
Amul Girl / Amul Mascot
শেষ আপডেট: 14 March 2024 00:40
দ্য ওয়াল ব্যুরো: বয়স কতই বা হবে? মাত্র তিন কি চার! কিন্তু এতেই দেশের তাবড় ব্যাপারে মাখনের মত মন্তব্য করতে পারে সে (Amul Girl)!
কখনও ক্রিকেটে ভারতের জয়। কখনও জ্যাভেলিনে ভারতের অলিম্পিক সোনা। কখনও বিশ্বকাপে আর্জেন্তিনার জয়। বা কখনও রাজনীতিতে মোদী-মমতা-রাহুল। বিভিন্ন ব্যাপারে মাখন-ঘি-বিস্কুট দিয়ে সুন্দর, মজাদার মন্তব্য করতে তার জুড়ি নেই। নীল রঙের চুল, তাতে ছোট্ট রিবন, পরনে সাদার ওপর লাল গোল গোল ডিজাইন করা ফ্রক। আমূলের মাখন কিনলেই, যাকে সবার আগে আমাদের নজরে পড়ে!

অফিসিয়াল কোন নাম নেই। ফলে আমরা তার নাম দিয়েছি 'আমূল গার্ল'। আমরা অনেকেই জানি না, তার বয়স আসলে প্রায় ষাট বছর! এতদিন ধরে সে রয়েছে একইরকম, সেই ছোট্ট, তিন-চার বছরের বাচ্চা মেয়ে। কার্যত আমাদের সবার প্রিয়পাত্র হয়ে।

বয়সে মাত্র তিন চার বছরের হলেও, তার জন্ম ১৯৬৬ সালে ।
প্রায় ৫৭ বছর পেরিয়ে গেছে। আজও আমূলের বিভিন্ন প্রোডাক্টের মতই জনপ্রিয় রয়ে গিয়েছে এই বাচ্চা মেয়ে। ম্যাকডোনাল্ডের রোনাল্ড। কেএফসির কর্নেল স্যান্ডার্স। ওয়াল্ট ডিজনির মিকি মাউস। ভারতীয় রেলের ভোলু। ভোডাফোনের জুজু বা হাচের সেই বিখ্যাত পাগ। জনপ্রিয়তায় তাদের কারোর চাইতে কম নয় আমূলের এই বিখ্যাত 'ম্যাসকট' বা 'প্রতীক' আমূল গার্ল।
সমবায় মাধ্যমে ব্যবসার এক অন্যতম নজির গড়ে ফেলেছেন ডক্টর ভার্গিস কুরিয়েন (Verghese Kurien)। গুজরাতের আমেদাবাদ থেকে প্রায় ১০০ কিলোমিটার দূরে, আনন্দ (Anand) জেলায় গোয়ালাদের সমবেত করে তৈরি হয়েছে এক সমবায়। যাতে অনুপ্রেরণা জুগিয়েছেন খোদ বল্লভভাই প্যাটেল।
খাপছাড়া ভাবে দুধ সংগ্রহ না করে সমস্ত সংগ্রহকে এক ছাতার তলায় নিয়ে এসে এক ব্যাপক কর্মকাণ্ডের নেতৃত্ব দিচ্ছে ত্রিভুবনদাস প্যাটেল ও ভার্গিস কুরিয়েন। সদ্য স্বাধীন হয়েছে ভারত, ১৯৪৯ সালের কথা। সেই কর্মকাণ্ডই পরে এক নতুন ইতিহাস তৈরি করে, নাম হয় 'আমূল'। সমবায় মাধ্যমে, গ্রামের গরিব বা মধ্যবিত্ত চাষি, গোয়ালাদের একত্র করে যে এত বড়, বাণিজ্যসফল 'ব্র্যান্ড' তৈরি করা যেতে পারে, এ' নজির আগেও নেই, পরেও এখনও অবধি নেই।
১৯৬৬ সালে, আমূল যখন প্রায় পোক্ত জমিতে দাঁড়িয়ে গিয়েছে, তখন ভার্গিস কুরিয়েন তার প্রচার ও প্রসারের জন্য 'আইকনিক' কোনও মুখ বা ম্যাসকট খুঁজতে থাকেন। দায়িত্ব দেওয়া হয় মুম্বইয়ের এক পেশাদারি বিজ্ঞাপন সংস্থা 'দা কুনহা কমিউনিকেশনস'-কে। মালিকের নাম সিলভেস্টার দা কুনহা। তখন কাগজে বা টিভিতে বিজ্ঞাপন দেওয়া এত সোজা ছিল না। খরচটাও ভাবতে হত। ফলে রাস্তার ধারে বড় বড় সাইনবোর্ড বা বিলবোর্ডেই কীভাবে চমকদার বিজ্ঞাপন দেওয়া যায়, ভাবছিলেন ডক্টর কুরিয়েন।

এই বিলবোর্ডের মুখ হিসেবেই প্রথম দিনের আলো দেখে আমূলের ছোট্ট মেয়ে। এঁকেছিলেন দা কুনহার সংস্থার শিল্প নির্দেশক ইউস্টেস ফার্নান্দেজ। তলায় একটা 'ক্যাচলাইন' ভেবে দেন দা কুনহার স্ত্রী নিশা— ‘আটারলি বাটারলি ডিলিশিয়াস’ ('Utterly Butterly Delicious)।
প্রথম বিজ্ঞাপন থেকেই আমূলের বাচ্চা মেয়ে কার্যত 'সুপারহিট'। প্রথম দিকে বেশি জায়গায় বিজ্ঞাপন দেওয়ার পরিকল্পনা ছিল না। কিন্তু জনসাধারণের দিব্যি পছন্দ হচ্ছে দেখে ক্রমশ সেই মেয়েটির ছবিই এবার ছড়িয়ে পড়তে থাকে শহর থেকে শহরে। পেরিয়ে যায় পাঁচ দশক। জরুরি অবস্থা, ভারত-পাক যুদ্ধ, জনতা সরকার, ইন্দিরা গান্ধীর হত্যা, রাজীব গান্ধীর হত্যা, নয়ের দশক, শ্রীলঙ্কা থেকে ভারতের পরমাণু যাত্রা!

এত ঘটনাবহুল ইতিহাসকে হাতছাড়া করতে চাননি আমূলের বিজ্ঞাপন-মস্তিষ্করা। তাঁরা বুঝেছিলেন, শুধুমাত্র মাখন-বিস্কুট-পনিরের বিজ্ঞাপন করে বেশিদিন চলবে না। তখন অবশ্য এত 'প্রোডাক্ট'-ও আসেনি। ফলে প্রাসঙ্গিকতায় টিকে থাকতে নানা সামাজিক-রাজনৈতিক ঘটনা নিয়ে মজাদার লাইন লিখতে শুরু করে আমূল। বা, বলতে থাকে, আমূলের বাচ্চা মেয়ে।
এখন অবশ্য আমূলের চকোলেট, হেলথ ড্রিঙ্ক, কেক, আইসক্রিম অনেক কিছু এসে গেছে। কিন্তু সামাজিক-রাজনৈতিক থেকে খেলাধুলো, সিনেমা ইত্যাদি সবকিছু নিয়েই আমূলের বাচ্চা মেয়ের টিপ্পনি প্রায়ই খবরের কাগজ খুললেই দেখা যায়।

বর্তমানে সিলভেস্টার দা কুনহার ছেলে রাহুল এজেন্সি চালান। কপিরাইটার মনীশ জাভেরি ও ছবি-শিল্পী জয়ন্ত রানের সঙ্গে রাহুলই প্রতিদিন নানা ইস্যু বার করেন, তৈরি হয় নানা মজাদার ক্যাপশন। যতটা সম্ভব খোলামেলাভাবে ভাবা হয় ক্যাপশন। ট্রাম্পের নির্বাচন জয় থেকে উইম্বলডন, অলিম্পিক থেকে দীপিকা-রণবীরের বিয়ে, তাঁদের ভাবনায় ঢুকে যায় সবকিছুই। তারপর মজাদার নানা লাইনের সঙ্গে মিলিয়ে বসানো হয় আমূলের বাচ্চা মেয়েটির মুখে।
প্রায় ৫৭ বছর পেরিয়ে গেছে। আজও আমূলের বিভিন্ন প্রোডাক্টের মতই জনপ্রিয় রয়ে গিয়েছে এই বাচ্চা মেয়ে। তার আর বয়স বাড়েনি। রয়ে গিয়েছে গ্রাহকদের ভালবাসায়।