
জাকির হুসেন
শেষ আপডেট: 8 January 2025 19:34
দ্য ওয়াল ব্যুরো: মুঘল সম্রাট মুহম্মদ শাহের দরবার বসেছে। চলছে পাখোয়াজের প্রতিযোগিতা। অনেকক্ষণ ধরে চলার পর ফলাফল ঘোষণা হল। রাগের মাথায় বিজিত প্রতিযোগী, সুধার খান দাধি তাঁর নাম, অত সাধের পাখোয়াজটি তুলে আছাড় মারলেন। মুহূর্তে বাদ্যযন্ত্র দু-ফাঁক। দর্শককুল হতভম্ব। কেউই যখন কথা খুঁজে পাচ্ছে না, তখন খণ্ড-বিখণ্ড পাখোয়াজের টুকরো তুলে আলতো চাঁটি দিলেন সুধার খান। বেজে উঠল বোল। একই তান, একই সুর, একই গমক। এবার বুলি ফুটল সকলের। তারিফের ভঙ্গিতে সমস্বরে আওয়াজ উঠল—‘তভি তো বোলা!’ (তাই তো বলি!) একসুরে বলা এই কথাই অপভ্রংশের পর গিয়ে দাঁড়াল ‘তাবোলা’-য়। সেখান থেকে ‘তবলা’। ভারতের ধ্রুপদী সংগীত-মহলের অন্যতম জনপ্রিয় বাদ্যযন্ত্রের জন্ম-ইতিহাস নিয়ে প্রচলিত রয়েছে এমনই নানান মিথ।
যদিও শুরু থেকে তবলার এতটা কৌলীন্য ছিল না। ধ্রুপদী কণ্ঠশিল্পী কিংবা সরোদ, সারেঙ্গী, রুদ্রবীণার মতো বাদ্যযন্ত্রের সঙ্গত হিসেবেই তাকে ব্যবহার করা হত। ধীরে ধীরে পরিস্থিতি বদলায়। পণ্ডিত সামতা প্রসাদ, কিষেণ মহারাজ, আল্লারাখা খান একে মার্গ সংগীতের মূলধারায় নিয়ে আসেন। উস্তাদ জাকির হুসেনের হাত ধরে তবলা ‘গ্লোবাল’ তকমা লাভ করে।
যন্ত্রটির জন্ম-নেপথ্যে মুঘল দরবারের কাহিনিকে তাবড় ঐতিহাসিকেরা অবশ্য চটকদার গালগল্প মনে করেন। যার কোনো বস্তুভিত্তি নেই। সাফ জানিয়েছেন সংগীত-গবেষক পণ্ডিত বিজয় শঙ্কর মিশ্র। তাঁর মতে, এর চাইতে অকাট্য তথ্য হচ্ছে, আঠারো শতকে আমীর খসরু খান নামে এক বাদ্যকর তবলার আদত জন্মদাতা। খসরুকে নাকি বরাত দেওয়া হয়েছিল খেয়ালের সঙ্গে সংগত দিতে পারে এমন একটি যন্ত্র তৈরির, যা কিনা পাখোয়াজের চেয়েও ‘সুরেলা’ ও ‘পরিস্রুত’ সুর তুলতে পারবে। সেই সূত্রেই কালক্রমে তবলা এবং মৃদঙ্গমের জন্ম।
আরেকটি মত বলছে, আরবি শব্দ ‘তাবল’ থেকেই ‘তবলা’ এসেছে। তাবলের অর্থ বাদ্যযন্ত্র। এর দুটি অংশ। একটি ডাঁয়া, অন্যটি বাঁয়া। ডাঁয়া তুলনায় সরু, কাঠের তৈরি। বাঁয়া আকারে বড়, গোলাকার, মূলত ধাতু দিয়ে বানানো।
ধ্রুপদী সংগীতের ধারা মেনে তবলারও একাধিক ঘরানা সৃষ্টি হয়েছে। যেমন—আজারা, বেনারস, দিল্লি, ফারুকাবাদ, লখনউ। যদিও বিশ শতকে এসে সমস্ত ঘরানা নিজেদের বিশুদ্ধতা ও স্বাতন্ত্র্য রাখতে পারেনি—একে অন্যের সঙ্গে মিশে গিয়ে মিশ্ররূপ তৈরি করেছে।
গত বছর ১৫ ডিসেম্বর প্রয়াত হন প্রবাদপ্রতিম তবলাশিল্পী জাকির হুসেন। একবার খেদোক্তির সুরে জাকির বলেছিলেন, ‘আগে আমরা, তবলাবাদকেরা তেমন কিছু পয়সা রোজগার করতাম না। এখন পরিস্থিতি অন্যরকম। আমাদের কেউ আর ততটাও সহজভাবে নিতে পারে না। আগে মুম্বইয়ের বাইরে যখন কোনো অনুষ্ঠানে যেতাম, আমাদের ট্রেনের টিকিট কেটে পাঠানোর বন্দোবস্ত হত। বাকি কুলীন শিল্পীরা যেতেন ফ্লাইটে চড়ে। আমার বাবার আমল থেকেই ছবিটা বদলে যেতে থাকে। এখন সমস্ত শিল্পী একসঙ্গে যান—একযাত্রায় আর পৃথক ফল ফলে না!’