
শেষ আপডেট: 18 September 2023 10:16
দ্য ওয়াল ব্যুরো: ডেঙ্গি হেমারেজিক ফিভার (Dengue Hemorrhagic Fever) বা শক সিন্ড্রোমেই মৃত্যু হয় রোগীর। ডেঙ্গি জ্বর তিন থেকে সাত দিন থাকে, এরপর জ্বর কমতে থাকে। জ্বর কমতে শুরু করার পর পরই আসল বিপদটা শুরু হয়। এইসময়ে শরীরে সাইটোকাইন-স্টর্ম (cytokine storm) শুরু হয়ে যায়, ফলে প্রদাহ বাড়ে (dengue shock syndrome)। নানা জটিলতার সূত্রপাত তখন থেকেই।
ডেঙ্গি জ্বর কমার পরেই শুরু হয় সাইটোকাইন স্টর্ম
আরজি কর মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতালের সহকারী অধ্যাপক (কমিউনিটি মেডিসিন) ও জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডাঃ অনির্বাণ দলুই বলেছেন,
ডেঙ্গি (Dengue) হেমারেজিক ফিভার আগেও হত। বস্তুত, ডেঙ্গিতে (Dengue) মৃত্যুর কারণই হল হয় হেমারেজিক ফিভার Dengue Hemorrhagic Fever) , না হলে শক সিন্ড্রোম। ডেঙ্গির চরিত্রই তাই। জ্বর যেদিন থেকে কমতে থাকে, ডেঙ্গির খারাপ সময়টা সেদিন থেকেই শুরু হয়। এরপর থেকেই রোগীর শরীরে সাইটোকাইন স্টর্ম বা হাইপার ইমিউন রিঅ্যাকশন শুরু হয়ে যায়। সাইটোকাইন স্টর্ম হচ্ছে যখন শরীরের ইমিউন কোষই (রোগ প্রতিরোধী কোষ) শত্রু হয়ে ওঠে। অতিসক্রিয় হয়ে অন্যান্য সুস্থ কোষগুলিকে আক্রমণ করতে শুরু করে। তখন শরীরে নানারকম প্রদাহ সৃষ্টিকারী (dengue shock syndrome) পদার্থগুলো বের হতে থাকে। ফলে শরীরের ভেতরে প্রদাহ বা ইনফ্ল্যামেশন (Inflammation) শুরু হয়।
আরও পড়ুন: জ্বরের পর তিন দিন অপেক্ষা নয়, প্রথম দিনই ডেঙ্গি টেস্ট করান
এই প্রদাহ সৃষ্টিকারী পদার্থগুলো মূলত দুটো জায়গায় হামলা করে--১) প্লেটলেট ( Platelets) বা অনুচক্রিকাগুলোকে ভাঙতে থাকে, ২) ক্যাপিলারি বা শরীরের রক্তজালিকাগুলির দেওয়ালে ফুটো করে দেয়। ফলে সেখান থেকে ফ্লুইড লিক করতে থাকে। ফলে কোষেগুলিতে জলশূন্য়তা তৈরি হয়। ডেঙ্গি শক সিন্ড্রোমের কারণ এটাই। এই সময় ফ্লুইড থেরাপি শুরু করতে হয়। ফ্লুইড থেরাপি বা স্যালাইন ট্রিটমেন্ট সঠিকভাবে হলে রোগীর ঝুঁকি অনেকটাই কমে যায়।

ডেঙ্গি হেমারেজিক ফিভারের (Dengue Hemorrhagic Fever) কারণও এই অতিরিক্ত প্রদাহ বা সাইটোকাইন স্টর্ম। প্লেটলেট ভাঙতে শুরু করে। রোগীর শরীরের বিভিন্ন ধমনী ও শিরা ফেটে গিয়ে রক্ত ও প্লাজমা বেরিয়ে যেতে শুরু করে। বাইরে থেকে রক্ত দিলেও অনবরত রক্তক্ষরণ হতে থাকে রোগীর। নাক-মুখ, দাঁত, মাড়ি, মলদ্বার, প্রস্রাবের সঙ্গে রক্ত বেরিয়ে আসে। এইজন্য বলা হয়, ডেঙ্গি রোগীর জ্বর কমার পর থেকেই নিয়মিত প্লেটলেট কাউন্ট টেস্ট ও পিএসভি (প্যাকড সেল ভলিউম) টেস্ট করতে হয়। প্লেটলেট যদি ৩০ হাজার বা তার নীচে নেমে যায় তাহলে বাইরে থেকে প্লেটলেট দেওয়ার দরকার পড়ে।
আরও পড়ুন: ডেঙ্গি হলেই প্রচুর জল নয়, নয় প্লেটলেট নিয়ে অহেতুক বিভ্রান্তি, সচেতনতার সঙ্গে চাই সতর্কতাও
ডাক্তারবাবু বলছেন, ডেঙ্গি জ্বর কমতে থাকার তিন-চারদিন পর থেকেই প্লেটলেট বাড়তে থাকে। যদি হেমারেজ হয় বা রক্তক্ষরণ শুরু হয় এবং প্লেটলেট সাঙ্ঘাতিকভাবে কমতে থাকে, তাহলে হাসপাতালে ভর্তি হয় প্লেটলেট দিতে হবে রোগীকে। আর যদি, প্লেটলেট তেমনভাবে না কমে তাহলে বাইরে থেকে দেওয়ার দরকার নেই। সেক্ষেত্রে বাড়িতে থেকেই রোগীর চিকিৎসা হতে পারে। আর যদি তেমন কোনও উপসর্গ দেখা দেয় যেমন--অতিরিক্ত দুর্বলতা, রক্তক্ষরণ, নাড়ির গতি কমে যাওয়া, সবসময় বমি পাওয়া, মাথা ঘোরা, শ্বাসকষ্ট বা রোগী যদি অজ্ঞান হয়ে যায়, তাহলে দেরি না করে হাসপাতালে ভর্তি করতে হবে।
প্লেটলেট ৭০-৮০ হাজার থাকলে বাইরে থেকে দেওয়ার দরকার নেই। ডাক্তারবাবু বলছেন, অনেকেই ভাবেন প্লেটলেট কমে যাওয়া মানেই বিপদ। তা নয়। ডেঙ্গি হলে প্লেটলেট কমেই, আবার তা বেড়েও যায়। যদি রক্তক্ষরণ না হয় এবং প্লেটলেট ৩০ হাজারের নীচে না নেমে যায়, তাহলে দেওয়ার দরকার নেই। অতিরিক্ত প্লেটলেট ক্ষতি করতে পারে।
স্যালাইন ট্রিটমেন্ট জরুরি
পশ্চিমবঙ্গ সরকারের জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ (সিনিয়র পাবলিক হেলথ স্পেশালিস্ট) ডাক্তার সুবর্ণ গোস্বামী বলছেন, ডেঙ্গির ক্ষেত্রে তাই সবচেয়ে বড় চিন্তা হল ডিহাইড্রেশন। লক্ষণ বুঝলেই তাই সঙ্গে সঙ্গে স্যালাইন ট্রিটমেন্ট শুরু করে দেওয়া জরুরি। ডেঙ্গিতে প্লেটলেট কমলেও তা আবার সময়মতো বেড়ে যায়। যদি ডেঙ্গিতে খুব বেশি জটিলতা না হয়, তাহলে জ্বর কমে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই প্লেটলেট বাড়তে শুরু করে। যদি প্লেটলেট ৩০ হাজারে নেমে আসে তখন চিন্তা বাড়ে। এর পর থেকে রোগীর শরীর বুঝে প্লেটলেট দেওয়া শুরু করতে হবে। ১০ হাজার হল ‘ক্রিটিকাল নম্বর’, এই সংখ্যায় প্লেটলেট নেমে এলে তখন চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
আরও পড়ুন: ডেঙ্গি ভাইরাসের প্রকারভেদ নয়, উপসর্গই ঠিক করবে চিকিৎসা পদ্ধতি, সচেতনতাই বলবে শেষ কথা
ডাক্তারবাবু বলছেন, ডেঙ্গি ধরা পড়ার সঙ্গে সঙ্গেই বেশি করে জল বা তরল পানীয় দিতে হবে রোগীকে। প্যাকড সেল ভলিউম (PSV) টেস্ট করা জরুরি। রক্তে লোহিত রক্তকণিকার মাত্রা পরীক্ষা করা হয় এতে। যদি পিএসভি স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি থাকে তখন স্যালাইন দিতে হবে রোগীকে। হাসপাতালে ভর্তি করে চিকিৎসা করা বশি ভাল। দিনে দু’বার করে পিএসভি টেস্ট করে স্যালাইন দিতে হবে। কোষ থেকে যে পরিমাণ জল শুষে নেবে ডেঙ্গি ভাইরাস, সেই ঘাটতি মেটাতে স্যালাইন ট্রিটমেন্টই এক্ষেত্রে আসল। তাছাড়া জ্বর কমাতে প্যারাসিটামল দেওয়া হবে। অন্য জটিলতা না থাকলে এইভাবেই থেরাপি চলবে। খেয়াল রাখতে হবে শরীরে জলের ঘাটতি কতটা হচ্ছে, সেইমত স্যালাইন ট্রিটমেন্ট চলবে। যখন দেখা যাবে রোগ সারতে শুরু করেছে, আবার শরীরে জলের স্বাভাবিক মাত্রা ফিরে আসছে, তখন রোগীকে পরীক্ষা করে স্যালাইন দেওয়া কমিয়ে দিতে হবে বা বন্ধ করতে হবে।
আর ডেঙ্গি হেমারেজিক হয়েছে কিনা তা বোঝা যাবে যখন শরীরের নানা জায়গা থেকে রক্ত বেরোতে থাকবে। মল বা প্রস্রাবের সঙ্গে রক্তপাত হবে, নাক-মুখ দিয়েও রক্ত বেরোতে পারে। ‘হেমারেজিক’-এর অর্থ রক্তপাত। রোগীর শরীরের বিভিন্ন ধমনী ও শিরা ফেটে গিয়ে রক্ত ও প্লাজমা বেরিয়ে যেতে শুরু করে। বাইরে থেকে রক্ত দিলেও অনবরত রক্তক্ষরণ হতে থাকে রোগীর। অবস্থা ক্রমশ জটিল হয়ে ওঠে। ডেঙ্গি হেমারেজিক ফিভার হলে হাসপাতালে ভর্তি ছাড়া গতি নেই।