
বল হাতে দৌড়চ্ছেন সুশীলা মিনা
শেষ আপডেট: 4 March 2025 18:32
দ্য ওয়াল ব্যুরো: কে বলেছে, সব স্বপ্ন সত্যি হয় না? দেখার মতো চোখটাও তো থাকতে হবে। মাত্র এক বছর আগের কথা। সুশীলা মিনা স্বপ্নেও কল্পনা করতে পারেনি যে একদিন সচিন তেন্ডুলকর এবং রাজ্যবর্ধন রাঠোরের সঙ্গে খেলার সুযোগ সে পাবে। কিন্তু কোন স্বপ্ন যে কখন সত্যি হয়ে যায়, সেকথা কেই বা আর বলতে পারে?
বয়স মাত্র ১০ বছর। কিন্তু, ইতিমধ্যে মিনা জনপ্রিয়তার শীর্ষে উঠে এসেছে। আসলে, ভারতীয় ক্রিকেট দলের ব্যাটিং মায়েস্ট্রো সচিন তেন্ডুলকর সম্প্রতি একটি ভিডিও শেয়ার করেছিলেন। তারপর থেকে এই অগ্নিকন্যার বোলিং অ্যাকশন সোশ্যাল মিডিয়ায় ভাইরাল হতে শুরু করে। অনেকে তো আবার এই অ্যাকশনকে টিম ইন্ডিয়ার প্রাক্তন মিডিয়াম পেসার জাহির খানের সঙ্গে তুলনা করতে শুরু করেছেন। প্রসঙ্গত, ২০১১ আইসিসি ক্রিকেট বিশ্বকাপে ভারতের জয়ের পিছনে জাহিরের অবদান ছিল অনস্বীকার্য।
View this post on Instagram
তবে সুশীলার লড়াই এই একটা ইনস্টা পোস্টেই সীমাবদ্ধ নয়। এই লড়াইটা অনেক বড়। এটা জীবনের লড়াই। প্রতিদিন বেঁচে থাকার লড়াই। রাজস্থানের অনামী গ্রাম প্রতাপগড়। এই গ্রামের নাম শোনা তো অনেক দুরের কথা, এমন কোনও জায়গারও যে অস্তিত্ব আমাদের দেশে রয়েছে, সেটাই অনেকে জানতেন না। যাইহোক, এই 'অনামী' গ্রামেই প্রতিদিন নুন আনতে পান্তা ফুরোয় সুশীলার পরিবারের। কিন্তু, নিজের জেদ এবং স্বপ্ন দেখার অভ্যেসটা কখনই হাতছাড়া করেনি সে। তবে কোচ ঈশ্বরলাল মিনার সাহায্য ছাড়া এই কঠিন পথে কোনওদিন হাঁটতে পারত না সুশীলা।
প্রতাপগড়ের রাজকীয় প্রাথমিক বিদ্যালয়ে কোচিং করান ঈশ্বরলাল। তিনিই প্রথম সুশীলার মধ্যে প্রতিভার স্ফুলিঙ্গ দেখতে পেয়েছিলেন। সময়টা ছিল ২০১৭ সাল। একদিকে মহিলা ক্রিকেট বিশ্বকাপ নিয়ে যখন গোটা দেশ মাতামাতি করছে, অন্যদিকে সকলের অলক্ষ্যে শুরু হয় সুশীলার প্রস্তুতি। ঈশ্বরলাল স্থানীয় বেশ কয়েকটা বিদ্যালয়ের মেয়েদের ক্রিকেট খেলার কোচিং দিতেন। লক্ষ্য কোনও স্থানীয় প্রতিযোগিতা নয়, বরং মেয়েরা যাতে নিয়মিত খেলার লোভে স্কুলে আসে এবং মহিলা ক্রিকেটের উন্নয়ন সম্ভব হয়। স্বপ্নটা বেশ বড় হলেও, স্বপ্নপূরণের হৃদয়টা আরও বড়।
গত এক দশকে ভারতে মহিলা ক্রিকেটের উন্নতি যথেষ্ট নজরে এসেছে। পাশাপাশি গোটা দেশজুড়ে মহিলা ক্রিকেটারদের জনপ্রিয়তাও বাড়তে সমানুপাতিক হারে। ২০১৭ আইসিসি মহিলা ক্রিকেট বিশ্বকাপে টিম ইন্ডিয়ার নজরকাড়া পারফরম্য়ান্সের পর এই জনপ্রিয়তা কার্যত রকেট গতিতে এগোতে শুরু করেছে। মিতালি রাজ, ঝুলন গোস্বামী, স্মৃতি মান্ধানা এবং হরমনপ্রীত কাউরের মতো নামগুলো আজ সকলের মুখে মুখে ঘুরতে শুরু করেছে। এই নামগুলোই তো আজকের মহিলা ক্রিকেটারদের সামনে এগিয়ে চলার পথে আলো দেখাচ্ছে। এর পাশাপাশি মহিলা প্রিমিয়ার লিগ সেই ছাইচাপা আগুনেই কার্যত একরাশ অক্সিজেন এনে দিয়েছে। পাশাপাশি ২০২৩ সালে BCCI-এর একটা সিদ্ধান্ত বদলে দিয়েছে যাবতীয় দৃষ্টিভঙ্গি। বোর্ডের পক্ষ থেকে স্পষ্ট জানিয়ে দেওয়া হয়েছে, পুরুষ ক্রিকেটারদের সমান মহিলা ক্রিকেটারদেরও টাকা দেওয়া হবে। সেকারণে দেশের ছোট ছোট মেয়েরা আরও বেশি করে এই খেলায় ঝোঁক বাড়াচ্ছে।
একেবারে প্রাথমিক পর্বে মিনা ইউটিউব এবং সোশ্যাল মিডিয়া দেখেই ক্রিকেট খেলা শুরু করেছিল। প্রথমদিকে সে ব্যাটার হতে চেয়েছিল। কিন্তু, যত দিন গড়িয়েছে বল করার প্রতি তাঁর অমোঘ দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে। আগুন গতিতে ছারখার করতে চেয়েছে সামনের যাবতীয় প্রতিবন্ধকতা।
এরপর সুশীলার ক্রিকেট জীবনে ঈশ্বরলালের আবির্ভাব। সুশীলার কাছে তিনিই যে স্বয়ং 'ঈশ্বর', তা বলতে কোনও বাধা নেই। ঈশ্বরলালের তত্ত্বাবধানেই নিজের টেকনিক আরও ধারাল করে এই ছোট্ট মেয়েটি। ঈশ্বরলাল জানিয়েছেন, '৩-৪ মাসেই সুশীলার বোলিং স্কিল একেবারে নিখুঁত হয়ে ওঠে। আমার মনে আছে, গত বছর একবার মনে হয়েছিল যে ও হয়ত আর বল করতে পারবে না। কিন্তু, তারপরই ওর মধ্যে চোখে পড়ার মতো উন্নতি দেখতে পেয়েছি।'
সম্প্রতি জয়পুরে একটি প্রীতি ম্য়াচ আয়োজন করা হয়েছিল। সেখানে রাজস্থান সরকারের যুবকল্যাণ মন্ত্রী রাজ্যবর্ধন সিং রাঠোর উপস্থিত ছিলেন। তিনি তো সুশীলার বোলিং দেখে এককথায় মুগ্ধ হয়ে যান। এমনকী, সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্ম এক্স-য়ে (আগেকার নাম টুইটার) তিনি ভরপুর প্রশংসা করেন।
সুশীলা একেবারে নিম্ন মধ্যবিত্ত একটি পরিবার থেকে উঠে এসেছে। তার বাবা শ্রমিকের কাজ করেন। আর মা গৃহবধূ। প্রতাপগড়ের যে দরিদ্র শ্রমিকরা কাজের খোঁজে অহমেদাবাদ গিয়ে বসবাস করে, সেই তালিকায় সুশীলার বাবাও রয়েছেন। সুতরাং সুশীলার সামনে সুযোগ যে কতটা কম, সেটা আর আলাদা করে বলার দরকার নেই। কিন্তু, উইকেট শিকারের খিদেটাই যাবতীয় জঙ্গল সাফ করে রাজপথ নির্মাণ করছে।
সম্প্রতি রাজস্থান ক্রিকেট অ্যাসোসিয়েশন সুশীলাকে একটি স্কলারশিপ দিয়েছে। পাশাপাশি জয়পুরের একটি ক্রিকেট অ্যাকাডেমিতে গিয়ে সে অনুশীলন করে। আগামীদিনে সে ভারতের হয়ে খেলতে চায়। দেশের নাম আরও উজ্জ্বল করতে চায়। তাই তো সে বলেছে, 'আমি আরও ক্রিকেট খেলতে চাই।'