
শেষ আপডেট: 18 January 2024 12:40
বাংলায় এখন দু’জন দিদি রয়েছেন। একজন দিদি সর্বজনীন। তিনি শুধু তাঁর পরিবার বা দলের দিদি নন, কেবল বাংলারও দিদি নন, সর্বভারতীয় স্তরেও তাঁর পরিচয় দিদি। আর এক জনের দিদি পরিচিতিটা আরোপিত। রিয়েলিটি শো ‘দিদি নম্বর ওয়ান’-এ তাঁর মুখ পরিচিতি পেয়ে গিয়েছে। তবু অনেকেই তাঁকে সে নামে না ডেকে রচনা বা রচনা বন্দ্যোপাধ্যায় বলেই চেনেন।
এহেন দিদির সঙ্গে দেখা করতে নবান্নে গিয়েছিলেন দিদি নম্বর ওয়ান। এমনিতে এ ধরনের সাক্ষাৎ নিয়ে সব সময়ে যে খুব কৌতূহল থাকে তা নয়। কিন্তু সময়ের গুণে অনেক ছোট ঘটনাই আতস কাচে বড় দেখায়। এখন ভোটের মরশুম। এমনিতেই গোটা ভারত জুড়ে অভিনেতা-অভিনেত্রীদের রাজনীতিতে যোগ দেওয়ার একটা প্রবণতা এখন দেখা যাচ্ছে। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় জমানায় বাংলায় তা রীতিমতো ট্রেন্ডিং হয়ে গিয়েছে। টলি পাড়ার বাছা বাছা সব মুখ জোড়াফুলের নির্বাচিত প্রতিনিধি। দেব, শতাব্দী রায়, নুসরত জাহান, মিমি চক্রবর্তী, সায়ন্তিকা বন্দ্যোপাধ্যায়, সায়নী ঘোষ, জুন মালিয়া, রাজ চক্রবর্তী… তালিকা লম্বা।
তাই রচনা বন্দ্যোপাধ্যায় নবান্নে গিয়ে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে দেখা করতেই স্বাভাবিক কৌতূহল উপচে পড়ছে দলে। বুধবার দুপুরের পর থেকে কারণ খোঁজা শুরু হল। গভীরে যাওয়া হল। তারপর দেখা গেল, ‘বন্দ্যোপাধ্যায় কলিং অন বন্দ্যোপাধ্যায়’ এপিসোডের চিত্রনাট্যকার এবং পরিচালক হলেন আর এক বন্দ্যোপাধ্যায়। তিনি মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ভাই কার্তিক বন্দ্যোপাধ্যায়। রচনাকে দিদির সঙ্গে দেখা করানোর গোটা ব্যাপারটা তাঁর রচনা করা।
এ ব্যাপারে কার্তিক বন্দ্যোপাধ্যায় বাইরে কিছু বলছেন না। কিন্তু টলিপাড়া আর রাজনীতির গল্প ও ঘটনা সব সময়ে সবাইকে বলে কয়ে হয় না। ভিতরের খবর খুঁজলেই জানা যায়। এখানেও ব্যাপারটা তাই।
এখন কৌতূহলের বিষয় রচনা কি লোকসভা ভোটে তৃণমূলের প্রার্থী হবেন?
সে প্রশ্নের একটা আবছা উত্তর পাওয়া যাচ্ছে। তবে তার আগে ছোট করে রচনা-পরিচিতি বাঞ্ছনীয়। তাঁর আসল নাম ঝুমঝুম বন্দ্যোপাধ্যায়। সাউথ সিটি কলেজে পড়াশুনা করেছেন। তার পর ৯৪ সালে মিস ক্যালকাটা হয়েছিলেন রচনা। সেই সময়েই টলিপাড়ার নজরে পড়ে। ‘এতো কান্না এতো নয় গান’ খ্যাত সুখেন দাস তাঁকে ব্রেক দেন। ছবির নাম ছিল দান-প্রতিদান। তার পর টলিউড, ওড়িয়া ছবির পথ ঘুরে রচনা এখন রিয়েলিটি শোয়ের দৌলতে ঢুকে পড়েছেন মা কাকিমার রান্না ঘরে। তিনি দিদি নম্বর ওয়ান করেন, যাঁরা পুরস্কার জেতেন তাঁদের মিক্সার গ্রাইন্ডার, হাতা, খুন্তি, থালাবাসন, ওটিজি, মাইক্রোওভেন দেন, আর একটা টিপিক্যাল কেতায় গোটা শো পরিচালনা করেন।
জানা গিয়েছে, কার্তিক মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে এই কথাটাই বুঝিয়েছেন যে রচনার টিআরপি রয়েছে। ব্যাপারটা মন্দ হবে না। টিআরপি-র ব্যাপারটা মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় নিজেও ভাল বোঝেন। টেলি সম্মান দেওয়ার অনুষ্ঠানে তিনি পটাপট বলে দিতে পারেন, কোন সিরিয়াল এখন পয়লা নম্বরে চলছে, কোন সিরিয়ালে কে কোন চরিত্রে অভিনয় করছে, আর পরের এপিসোডে কী হতে পারে।
সূত্রের দাবি, কার্তিকের মাথায় ঘুরছে কন্টাই। মানে কাঁথি লোকসভা আসন। সেটা দিদিকে বোঝাতে পেরেছেন কিনা, সেটাই হবে কিনা, নবান্নের চোদ্দ তলায় কী আলোচনা হল—সে সবের হদিশ অবশ্য দ্য ওয়াল পায়নি।
তবে এটা জানা গিয়েছে, তৃণমূলের মধ্যে এর একটা বিপরীত স্রোতও রয়েছে। অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় চান না, এই সব অভিনেতা-অভিনেত্রীদের দিয়ে সাংসদ-বিধায়ক পদ বোঝাই করতে। এঁদের প্রতি কোনও অসম্মান না করলেও অভিষেক বাস্তবসম্মত ভাবে মনে করেন, এরা কেউই রাজনীতিতে পূর্ণ সময় দিতে পারেন না। জনপ্রতিনিধির কাজ নিজের নির্বাচন কেন্দ্রের মানুষের সঙ্গে জুড়ে থাকা। তাদের দরকার অদরকারের খোঁজ রাখা। এবং প্রয়োজন হলে তাঁদের সুবিধা পাইয়ে দিতে নিজের সরকারের সঙ্গেও লড়ে যাওয়া। অভিষেক ব্যক্তিগত ভাবে সেটা ডায়মন্ড হারবারের জন্য করেন।
অভিষেকের ঘনিষ্ঠ সূত্রের মতে, তিনি চান না লোকসভা ভোটে আর অভিনেতা-অভিনেত্রীদের টিকিট দেওয়া হোক। বিশেষ করে মিমি চক্রবর্তী বা নুসরত জাহানকে ফের প্রার্থী করায় তাঁর আপত্তি রয়েছে বলে সূত্রের দাবি।
কিন্তু কালীঘাট ঘনিষ্ঠ এক নেতা এই সূত্রের ময়নাতদন্ত করে বলেন, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় যেভাবে দেব-মিমিদের প্রার্থী করেছেন, তা ফলদায়ী হয়েছে। অতীতে কঠিন আসন বাঁকুড়ায় মুনমুন সেনকে প্রার্থী করে দল সফল হয়েছে। একুশে মেদিনীপুরে জুন মালিয়াকে প্রার্থী করে তার ফল পাওয়া গিয়েছে। এটা ঠিক সায়নী বা সায়ন্তিকা জিততে পারেনি, কিন্তু সায়নীর লড়াইয়ের জেদ রয়েছে। তাঁরা দুজনেই এখন অনেকটা সময় রাজনীতিতে দিচ্ছেন। দলের প্রচারেও সময়ে অসময়ে পাওয়া যাচ্ছে এই অভিনেতা-অভিনেত্রীদের। তা ছাড়া এবার লোকসভা ভোটে একটা সমস্যা হল, অন্তত ২৫ থেকে ২৬টি নতুন মুখ দরকার। সেজন্য দলের মধ্যে আগ্রহীর সংখ্যা কম নয়। কিন্তু যোগ্য প্রার্থীকে খুঁজে বের করা চ্যালেঞ্জ। অনেক সময়েই দেখা যায়, বাইরে থেকে একজনকে প্রার্থী করে গোষ্ঠী কোন্দল সামাল দেওয়া যায়। সেজন্যও মুখ দরকার।
দলের ওই নেতার কথায়, কাঁথি লোকসভা আসনে জেতা এবার দলের কাছে বড় চ্যালেঞ্জ। অধিকারীদের পাড়ায় দলের কোনও নেতাকে প্রার্থী না করে টিভি বা সিনেমার কোনও জনপ্রিয় মুখকে প্রার্থী করার এক্সপেরিমেন্ট করা যেতেই পারে। তবে এগুলো কিছুই এখন চূড়ান্ত নয়। বলা যেতে পারে সবই প্রস্তাবের স্তরে রয়েছে। কোথায় কাকে প্রার্থী করা হবে তা একমাত্র মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ই জানেন। আর কেউ নয়।