
শেষ আপডেট: 20 January 2019 15:52
বলাই বাহুল্য, শোভা আর শোভা নেই। আতঙ্ক আর হাহাকারের মিশেলে সে যেন ভয়ের এক প্রতিমূর্তি হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। উদ্ধত লাল দেওয়াল জুড়ে কালো কালো ছোপ। সব কিছুর ওপর দিয়ে 'ট্রেডার্স অ্যাসেম্ব্লি' লেখাটা অবশ্য স্পষ্ট হয়ে রয়েছে।
শনিবার মধ্যরাতে গড়িয়াহাট মোড়ে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের পরের দিন, রবিবার দুপুরের ছবিটা খানিকটা এরকমই।
দেখুন লাইভ ভিডিও।
https://www.facebook.com/TheWallNews/videos/2266782386678704/
রাস্তায় দাঁড়িয়ে থাকা ব্যবসায়ীদের ভিড়ের মধ্যে থেকে নানা রকম গুঞ্জন উঠছে থেকে থেকেই। বড় দোকানীরা, অর্থাৎ যাঁদের ওই ট্রেডার্স অ্যাসেম্বলি বিল্ডিংয়েই দোকান, তাঁরা বলছেন, কয়েক কোটি টাকার ক্ষতি হয়ে গেল। কিন্তু কী ভাবে লাগল আগুন? দোকানদারদের অভিযোগের আঙুল ফুটপাথে বসা হকারদের দিকে। তাঁদের দাবি, ওই সব ছোট স্টলে ইলেকট্রিক তার থেকে বাল্ব লাগানো হয়, সেটা খুলে ওই অবস্থায় চলে যান ব্যবসায়ীরা। কোনও খোলা তার থেকেই হয়তো ঘটেছে দুর্ঘটনা।
তবে ফুটপাথে ব্যবসা করা ছোট ব্যবসায়ীদের তীব্র ক্ষোভ ট্রেডার্স অ্যাসেম্বলি বিল্ডিংয়ের কর্তৃপক্ষের উপর। তাঁদের অভিযোগ, একাধিক জেনারেটর চলে ওই বিল্ডিংয়ে। মজুত থাকে ডিজেল। এর আগেও অনেক বার ওই বিল্ডিংয়ে শর্ট সার্কিট হয়েছে বলে দাবি তাঁদের। গত কাল রাতেও সে রকম কিছু হওয়ার কারণেই আগুনের ফুলকি ছিটকে আসে বলে মনে করছেন তাঁরা। সেই ফুলকি তেলে পড়তেই ঘটে বিপত্তি।
আবার ফুটপাথবাসীদের একাংশ বলছেন, গত কাল রাতে কিছু মুটে সম্প্রদায়ের মানুষ ফুটপাথ ঘেঁষে আগুন পোহাচ্ছিলেন। তাঁরা সেই আগুন ভাল করে না নিভিয়েই চলে যান, যা থেকে গভীর রাতে বিপত্তি ঘটে। কারও কারও বক্তব্য মোড়ের ট্রান্সফর্মারটিতে হঠাৎ শর্ট সার্কিট হওয়ার কারণেই আগুন লেগেছে।
ঠিক কী হয়েছে, তা এখনও স্পষ্ট নয় দমকলের কাছেও। কয়েকটি দোকানে অগ্নি নির্বাপক ব্যবস্থা ছিল বলে দোকানদাররা দাবি করলেও, বলাই বাহুল্য, মধ্যরাতে বন্ধ দোকানের ভিতরে তা কাজ করেনি।
অন্য দিকে ডাঁই হয়ে পড়ে রয়েছে আধপোড়া জামাকাপড়ের স্তূপ। সেখানে হাতড়াচ্ছে কিছু ফুটপাথবাসী বাচ্চা। যদি দুয়েক পিস আস্ত মেলে! মিলছেও। চার দিকে ধ্বংসের আবহে ঝিকমিক করে উঠছে খুদে চোখ। গেঞ্জি-প্যান্ট যা মিলছে, প্যাকেট বন্দি করে নিচ্ছে তারা।
বড় দোকানদারদের বেশির ভাগেরই বিমা করা আছে দোকানের। তাঁরা হয়তো অনেকটাই ক্ষতিপূরণ পেয়ে যাবেন। কিন্তু ফুটপাথের ব্যবসায়ীরা পড়েছেন বড়সড় বিপদে। বিয়ের মরসুমে প্রভূত পরিমাণে জিনিসপত্র মজুত করেছিলেন তাঁরা। শুধু দোকানে নয়, গুদামেও। এবং গুদামগুলি ছিল ওই বিল্ডিংয়ের ভিতরেই। ফলে সর্বস্ব হারিয়ে এক রকম মাথায় হাত তাঁদের।
তবে এই বিপর্যয়ে চিরতরে বাসাহারা হল যারা, তাদের কথা সম্ভবত কেউ মনে রাখবে না। ক্ষতিপূরণের ব্যবস্থাও নেই তাদের জন্য। তারা হল ওই বিশাল বিল্ডিংয়ের আনাচকানাচে বাসা বাঁধা পায়রার দল। ধ্বংসস্তূপের উপরে অসহায় ভাবে ঘুরপাক খাচ্ছে তারা। পুড়ে যাওয়া ঘুলঘুলিতে আর ফেরা হবে না তাদের।
আর আছেন তাঁরা। যাঁরা শত বিপর্যয়েও অবিচল। তাঁরা গড়িয়াহাট ফ্লাইওভারের নীচে আসর জমানো 'শতরঞ্জ কি খিলাড়ি'রা। বিপর্যয়স্থলের কয়েক মিটারের মধ্যেই দাবার বোর্ড সাজিয়ে মগ্ন তাঁরা। গড়িয়াহাট মোড়ের ফ্লাইওভারের নীচের দাবা খেলার ইতিহাস নতুন নয়। কত নামহীন, হয়তো ঠিকানাহীন মানুষই যে বুঁদ হয়ে থাকে একটি চাল দেওয়ার জন্য, তার হিসেব নেই। তাঁদের জন্য তৈরি হয়েছে গড়িয়াহাট চেস ক্লাবও।
সত্যজিৎ রায়ের 'শতরঞ্জ কি খিলাড়ি' সিনেমায় যেমন মির্জা সাজ্জাদ আলি (সঞ্জীব কুমার) এবং মীর রোশন আলি (সৈয়দ জ়াফরি) ব্যক্তিগত জীবন থেকে শুরু করে রাজ্যপাট পর্যন্ত খুইয়ে ফেলার মুখেও দাবার বোর্ড থেকে মুখ তোলেননি, গড়িয়াহাট চেস কর্নারের সদস্যরাও যেন তাই-ই।
এ দৃশ্য যেমন এক দিকে ছন্দে ফেরার কথা মনে করায়, তেমনই মনে করায় রোম সাম্রাজ্যের পতনের ইতিহাসও। সময় বলে দেবে, গড়িয়াহাটের ভবিষ্যৎ কোন দিকে।