দ্য ওয়াল ব্যুরো: সার্স-কভ-২ এর মতো আরএনএ ভাইরাসকে নির্মূল করতে হলে যে ধরনের ভ্যাকসিন দরকার সেটা বানানো অত্যন্ত জটিলও সময়সাপেক্ষ প্রক্রিয়া। এই ভাইরাসের প্রতিরোধী ড্রাগ নতুন করে বানাতে গেলেও দীর্ঘ সময় লাগবে। বিশ্বজুড়ে অতিমহামারী যে ভয়ঙ্কর পর্যায়ে পৌঁছেছে, সেখানে নতুনের বদলে পুরনো ওষুধেই বেশি ভরসা করা যেতে পারে। পুরনোকেই তার রাসায়নিক গঠন বদলে নতুন করে সংশ্লেষ করলে তার প্রভাবও তাড়াতাড়ি লক্ষ্য করা যাবে, এমনটাই বলেছেন
ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের কোয়ান্টিটেটিভ বায়োসায়েন্সেস ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক ও সিনিয়র ড্রাগ ইনভেস্টিগেটর নেভান ক্রোগান।
ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ফার্মাসিউটিক্যাল ইউনিট কোয়ান্টিটেটিভ বায়োসায়েন্সসে
(QBI) কোভিড-১৯ সংক্রমণের প্রতিষেধক নিয়ে গবেষণা চলছে। বিজ্ঞানী নেভান জানিয়েছেন, ভ্যাকসিন ও ড্রাগ রিসার্চের বিভিন্ন বিভাগের সঙ্গে যুক্ত গবেষকদের নিয়ে একটি টিম তৈরি করা হয়েছে যার নাম
QCRG। এই টিমের সদস্যরা নতুন ড্রাগের বদলে
মার্কিন ফুড অ্যান্ড ড্রাগ অ্যাডমিনিস্ট্রেশনের (FDA) অনুমোদন পাওয়া অ্যান্টি-ভাইরাল ৬৯টি ওষুধ নিয়ে পরীক্ষানিরীক্ষা চালাচ্ছেন। অধ্যাপক-গবেষক নেভানের কথায়, “৬৯টি ওষুধই সার্স-কভ-২ ভাইরাসকে আটকাতে পারবে। তার মধ্যে গত চার সপ্তাহ ধরে স্ক্রিনিং করে ৪৭টি ওষুধকে চিহ্নিত করা হয়েছে যারা আরএনএ ভাইরাসের প্রোটিনকে ভেঙে দিতে সক্ষম। এই ওষুধের রাসায়নিক গঠনে প্রয়োজনীয় বদল এনে পশুদের শরীরে তার ট্রায়াল করা শুরু হয়েছে। এই ড্রাগ কাজ করলে কোভিড-১৯ শুধু নয় কোভিড-২২ ও কোভিড-২৪”
https://twitter.com/biz/status/1256282371587928069
গত ৩০ এপ্রিল ‘নেচার’ জার্নালে এই গবেষণার রিপোর্ট সামনে আনেন ডক্টর নেভান ক্রোগান ও তাঁর কিউসিআরজি টিম।
কেন বেছে নেওয়া হয়েছে এই ৪৭টি ড্রাগকে? কীভাবে চলছে ট্রায়াল?
নেভান বলেছেন, কোনও ওষুধ ভাইরাস প্রতিরোধী কিনা জানতে হলে আগে দেখে নিতে হবে সেই ওষুধ ভাইরাল প্রোটিনগুলোকে চিহ্নিত করতে পারছে কিনা। মানুষের দেহকোষের রিসেপটর প্রোটিনের সঙ্গে ভাইরাল প্রোটিনের জোট বাঁধার প্রক্রিয়াকে যদি থামিয়ে দিতে পারে কোনও ওষুধ, তাহলেই তাকে অ্যান্টি-ভাইরাল ড্রাগ হিসেবে চিহ্নিত করা যায়। তারজন্য বারংবার ট্রায়াল করে দেখে নিতে হয়।
তিনরকমভাবে ড্রাগের ট্রায়াল চলে।
প্রথমত, এই ট্রায়ালের জন্য দরকার হয় ওষুধ বা রাসায়নিক উপাদান যাকে ভাইরাস প্রতিরোধী বলে চিহ্নিত করা হয়েছে,
দ্বিতীয়ত, সক্রিয় ভাইরাস, তৃতীয়ত, মানুষ বা কোনও পশুর কোষ। এক্ষেত্রে কিউসিআরজি টিম মানুষের কোষের বদলে তারই কাছাকাছি আফ্রিকান গ্রিভেট প্রজাতির বাঁদরের কোষকে বেছে নিয়েছে। মানুষের কোষের মতোই ভাইরাস একইভাবে এই বাঁদরের কোষকেও সংক্রমিত করতে পারে। প্রথমে, কোষকে ভাইরাস দ্বারা সংক্রমিত করা হয়েছে। কোষের ভেতরে ভাইরাল প্রোটিনের বিন্যাস কেমন, কোন কোন রিসেপটর বা বাহক প্রোটিনের সঙ্গে সে জুটি বাঁধছে সেইসব শনাক্ত করেই ওষুধ ইনজেক্ট করা হয়েছে। কন্ট্রোলড ক্নিনিকাল ট্রায়াল করা হয়েছে। অর্থাৎ কিছু কোষে ওষুধ প্রয়োগ করা হয়েছে, অন্যগুলিতে হয়নি। এরপর পরীক্ষা করে দেখা হয়েছে ওষুধের প্রভাবিত কোষগুলিতে ভাইরাস কতগুলি প্রতিলিপি বানিয়ে সংখ্যায় বেড়েছে আর অন্যকোষগুলিতে একইভাবে ভাইরাসের সংখ্যা বা কাউন্ট কত বেড়েছে। পাশাপাশি, ওষুধের কোনও বিষক্রিয়া হচ্ছে কিনা সেটাও নজরে রাখা হয়েছে। দেখআ গেছে এইসব ওষুধ কাজ করছে দু’ভাবে। সেটা কেমন?
ভাইরাল প্রোটিন কীভাবে দেহকোষের প্রোটিনের সঙ্গে জোট বাঁধছে তার ম্যাপ বানিয়েছে কিউসিআরজি টিম
[caption id="attachment_216422" align="aligncenter" width="621"]
কোয়ান্টিটেটিভ বায়োসায়েন্সসের কিউসিআরজি টিম[/caption]
ভাইরাসের প্রতিলিপি তৈরির প্রক্রিয়া নষ্ট করছে যেসব কম্পাউন্ড
নেভান বলছেন, ওষুধ কাজ করতে পারে দু’ভাবে। প্রথমত সরাসরি ভাইরাসকে আক্রমণ করতে পারে, না হলে কোষের প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াতে পারে। দেখা গেছে, ভাইরাস যখন তার প্রতিলিপি বানিয়ে কোষে সংখ্যা বাড়াতে শুরু করে, দেহকোষও ভাইরাল প্রোটিনের মতোই প্রোটিন তৈরি করতে থাকে। একে ট্রান্সলেশন বলে। অ্যান্টি-ভাইরাল ড্রাগ এই ট্রান্সলেশনের প্রক্রিয়াটাকেই থামিয়ে দেয়, অর্থাৎ ভাইরাস আর কোষের মধ্যে সংখ্যায় বাড়তে পারে না। সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ার সম্ভাবনাও কমে।
দ্বিতীয়ত, ভাইরাল প্রোটিনের সঙ্গে দেহকোষের এই বন্ধুত্বটাকে ভেঙে দেয়। ভাইরাস আর দেহকোষের রিসেপটর প্রোটিনকে শনাক্ত করতে পারে না বা তার সঙ্গে জোট বেঁধে কোষে ঢুকতে পারে না। এমন তিনরকমের কম্পাউন্ড পাওয়া গেছে যারা এই কাজ করতে
পারে—টারনাটিন-৪, জোটাটিফিন ও টারনাটিনের মতোই কম্পাউন্ড
পিলিটডেপসিন। এই তিনরকম কম্পাউন্ডের কোভিড-১৯ রোখার ক্ষমতা আছে। এদের নিয়েও ক্লিনিকাল ট্রায়াল চলছে।
ভাইরাসকে বাহক প্রোটিনের সঙ্গে জুড়তে দেয় না যেসব ড্রাগ বা কম্পাউন্ড
সাতরকমের ড্রাগ বা কম্পাউন্ড শনাক্ত করা গেছে যারা সার্স-কভ-২ এর স্পাইক প্রোটিনকে দেহকোষের রিসেপটর প্রোটিনের সঙ্গে জোট বাঁধতে দেয় না। এদের মধ্যে রয়েছে
দুটো অ্যান্টিসাইকোটিকস, হ্যালোপেরিডল ও মেলপারোন। এরা স্কিৎজোফ্রিনিয়া রোগের প্রতিষেধক হিসেবেও কাজ করে। তাছাড়া, অ্যান্টিহিস্টামিনস যেমন
ক্লেম্যাস্টিন ও ক্লোপেরাস্টিনেরও অ্যান্টি-ভাইরাল ক্ষমতা রয়েছে।
পিবি২৮ কম্পাউন্ড ও
স্ত্রী যৌন হরমোন প্রোজেস্টেরন নিয়েও গবেষণা চলছে। এরা সকলেই কোভিড-১৯ সংক্রমণের প্রতিষেধক হয়ে উঠতে পারে।