
শেষ আপডেট: 19 April 2023 11:36

সিদ্ধার্থনাথ সিং (Sidharth Nath Singh) হলেন প্রয়াত প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী লালবাহাদুর শাস্ত্রীর নাতি। এলাহাবাদের খানদানি পরিবার। সেদিনটা ছিল ২০১৫ সালের ২৬ জানুয়ারি। সস্ত্রীক মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা অতিথি হয়ে এসেছেন। রাইসিনা পাহাড়ে (Raisina Hill) রাষ্ট্রপতি ভবনের পিছনের লনে বিকেল ৫ টায় হাই-টির আয়োজন করা হয়েছে। মন্ত্রী, আমলা, কূটনীতিকদের সঙ্গে কিছু সাংবাদিকও আমন্ত্রণ পেয়েছেন। সিদ্ধার্থের সঙ্গে দেখা হল সেখানেই। তখন সর্বভারতীয় বিজেপির বাংলার ভারপ্রাপ্ত নেতা সিদ্ধার্থ। অফ হোয়াইট কুর্তা পাজামার সঙ্গে সিদ্ধার্থ গায়ে চড়িয়েছিলেন একটা পশমিনা।
ঠিক এমনই সময়ে অনতিদূরে ঝাউ গাছের পাশের সরু পথ দিয়ে আসতে দেখা গেল মুকুল রায়কে (Mukul Roy)। সোজা এসে দাঁড়ালেন সিদ্ধার্থের পাশে (Mukul Roy and Siddhartha Nath Singh Meeting)। তারপর সিদ্ধার্থ ও মুকুল রায়কে একটু তফাতে আলাদা করে নিয়ে গেলেন এক ভদ্রলোক। সেই ভদ্রলোক বাংলার এক প্রবীণ কংগ্রস নেতার ছেলে। দিল্লির ক্ষমতার বৃত্তে অনেকে তাঁকে ফড়ে বলেন।
সময়টা ভাবুন। চোদ্দো সালের লোকসভা ভোটে বাংলায় ২ টো আসনে জিতেছিল বিজেপি। আবার ঠিক সেই সময়েই চিটফান্ড কেলেঙ্কারি নিয়ে সিবিআই তদন্তের নির্দেশ দিয়েছে সুপ্রিম কোর্ট। তার পর ধর্মতলায় মঞ্চ বেঁধে চিৎকার করে এই সিদ্ধার্থনাথ সিংই বলেছেন, ভাগ মুকুল ভাগ!
ধর্মতলায় ওই সভার কয়েক মাসের মধ্যেই দেখা যায় মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে মুকুল রায় কিছুটা আড়ো আড়ো ছাড়ো ছাড়ো। আর তার পরই রাষ্ট্রপতি ভবনের লনে এই সাক্ষাৎ।
মুকুল রায় এমনই আনপ্রেডিক্টেবল (Mukul Roy is Unpredictable)। আসলে সিদ্ধার্থনাথ সিং দিল্লি বিজেপিতে বরাবরই ছিলেন অরুণ জেটলির শিষ্য, তাঁর স্নেহধন্য। আবার মুকুল রায় রাজ্যসভার সদস্য থাকার সময় থেকেই জেটলির সঙ্গে ভাল বন্ধুত্ব ছিল। দিদির সেকেন্ড ইন কমান্ডের জনসংযোগ ক্ষমতা বরাবরই ছিল অতুলনীয়।
সে যাত্রায় অবশ্য মুকুল রায় বিজেপিতে যাননি। কেউ কেউ দাবি করেন, ২০১৬ সালের ভোটে যখন বাম-কংগ্রেসের জোট হয়েছিল বাংলায়, তখন অরুণ জেটলির পরামর্শেই দিদির আশ্রয়ে স্বমহিমায় ফিরেছিলেন মুকুল। কারণ, জেটলিরা মনে করেছিলেন, বাম-কংগ্রেস শক্তি বাড়ানো বিজেপির জন্য ভাল লক্ষণ নয়। তাই ষোলো সালের বিধানসভা ভোটে আগের মতই সক্রিয় দেখা যায় মুকুলকে। কিন্তু সেবারই ছিল শেষ। তার পর আর তৃণমূলের হয়ে ভোট করানোর সুযোগ পাননি মুকুল রায়।
এখনকার পরিস্থিতি বোঝানোর জন্যই এতটা গৌরচন্দ্রিকা করা হল। গত দুদিন ধরে মুকুল রায় ফের খবরে রয়েছেন। হঠাৎ তাঁকে দিল্লিতে ভেসে উঠতে দেখা গিয়েছে। আর তা দেখেই অনেকে সন্দেহ করছেন, মুকুল রায় ফের ‘সেটিং’ করতে দিল্লিতে গেলেন কি? এই কৌতূহল আরও বেশি করে তৈরি হয়েছে কারণ তিন দিন আগে শুভেন্দু অধিকারী একটা ট্যুইট করে বলেছেন, নিয়োগ দুর্নীতিতে মুকুল পুত্র শুভ্রাংশু রায়ও জড়িয়ে থাকতে পারেন। তাঁর ভূমিকাও তদন্ত করে দেখুক সিবিআই-ইডি। স্বাভাবিক ভাবেই দুয়ে-দুয়ে চার করেছেন অনেকে। এবং মুকুল রায় দিল্লি যেতেই ধরে নিয়েছেন, কোনও বড় প্ল্যান রয়েছে। কারণ, গত দু’দশকে বাংলার তামাম সংবাদপত্র ও সংবাদমাধ্যম এই মানুষটাকেই তো চাণক্য বলে মহিমান্বিত করে এসেছে।
দূর থেকে এমন সন্দেহ করা অমূলক নয়। কিন্তু যাঁরা সম্প্রতি মুকুল রায়কে কাছ থেকে দেখেছেন, তাঁর সঙ্গে কথা বলেছেন বা সময় কাটিয়েছেন, তাঁরা হয়তো বুঝবেন এই সন্দেহের ভিত্তি নেই। কেন নেই?
একুশের বিধানসভা ভোটের পর মুকুল রায় তৃণমূলে যখন ফেরেন তখনই তাঁর শরীর বেশ খারাপ। তাঁর ঘনিষ্ঠরা বলেন, একুশের নির্বাচনের আগে বিজেপি যেভাবে মুকুল রায়কে অপাঙক্তেয় করে রেখেছিল, তা থেকেই ক্রমশ হতাশাগ্রস্ত হয়ে পড়েছিলেন তিনি। মজার ব্যাপার হল, ভোট যখন মধ্যগগনে তখন মুকুলবাবু শুভেন্দু-কৈলাসদের বারবার বলেছিলেন, বিজেপি একশো পার করবে না। কারণ, কৌশলে ভুল রয়েছে। কিন্তু মুকুলবাবুর কথা তখনও কেউ শোনেনি। এমনকি ভোটের মধ্যে একবার ম্যারিয়ট হোটেলে শিবপ্রকাশ ও দিলীপ ঘোষরা জরুরি বৈঠক ডাকেন। তাতেও বাদ রাখা হয় মুকুলকে।
আরও পড়ুন : মুকুল রায় কি মুখে চুষিকাঠি দিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছেন! এসব আবর্জনা আর চাই না: দিলীপ
এরকম হতাশায় ডুবে থাকা মুকুলের মাঝে একবার ল্যাপ্রোস্কপিও হয়। তাঁর শরীরে ডিমেনশিয়া রোগের প্রকোপ একটু একটু করে শুরু হয় তখন থেকেই। আর ইদানীং তিনি প্রায় কোনও কথাই মনে রাখতে পারেন না। অতি পুরনো স্মৃতি কিছুটা রয়েছে। কিন্তু সাম্প্রতিক স্মৃতি ঘেঁটে গিয়েছে। ডিমেনশিয়া রোগে এমনই হয়। তা ছাড়া মুকুলবাবুর হাই সুগার রয়েছে। বহু বছর ধরে তিনি ইনস্যুলিন নেন। ফলে মুকুলকে দলে ফেরানোর পর মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় প্রায়ই তাঁকে ফোন করে কুশল সংবাদ নিতেন। দু’দিন আগে যেদিন মুকুল কলকাতা থেকে বেপাত্তা হন, সেদিন বা তার আগের দিনও মমতার সঙ্গে কথা হয় মুকুলের।
প্রশ্ন হল, এহেন মুকুল রায় দিল্লিতে গিয়ে বিজেপি নেতৃত্বের সঙ্গে কী আলোচনা করবেন? কারণ, তাঁর পর পর দুটো কথার মধ্যে কোনও সঙ্গতিই নেই। আবার মুকুল রায় কোনও সাধারণ নাগরিক নন। মমতা যেভাবে তাঁর খোঁজ রাখেন, তাতে কালীঘাটকে অন্ধকারে রেখে মুকুলের নিঃশব্দে দিল্লি ঘুরে আসাও মুশকিল। কারণ, বিমানবন্দরে রাজ্য পুলিশের গোয়েন্দারা থাকেন। কোনও খবরই চাপা থাকবে না।
মুকুলের ঘনিষ্ঠ সূত্র জানা গিয়েছে, ইদানীং শুভ্রাংশুর সঙ্গে মুকুল রায়ের মতান্তর হচ্ছিল। কারণ, শুভ্রাংশু মুকুলকে বাড়ি থেকে বিশেষ বেরোতে দিতে চাইতেন না। তার কারণও স্বাভাবিক। একে বাবার শরীর খারাপ। তার উপর শুভ্রাংশুর হয়তো আশঙ্কা ছিল বাইরে বেরোলেই মুকুল রায় কোনও অসংলগ্ন কথা বলে দেবেন, যাতে তাঁকে বা তৃণমূলকে অস্বস্তিতে পড়তে হতে পারে। কিন্তু মুকুল রায় বেরোতে চাইতেন।
পিতা-পুত্রের এই মতান্তরের মধ্যে একপ্রকার জেদ করেই মুকুল রায় দিল্লিতে গিয়েছেন বলে জানা গিয়েছে। তবে এখন যাঁরা জল্পনা ছড়িয়ে দিচ্ছেন যে মুকুল রায় আবার বিজেপিতে যোগ দেবেন তাঁরা দুটো ভুল করছেন। এক, মুকুল রায় খাতায়কলমে এখনও বিজেপির বিধায়ক। একজন দলীয় বিধায়ককে আবার আনুষ্ঠানিক ভাবে দলে ফেরানো যায় নাকি! তা ছাড়া শুভেন্দু-অমিত শাহরাও জানেন, এই মুকুল রায় রাজনৈতিক ভাবে আর তাঁদের কোনও কাজে লাগবেন না। তাই তাঁদের দলের প্রাক্তন সহ সভাপতি বলে দিতে পারছেন, মুকুল রায়কে নিয়ে আমাদের আর কোনও ইন্টারেস্ট নেই!
মুকুল রায়ের এই শারীরিক ও রাজনৈতিক পরিস্থিতি দুঃখজনক। তিনি সুস্থ থাকুন। ভাল থাকুন।
আমি সাংসদ, আমি সুস্থ, বিজেপির হয়ে এখন অনেক কাজ: অকপট মুকুল রায়