বাসিন্দারা। দু-বছর পর আবার কার্তিক পুজোয় মাতল কাটোয়া।
উৎসবমুখর (Celebration) বাঙালির কাছে দুর্গাপুজো, কালীপুজো, জগদ্ধাত্রী পুজোর শেষে আছে আরও এক উৎসব, যার পোশাকি নাম কার্তিক পুজো। বাংলার অন্যতম এই লোক উৎসব কাটোয়ার মানুষের কাছে ‘কার্তিক লড়াই’ নামেই পরিচিত।
কাটোয়ায় কার্তিক পুজোর শুরু নিয়ে অনেক মত আছে। তবে সর্বাধিক প্রচলিত মতটি হল মূলত বারবণিতাদের হাত ধরে কাটোয়ায় পুজো পেতে শুরু করেছিল কার্তিক। ইতিহাস গবেষকদের মতে, আলীবর্দীর শাসন কালের শেষ সময়ে ১৭৫০ সাল নাগাদ বারবণিতারা কাটোয়ায় প্রথম কার্তিক পুজো শুরু করেছিলেন। বর্গী দস্যু ভাস্কর রাম পণ্ডিত কাটোয়াকে রাজধানী ঘোষণা করে দক্ষিণবঙ্গ জুড়ে অবাধে লুটপাট চালাতে শুরু করেছিল। তখন বর্গী সৈন্যদলের মনোরঞ্জনের জন্য গ্রাম থেকে যুবতীদের জোর করে ধরে এনে কাটোয়ার উপকন্ঠে নবনগর বা কখনও কাটোয়ার গঙ্গা তীরবর্তী স্থানে রাখা হত।
খুনের দিন দু’বার সুপ্রিয়াদের বাড়ি গিয়েছিল প্রবাল! সিসিটিভি ফুটেজে চাঞ্চল্যকর তথ্য পুলিশের হাতে
আলীবর্দীর তাড়া খেয়ে বর্গী দস্যুরা কাটোয়া ছাড়লেও সেই শিকড়চ্যুত মহিলারা গঙ্গা তীরবর্তী স্থানেই পাকাপাকিভাবে বসবাস করতে শুরু করেন। বাণিজ্য নগরী কাটোয়ায় আসা বণিকদের মনোরঞ্জনকেই নিজেদের পেশা হিসেবে নেন তাঁরা। গবেষকদের দাবি, সন্তান কামনায় এই মহিলারাই কার্তিক আরাধনা শুরু করেছিলেন।
যদিও ভিন্ন আরেকটি মত, প্রাচীন কালে কাটোয়া জনপদ ছিল গঙ্গারিডি সভ্যতার অন্তর্ভুক্ত অঞ্চল। যুদ্ধের দেবতা কার্তিক সেই সময়েই কাটোয়ায় এসেছিলেন। ইতিহাস আর লোককথায় মিলেমিশে কবেই যেন কাটোয়ার ঐতিহ্যের সঙ্গে জড়িয়ে যায় কার্তিক পুজো। শোনা যায়, এই পুজোর সময় নানান আকৃতির পুতুল সাজিয়ে পৌরাণিক নানা গল্প ফুটিয়ে তোলা হত। একে বলা হত ‘থাকা’।
আদি কাটোয়ায় কার্তিক পুজোর সময় এমন ‘থাকা’ বাঁশের চাঙরে বেঁধে বাবুদের ভাড়া করা বেহারার দল বহন করত। নগরের স্বল্প পরিসর রাস্তায় কোন বাবুর ‘থাকা’ আগে যাবে তার একটা সুস্থ প্রতিযোগিতা হত। সেই দৃশ্য ছিল উপভোগ করার মতোই। সেটাই পরবর্তী কালে লড়াই নামে খ্যাতি লাভ করল। শোভাযাত্রায় সেই সাবেক প্রথা না থাকলেও আজও সেই পরম্পরা মেনেই কাটোয়ার কার্তিকের শোভাযাত্রাকে কার্তিক লড়াই বলা হয়।
কাটোয়ার কার্তিক লড়াই দেখতে বীরভূম, মুর্শিদাবাদ, নদিয়া ও পূর্ব বর্ধমান থেকে কয়েক লক্ষ দর্শনার্থী আসেন কাটোয়ায়। আলোর বন্যায় তখন ভেসে যায় কৃষি ভিত্তিক এই প্রান্তিক শহর। লক্ষ লক্ষ টাকা খরচ করে নান্দনিক প্যান্ডেল, শহরের প্রবেশ পথে দাঁড়িয়ে থাকা বিশালাকার তোরণ, সবকিছু রাতারাতি বদলে দেয় শহরের ছাপোষা চেহারাটা। নজর কাড়া আলোকসজ্জায় শহরের পথঘাটের চেহারার আমুল পরিবর্তন ঘটে যায়। দু বছর পর ফের কাটোয়ায় সেই চেনা ছবি।
কোথাও বাঁশ দিয়ে বাংলার লুপ্তপ্রায় শিল্পকে তুলে ধরা হয়েছে। কোথাও আবার বেত ও ফাইবারের সুচারু কাজ ফুটিয়ে তোলা হয়েছে সুদৃশ্য প্যান্ডেলে। কোথাও পাতার উপর প্যান্ডেল করে জীব বিজ্ঞানের বৈচিত্রকে তুলে ধরা হয়েছে। আরব দেশের বুর্জ খলিফার আদলে সুদৃশ্য প্যান্ডেল শহরের গর্ব বাড়িয়েছে। দৃষ্টিনন্দন ইন্ডিয়া গেট, লোহার স্ক্র্যাপ দিয়ে তৈরি ভাস্কর্যও নজর কাড়ছে। কাল্পনিক রাজবাড়ির আদলে নান্দনিক প্যান্ডেল দেখে চোখ ফেরাতে পারছেন না দর্শনার্থীরা।
উৎসবে যোগ দেওয়া মানুষের নিরাপত্তার জন্য গোটা শহর সিসি ক্যামেরা দিয়ে মুড়ে ফেলা হয়েছে বলে জানালেন পূর্ব বর্ধমান জেলার পুলিশ সুপার কামনাশিস সেন। এবারের প্রশাসনের অনুমোদিত পুজোর সংখ্যা ৮৮ টি হলেও কাটোয়া শহরে পুজো হচ্ছে প্রায় দেড়শোটি।