প্রত্যক্ষদর্শী (নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক)
আজ সকালে খবরের কাগজটা খুলতেই চোখের সামনে ভেসে উঠল গতকালের ঘটনা। সামনে থেকে যা দেখেছি সেই অভিজ্ঞতা বড়ই মর্মান্তিক। বাড়িতে ফিরেও বহুক্ষণ সেই ট্রমার মধ্যে ছিলাম।
মঙ্গলবার বিকেল আন্দাজ পাঁচটা হবে। অফিস থেকে বাড়ি ফিরছি। সহকর্মীও রয়েছেন সঙ্গে। কলকাতা থেকে হাওড়াগামী লঞ্চে রোজই এ সময় ঠাসাঠাসি ভিড়। গতকাল ঠাণ্ডাও ছিল বেশ ভালোই। গঙ্গার হাওয়ায় বেশ কাঁপুনি ধরছিল। স্ট্র্যান্ড রোডের শিপিং জেটি থেকে লঞ্চে উঠেছিল ওরা। অল্পবয়সী দুই তরুণ-তরুণী। বয়স ছাব্বিশ-সাতাশের আশপাশে। আমার ঠিক পাশটিতে এসেই বসল। আর পাঁচজনের মতো ওদের যে আলাদা করে খেয়াল করেছিলাম তা নয়, তবে এক মুহূর্তের জন্য দু’জনকে দেখেছিলাম। যুবকের মুখ কিঞ্চিৎ গম্ভীর। মেয়েটি চিন্তামগ্ন। চাপা স্বরে কথা বলছিল। মনে হচ্ছিল কোনও ব্যাপারে চিন্তায় রয়েছে দু’জনেই। যাই হোক, ওদের কথা না শুনে সহকর্মীর সঙ্গে ফের গল্পে মশগুল হয়ে গেলাম।
কতটা সময় কেটেছিল খেয়াল নেই। একসময় দেখলাম যুগল লঞ্চের একদম ধারটিতে গিয়ে দাঁড়িয়েছে। যেখান দিয়ে যাত্রী ওঠা-নামার জায়গা, তার কাছেই রেলিংয়ে ঠেস দিয়ে দাঁড়িয়ে রয়েছে দু’জনে। একে অপরের হাত ধরা। পরস্পরের দিকে তাকিয়ে কথা বলছে। মাঝে হয়তো একটা পলক ফেলার অপেক্ষা। যা দেখলাম হাড় হিম হয়ে গেল। হাত ধরেই জলে ঝাঁপ দিল দু’জনে। একটা ঝুপ শব্দ, আর আমার শিরদাঁড়া বেয়ে যেন বরফের স্রোত বয়ে গেল।
সত্যিই ঝাঁপ দিল কি? না, আমার চোখের ভুল। চারদিকে চেঁচেমেচি, হইহট্ট গোলের মধ্যে সম্বিৎ ফিরলে দেখি আমার সহকর্মীও কখন সিট থেকে উঠে জলে ঝুঁকে কী যেন দেখছেন। পাশাপাশি, অন্য যাত্রীরাও সে ভাবে রেলিং থেকে ঝুঁকে রয়েছেন। অনেক মহিলা আতঙ্কে চেঁচামেচি করছেন। পাশ থেকে কে যেন বলে উঠল, ‘‘গেল, গেল। দু’জনেই তলিয়ে গেল।’’
কয়েকজন যাত্রীকে দেখলাম সিটের উপর ওদের ব্যাগ হাতড়াতে। আমিও এগিয়ে গেলাম। ব্যাগ খুঁজে একটা মোবাইল পাওয়া গেল। আরও কিছু কাগজপত্রের সঙ্গে একটা প্রেসক্রিপশনও ছিল। প্রেসক্রিপশনটা আমি তুলে নিলাম। খুলেই দেখলাম উপরে নাম লেখা রয়েছে সুজাতা ভাদুড়ি। আর কিছু দেখিনি। পরে জেনেছি, ওই তরুণীর নামই সুজাতা। তার ব্রেন ক্যানসার ছিল। কেমোথেরাপি চলছিল। তার মানে কি, এই রোগের কারণেই আত্মহত্যা? ছেলেটিও কি এই কারণেই নিজের জীবন শেষ করে দিল? অনেকগুলো প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে, সব গুলিয়ে যাচ্ছে মাথার মধ্যে। উঃ! আর ভাবতে পারছি না। দৃশ্যটা ভুলতে চাই। ব্যাগ থেকে পাওয়া মোবাইলের কল লিস্ট ঘেঁটে একজন ফোন করে তরুণের বাবার সঙ্গে কথা বলল। শুনলাম ওনার নাম ওমপ্রকাশ সাউ। মল্লিকবাজারের বাসিন্দা।
বিশ্বাস হচ্ছিল না। কয়েক সেকেন্ড আগে যাদের চোখের সামনে দেখেছি, এখন তারা নেই। সন্ধের অন্ধকার নেমে এসেছে। মাঝ গঙ্গায় এই সময় ওদের খুঁজে পাওয়া একরকম দুঃসাধ্য ব্যাপার। কী করবো কিছুই বুঝে উঠতে পারছিলাম না। আমি সাঁতার জানতাম, কিন্তু ওই মুহূর্তে জলে ঝাঁপ দিয়ে ওদের খোঁজার সাহস ছিল না। যা দেখেছি তাতে ভয় আর আতঙ্কে হাত, পা কাঁপছিল। স্নায়ু অবশ। কতক্ষণ ট্রমার মধ্যে ছিলাম জানি না। পরে শুনেছি রাত অবধি ডুবুরি নামিয়ে পুলিশ ওদের খুঁজেছে, তবে খোঁজ মেলেনি।