দ্য ওয়াল ব্যুরো: পুলওয়ামার জঙ্গি হানার ঠিক ১২ দিন পর। ভারতীয় বায়ুসেনার ১২টি মিরাজ-২০০০ বিমান পাকিস্তানের বালাকোটে ঢুকে ধুলিস্যাৎ করে দিয়েছে পাক মদতপুষ্ট জঙ্গি সংগঠনগুলির লঞ্চ প্যাড এবং কন্ট্রোল রুম।
কিন্তু বালাকোটকেই কেন প্রত্যাঘাতের সেন্টার পয়েন্ট করল ভারত?
সেনা সূত্রে জানা গিয়েছে, গত কয়েক দিন ধরে অতি সন্তর্পণে পুলওয়ামার বদলার ব্লুপ্রিন্ট ছকেছে ভারতীয় সেনাবাহিনী। এবং ভারতীয় নিরাপত্তাবাহিনীর কাছে এই খবর ছিল যে, এই সময়েই প্রশিক্ষণ শিবির চলবে জঙ্গি ঘাঁটিগুলিতে। তাই সব দিক বুঝে নিয়েই পাকিস্তান তো দূরের কথা, দেশের কাক পাখিকেও টের পেতে দেয়নি ভারতীয় বায়ুসেনা। রাতের অন্ধকারেই সীমানা পেরিয়ে পাকিস্তানে ঢুকে ১০০০ কেজি-র বোমা বর্ষণ করা হয়। একাধিক জঙ্গি সংগঠনের ঘাঁটি উড়িয়ে দেওয়ার অপারেশনে ১০০ শতাংশ সাফল্য পায় ভারত। উরির সেনা ছাউনিতে জঙ্গিহানার পর সার্জিক্যাল স্ট্রাইক করেছিল ভারত। কিন্তু এটা তার থেকে অনেক বড়। সেটা ছিল নিয়ন্ত্রণ রেখায় প্রত্যাঘাত। আর এ বার পাকিস্তানের এক্কেবারে ভিতরে ঢুকে গিয়ে অপারেশন চালায় বায়ুসেনা। পুলওয়ামা হামলা যেমন ছিল স্বাধীনতার পর ভারতীয় নিরাপত্তাবাহিনীর উপর সব চেয়ে বড় অঘাত, প্রত্যাঘাতও ঠিক ততটাই শক্তিশালী। অনেকের মতে, গত আড়াই দশকে জইশের উপর এত বড় আক্রমণ হয়নি।
গত ১৪ ফেব্রুয়ারি বিকেলে পুলওয়ামায় সিআরপিএফ কনভয়ে হামলার পর ৪০ জন জওয়ানের মৃত্যু হয়। তারপরই ওই হামলার ঘটনার দায় স্বীকার করে জইশ ই মহম্মদ। কিন্তু বালাকোট হচ্ছে সেই জায়গা, যেখানে শুধু জইশ নয়, একাধিক পাক মদতপুষ্ট জঙ্গি সংগঠনের লঞ্চ প্যাড এবং ট্রেনিং সেন্টার রয়েছে। তালিকায় রয়েছে হিজবুল মুজাহিদিন এবং লস্কর ই তৈবার মতো সন্ত্রাসবাদী সংগঠনের রিজিওনাল হেড কোয়ার্টারও।
পাহাড়ের উপর ঘন জঙ্গলে ঘেরা বালাকোটের এই জায়গা ভৌগলিক কারণে জঙ্গি শিবিরগুলির পক্ষে নিরাপদ। তাই সেখানেই সশস্ত্র ট্রেনিং ক্যাম্প চালায় তারা। সেনা সূত্রে জানা গিয়েছে, জইশের বিশেষ শিবিরের জন্য বিভিন্ন প্রান্ত থেকে বিভিন্ন স্তরের জঙ্গি নেতারা গত দু’দিন ধরে সেখানে ছিল। একেবারে পাকা খবর ছিল ভারতীয় নিরাপত্তাবাহিনীর কাছে। তাই সময় নষ্ট না করে, নিয়ন্ত্রণ রেখায় রণ সাজ তৈরি রেখেই রাতের অন্ধকারে পাকিস্তানের দিকে উড়ে যায় ১২টি মিরাজ ২০০০ বিমান। দুটি জায়গা মিলিয়ে মোট সতেরো মিনিটের অপারেশন । জঙ্গি ঘাঁটি মাটিতে মিশিয়ে দিয়ে দেশের সীমানায় ফিরে আসে বায়ুসেনার বিমানগুলি।
জইশ ই মহম্মদের সব থেকে বড় ট্রেনিং ক্যাম্প ছিল বালাকোটে। জানা গিয়েছে, মাদ্রাসা থেকে মিলিটারি ক্যাম্প, সব ছিল এক জায়গায়। ফিদায়েঁ হামলার সমস্ত ট্রেনিং হতো এখানেই। পাকিস্তানের মানসেহরা জেলার বালাকোট থেকেই ছক করা হয়েছিল পাঠানকোট এবং ২০০১ সালের কাশ্মীর বিস্ফোরণের।
পাক অধ্যুষিত কাশ্মীরের খাইবার-পাখতুনখাওয়া প্রদেশের এই অংশেই জইশ ই মহম্মদের শীর্ষ নেতারা মাদ্রাসার ছাত্রদের আত্মঘাতী বিস্ফোরণের ট্রেনিং দিত। একাধিক ট্রাস্টের পয়সায় গত কয়েক বছরে মেডিক্যাল ক্যাম্প, ট্রেনিং সেন্টার তৈরি হয়েছে। প্রতিবছর ১০ হাজার ছাত্র নাম লেখায় জইশের বালাকোট ট্রেনিং সেন্টারে। যার পোশাকি নাম সঈদ ই সঈদ।
২০০১ সালের আগে আফগানিস্তানে ছিল জইশ ই মহম্মদের হেডকোয়ার্টার। সে সময় তালিবানের সঙ্গে এক হয়েই কাজ করত এই সংগঠন। লস্কর ই তৈবার সাম্রাজ্যে ভাগ বসাতেই আফগান মুলুক থেকে পাকিস্তানের বালাকোটে নিজেদের ডেরাকে সরিয়ে আনে জইশ।
২০০৫-এর কাশ্মীরে ভয়াবহ ভূমিকম্পের সময়ই নিজেদের জমি তৈরি শুরু করে জইশ। সেই সময় হাফিজ সঈদ ভারতের ভূখণ্ডে ঢুকে ত্রাণের কাজে উদ্যোগী হয়। কয়েক হাজার মানুষকে উদ্ধার করে নিয়ে যান বালাকোটের ক্যাম্পে। সৌদি আরব থেকে শুরু করে বিভিন্ন দেশের একাধিক সংস্থার প্রচুর টাকা দুর্গত কাশ্মীরিদের জন্য খরচ করে। সেই সময় থেকেই সংগঠন বাড়ানোর কাজ শুরু করে জইশ ই মহম্মদ।
১২ টি মিরাজ বিমান যখন বালাকোটে হামলা চালাচ্ছে, তখন নিয়ন্ত্রণ রেখা বরাবর উড়ান শুরু করে দেয় ভারতীয় সেনা বাহিনীর এয়ারবর্ন আর্লি ওয়ার্নিং এয়ারক্রাফ্ট। তা ছাড়া একটি সি-১৭ গ্লোবমাস্টার ও একটি এন-৩২ বিমানে সেনা জওয়ানও মজুত রাখা হয়েছিল নিয়ন্ত্রণ রেখা বরাবর। দু’টি বিমানে মিলিয়ে ১৯০ কম্যান্ডোকে ‘ব্যাটল রেডি’ রাখা হয়েছিল সম্ভাব্য অপারেশনের জন্য।
পুলওয়ামার রক্ত দেখে ফুঁসছিল দেশবাসী। সাধারণ নাগরিকদের মুড বুঝে নয়াদিল্লিও জানিয়ে দিয়েছিল বদলা হবেই। ঘুম কেড়ে নেওয়া হবে পাকিস্তানের। বৃহস্পতিবার ঘটেছিল পুলওয়ামার জঙ্গি হামলা। রবিবার বিহারের বারাউনিতে গিয়েছিলেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী। সরকারি অনুষ্ঠানের মঞ্চ থেকেই রণংদেহি প্রধানমন্ত্রী বলেছিলেন, “দেশবাসীর মনে কতটা আগুন জ্বলছে আমি বুঝতে পারছি। জেনে রাখুন, যে আগুন আপনাদের বুকে জ্বলছে, আমার বুকেও সেই আগুনই জ্বলছে।”
কিন্তু এখানেই কি শেষ? ইতিমধ্যেই ইসলামাবাদে বসে পাল্টা হুমকি দিয়ে দিয়েছেন পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান। পাকিস্তানের নাগরিকদের উদ্দেশে ক্রিকেটার প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, সব রকম পরিস্থিতির জন্য তৈরি থাকুন। ভারতীয় নিরাপত্তাবাহিনী পরবর্তী রণ কৌশল নিয়ে মুখ না খুললেও অনেকেই বলছেন, বালাকোট অপারেশনের পর ভারতীয় নিরাপত্তা বাহিনী আত্মবিশ্বাসে ফুটছে। এরপর পাকিস্তান যদি ফের কিছু ঘটায়, তাহলে আরও বড় মূল্য চোকাতে হবে তাদের।