
শেষ আপডেট: 28 January 2024 14:31
দ্য ওয়াল ব্যুরো: বাঁদরছানার জন্ম হয়েছে চিনে। আর তাতেই সাড়া পড়ে গিয়েছে বিশ্বজুড়ে। বাঁদরকে নিয়ে এত মাতামাতির কী আছে, যদি এই প্রশ্ন মনে জাগে, তা হলে প্রথমেই বলে রাখা ভাল, এটি কিন্তু নেহাতই অতি সাধারণ বাঁদর নয়। দীর্ঘদিনের চিন্তা-ভাবনা, কাটাছেঁড়া, তর্ক-বিতর্কের বেড়াজাল পেরিয়ে বিজ্ঞানীদেরই হাত ধরে জন্ম হয়েছে এই বাঁদরের। ল্যাবরেটরিতে ক্লোনিং করে তৈরি করা হয়েছে একে। দেখতেও হুবহু এক। চোখ, কান, নাক, চালচলন- কোথাও এতটুকু ফারাক নেই। ঠিক যেন আসল রেসাস বাঁদরের ‘জেরক্স কপি’।
চিনের সাংহাই প্রদেশের ‘চাইনিজ অ্যাকাডেমি অব সাইন্সেস ইনস্টিটিউট’-এর নিউরোসায়েন্স বিভাগের একদল জীববিজ্ঞানীর দীর্ঘ দিনের গবেষণার ফসল এই বাঁদরের ক্লোন। একই ধরনের জিনগত বৈশিষ্ট্যের প্রাণী। দেহকোষগুলিও অবিকল একই রকমের (ফিনোটাইপ)। এই আবিষ্কারকে ‘যুগান্তকারী এবং অভিনব’ বলে দাবি করেছেন সাংহাই প্রদেশের ‘চাইনিজ অ্যাকাডেমি অব সায়েন্সেস’-এর নিউরোসায়েন্স বিভাগের প্রধান বিজ্ঞানীরা।
জীববিজ্ঞানে ‘ক্লোনিং’ অবশ্য এই প্রথম নয়। এর আগে অন্তত ২০টি স্তন্যপায়ী প্রাণীর ‘ক্লোন’ করা হয়েছে। কিন্তু তাও এই গবেষণাকে যুগান্তকারী বলছেন বিজ্ঞানীরা, তার মূল কারণ হল, এর আগে ভেড়া, কুকুর, ইঁদুর,গিনিপিগ জাতীয় প্রাণীর ‘ক্লোন’ তৈরি করা হয়েছিল। এই প্রথম ‘নন-হিউম্যান প্রাইমেট’ বা মানুষের ঠিক আগের পূর্বসূরীর উপর সফল ভাবে পরীক্ষা করা সম্ভব হয়েছে। এর আগে রেসাস বাঁদরের ক্লোন করা হয়েছিল একবার, কিন্তু তা জন্মানোর পরে ২ ঘণ্টার বেশি বাঁচেনি। এই বাঁদরটি দীর্ঘসময় ধরে বেঁচে আছে শুধু নয়, রীতিমতো লাফাচ্ছে, ঝাঁপাচ্ছে, খেলা করছে। বিজ্ঞানীদের দাবি, এই গবেষণা পরবর্তী কালে বিভিন্ন দুরারোগ্য ব্যাধি নিরাময়ে এবং জীববিজ্ঞানের নিত্য নতুন আবিষ্কারের দরজা খুলে দেবে।
কী ভাবে জন্ম হল ক্লোন বাঁদরের?
ক্লোনিংয়ের একটি বিশেষ পদ্ধতি হল ‘সোমাটিক সেল নিউক্লিয়ার ট্রান্সফার’ বা এসসিএনটি। এই পদ্ধতিতেই জন্ম হয়েছে এই বাঁদরের। পুরুষ হোক বা স্ত্রী, যে প্রাণীর ক্লোন তৈরি করতে হবে, প্রথমে তার সোমাটিক সেল (দেহকোষ) সংগ্রহ করেন বিজ্ঞানীরা। দেহকোষ থেকে নিউক্লিয়াসটি আলাদা করে রাখা হয়। এই ক্ষেত্রে চিনের বিজ্ঞানীরা একটি স্ত্রী রেসাস বাঁদরের ভ্রুণের কোষ সংগ্রহ করে তার থেকে নিউক্লিয়াসটি আলাদা করে রেখেছিলেন। এ বার দ্বিতীয় একটি পূর্ণবয়স্ক স্ত্রী বাঁদরের ডিম্বকোষ (জনন কোষ) সংগ্রহ করে নিউক্লিয়াসটি ফেলে দেন। আলাদা করে সরিয়ে রাখা দেহকোষের নিউক্লিয়াসটি নিয়ে নিউক্লিয়াসবিহীন ডিম্বকোষের মধ্যে সেটিকে বসিয়ে দেওয়া হয়। লেসার রশ্মির মাধ্যমে।
কৃত্রিম নিষেক (দু’টি জননকোষ অর্থাত্ শুক্রাণু এবং ডিম্বানুর মিলন, এ ক্ষেত্রে কৃত্রিম নিষেক ঘটানো হয়) প্রক্রিয়ায় স্বাভাবিক ভাবে কোষ টুকরো হয়ে ভ্রুণ তৈরি হওয়ার পর সেটি তৃতীয় আর একটি পূর্ণবয়স্ক বাঁদরের গর্ভে প্রতিস্থাপিত করা হয়। তৃতীয় এই বাঁদরটি বা ‘সারোগেট মাদার’-এর থেকে যে সন্তানের জন্ম হয় তাকে হুবহু দেখতে হয় প্রথম বাঁদরটির মতো। যেহেতু, ডিম্বকোষের নিউক্লিয়াসটি ফেলে দেওয়া হয়, তাই সন্তানের মধ্যে দ্বিতীয় বাঁদরটির বৈশিষ্ট্য আসার কোনও সম্ভাবনাই থাকে না।
‘সোমাটিক সেল নিউক্লিয়ার ট্রান্সফার পদ্ধতি’তে যে সব সময় সাফল্য আসে তেমনটা নয়। বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই দেখা যায় ভ্রুণ পরিণত হওয়ার আগেই মাতৃগর্ভে সেটি নষ্ট হয়ে গিয়েছে বা, সন্তানের জন্ম হলেও তার মধ্যে নানা রকম জটিলতা দেখা গিয়েছে। এক্ষেত্রে বিপ্লব ঘটে গেছে।
স্তন্যপায়ী প্রাণীদের নিয়ে ক্লোনিং গবেষণার কাজ শুরু হয় ১৯৮০ সাল থেকে। ১৯৯৬ সালে এডিনবার্গ বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি বায়োটেকনোলজি কোম্পানি প্রথম ভেড়ার ক্লোন তৈরি করে। আমেরিকান গায়িকা ডলি পার্টনের নামে যার নাম দেওয়া হয় ‘ডলি’ । ২৭৭ বারের চেষ্টায় জন্ম হয় ডলির। এর পর নানা সময় বিভিন্ন দেশের বিজ্ঞানীরা স্তন্যপায়ী প্রাণীদের (কুকুর, বিড়াল, হরিণ, খরগোশ, গিনিপিগ) ক্লোন তৈরি করেছেন। তবে কোনও গবেষণাই দীর্ঘমেয়াদি সাফল্য পায়নি। সবক’টি ক্ষেত্রেই ক্লোনজাত প্রাণীর মধ্যে কোনও না কোনও অস্বাভাবিকতা দেখা গিয়েছে। ‘ডলি’ও বেশি দিন বাঁচেনি। মাত্র সাড়ে ছ’বছর বয়সে (ভেড়ার স্বাভাবিক আয়ু ১১-১২ বছর) আর্থ্রারাইটিস এবং ফুসফুসের ক্যানসারে তার মৃত্যু হয়।
বিজ্ঞানীদের মতে, ভবিষ্যতে এই গবেষণার মান যত উন্নত হবে, আরও বেশি সংখ্যক ক্লোন তৈরি করা সম্ভব হবে যাদের মধ্যে একই দেহজ এবং জিনগত বৈশিষ্ট্য থাকবে। কিন্তু এখানে একটি প্রশ্নও জাগছে। সেটি হল, বাঁদর আর মানুষের দেহকোষের বৈশিষ্ট্য অনেকটাই এক। কাজেই বাঁদরের ক্লোন তৈরিতে যদি সাফল্য আসে তাহলে পরবর্তী সময়ে কি মানুষেরও ক্লোনিং করা হবে?
বিজ্ঞানীরা বলছেন, বন্ধ্যাত্ব দূরীকরণে মানব ক্লোনিং খুবই গুরুত্বপূর্ণ একটি পক্রিয়া, এই গবেষণা সফল হলে প্রজননগত বহুরকম ত্রুটি দূর করা সম্ভব হবে। কিন্তু এ নিয়ে বিতর্ক অনেক। মানব ক্লোনিং নিয়ে বিভিন্ন ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানগুলিও দ্বিধাবিভক্ত। একদলের দাবি, এই পক্রিয়া খোদার উপর খোদকারি ছাড়া আর কিছুই নয়। এরই মধ্যে আবার অন্য এক দল ক্লোনিংয়ের সপক্ষেও কথা বলছেন। মানব ক্লোনিং উচিত না অনুচিত সেই নিয়ে তাবড় বিজ্ঞানীমহলেও চলছে নানা তর্ক-বিতর্ক।