আর যাই হোক, এই মেয়ে ‘ইন্ডাস্ট্রি প্ল্যান্টেড’ নয়৷ হতে পারে না। এই মেয়ে হাজারো সমস্যা, শত দুর্বলতা আর সীমাবদ্ধতা নিয়েও খাঁটি৷ ঘাবড়ে যায় ঠিকই, কিন্তু সংশোধনে উৎসুক৷ শব্দ খুঁজে পায় না যখন, সিলিং-পানে চায়। বাক্য যখন সমাপ্তি খোঁজে, এই ‘নড়বড়ে’ মেয়ে হাত নেড়ে পাদপূরণের শব্দটাকে হাতড়ে বেড়ায়! এই মেয়ে যতটা ‘রিল’, ঠিক ততটাই ‘রিয়াল’!

পূজারিণী প্রধান
শেষ আপডেট: 10 April 2026 15:32
বারদুয়েক জিভ কামড়ালেন, লজ্জায়। একবার কথা গুলিয়ে গেল, সময় নিয়ে সংশোধন করলেন। মুখে সেই পরিচিত হাসি, সারল্যের। চোখে সেই চেনা দীপ্তি, উদ্যমের! ট্রোলার-বাহিনীর দুই নেত্রীর একজন ছুড়েছিলেন চ্যালেঞ্জ। জনতার দরবারে আসার৷ রিলের টি-২০ নয়। নামতে হবে প্রশ্নোত্তরের টেস্টে। সেখানে মাপা হবে এলেম। বিদ্যেবুদ্ধির ওজন৷ বাটখারা, তুলাযন্ত্র অবশ্য তিনি ঠিক করে দেননি। যেভাবে সতত উপর উপর, ভাসা ভাসা কথা বলে থাকেন, সেভাবেই উসকেছিলেন মাত্র।
দ্বিতীয় নেত্রীর ভজঘট বক্তব্য (ফেসবুক পোস্ট, যা আপাতত অন্তর্হিত… হয় মুছে ফেলা হয়েছে, নয়তো আড়ালে রয়েছে) ছিল বিবিধ৷ পাঠাভ্যাসের তরিকা নিয়ে, উপভাষাজাত বাংলামিশ্রিত ইংরেজির ন্যায্যতা নিয়ে, জ্ঞানের গভীরতা, সর্বোপরি আড়ালের অর্থদুষ্ট পুঁজিবাদী প্ররোচনা নিয়ে।
প্রথমজন পরমা বন্দ্যোপাধ্যায়। দ্বিতীয়জন সঙ্গীতা বন্দ্যোপাধ্যায়। মূলত এই দুজনের ট্রোলের বিষ আত্মস্থ করেই যাবতীয় চ্যালেঞ্জ সাদরে বরণ করলেন পূজারিণী প্রধান। প্রায় নিভন্ত ইউটিউব চ্যানেলে (শেষ আপলোড ৪ মাস আগে) রাখলেন লাইভ ভিডিও। সেকেন্ডের রিল নয়। প্রায় ৯ মিনিটের ভিডিও। পূর্বাভাষ গোছের৷ আগামী দিনে এই চ্যানেলে কী কী সাজাতে চলেছেন, তার সংক্ষিপ্ত বিবরণ এবং আত্মপক্ষ সমর্থনে সামান্য কিছু কথা।
হিসেব অনুযায়ী ১৬ ঘণ্টা আগে আপলোড করা এই ভিডিও ইতোমধ্যে দু'হাজারেরও বেশি লোক দেখে ফেলেছেন৷ আশা করা যায় যত সময় গড়াবে, সংখ্যাটা তত বাড়বে। আশা এও করা যায়, বিশেষ যে দুজন পূজারিণীর যোগ্যতা ও এক্তিয়ার নিয়ে সওয়াল তুলেছিলেন, তাঁরাও এই ন'মিনিটের ভিডিও এক কান চাপা দিয়েও শুনবেন, এড়িয়ে যাবেন না। তারপর হয়তো টক্সিক দিদিমণিসুলভ টোনে দ্বিতীয় দফার টাস্ক ছুড়ে দেবেন৷
মনে রাখা জরুরি, সীতাকেও অগ্নিপরীক্ষায় নামতে হয়েছিল৷ পূজারিণী ব্যক্তিগতভাবে জনকদুহিতার সিদ্ধান্তের সঙ্গে কতটা একমত বা অনুপ্রাণিত, আমরা জানি না। আদৌ সম্ভাব্য পাল্টা আক্রমণ তিনি ধর্তব্যের মধ্যে আনবেন কিনা, এও অনুমানের বাইরে। তবে আসল কথা এই, যে পূজারিণীর অনুরাগী যাঁরা, ইউটিউবে সাবাশি জানিয়ে পিঠ চাপড়ে কমেন্ট করেছেন যে শতাধিক স্বজন, তাঁরা আজকের ভিডিওতে পূজাকে হোঁচট খেতে দেখে অন্তত একটা ব্যাপারে একশো শতাংশ আশ্বস্ত: আর যাই হোক, এই মেয়ে ‘ইন্ডাস্ট্রি প্ল্যান্টেড’ নয়৷ হতে পারে না। এই মেয়ে হাজারো সমস্যা, শত দুর্বলতা আর সীমাবদ্ধতা নিয়েও খাঁটি৷ ঘাবড়ে যায় ঠিকই, কিন্তু সংশোধনে উৎসুক৷ শব্দ খুঁজে পায় না যখন, সিলিং-পানে চায়। বাক্য যখন সমাপ্তি খোঁজে, এই ‘নড়বড়ে’ মেয়ে হাত নেড়ে পাদপূরণের শব্দটাকে হাতড়ে বেড়ায়! এই মেয়ে যতটা ‘রিল’, ঠিক ততটাই ‘রিয়াল’!
আজ ঠিক কী বলেছেন পূজা? ন’মিনিটের লম্বা ভিডিও৷ পুরোটার তর্জমা করা অবান্তর। করলে দেখার আনন্দও মাটি। সারাৎসার এটুকুই: এবার থেকে ইনস্টাগ্রাম রিলের পাশাপাশি নিয়মিত ইউটিউবেও আসতে চলেছেন পূজারিণী। বক্তব্য সেই একই। নিজের কথা। নিজের অনুভূতির কথা। বইয়ের কথা। সিনেমার কথা। যুগের কথা। স্মৃতির কথা। সংশোধন আর সন্মার্জনের কথা। কিছু যদি বদলানো উচিত বলে মনে হয়—বলবেন সপাটে। কিছু বদলে যাওয়া ঠিক নয় মনে করেন যদি—জানাবেন সেটুকুও। কিন্তু প্রেজেন্টেশনের মাধ্যম বদলাবে না। ইংরেজিই থাকবে। বাড়বে সময়ের বিস্তারটুকু। আরেকটু গভীরে ঢুকে বিশ্লেষণ। তলিয়ে অন্বেষণ।
কিন্তু তাঁর উপস্থাপনা যে বড় ভঙ্গুর… গ্রাম্য… এলোমেলো! অদ্ভুতভাবে আজ সেই অভিযোগগুলো মেনে নিয়েছেন পূজারিণী। হাসিমুখে। তারপর খানিক জোশ দেখিয়েই বলেছেন, ‘দিনে পাঁচ মিনিট আমি ইংরেজিতে কথা বলি। ঠিক ততটুকু সময়, যতটুকু রিল বানাতে লাগে। এত অল্প সময় একটা ভাষায় কথা বলে কি সড়গড় হওয়া যায়? আমার বাংলাও কি স্বচ্ছ? নিখুঁত? যে বাংলা আপনারা বইয়ে পড়েন, সিনেমায় দেখেন, আমি তো সেটুকুও বলতে পারি না। আমার বাংলায় ডায়ালেক্ট মিশে। তাই শহর থেকে যখন কেউ আসে, আমি তার সঙ্গে নিজের মাতৃভাষায় কথা বলতে অস্বস্তি বোধ করি। কিন্তু এটা কাটাতে হবে৷ আমাকে আরও বেটার হতে হবে। আর তাই এই ইউটিউব ভিডিও। দিনের কাজকর্ম থেকে সময় বাঁচিয়ে এটা করে যাব। তাতে আমারই উন্নতি। শব্দভাণ্ডার বাড়বে, কোনও বক্তব্য তাড়াহুড়োর বদলে ধীরেসুস্থে উপস্থাপনার সামর্থ্য তৈরি হবে। সবচেয়ে বড় কথা, চিন্তাভাবনা করে কথা বলায় গতি আসবে!’
কথাগুলো যখন বলছেন পূজারিণী, আমার অনুসন্ধিৎসু চোখ হাতড়ে যাচ্ছে পেছনের বইয়ে ঠাসা র্যাক। চিত্রবিচিত্র সম্ভার। নতুন-পুরনো মিলিয়ে। ইংরেজির স্নাতক পূজারিণী। স্বাভাবিকভাবে ইংরেজি বই-ই বেশি নজরে এল। বাংলার প্রতিনিধি, প্রচ্ছদ দেখে যতটুকু বুঝলাম, সদ্যপ্রয়াত সাহিত্যিক শংকরের জনপ্রিয় উপন্যাস ‘চৌরঙ্গী’। ঠিক তখনই, জানি না কেন, মাথায় খেলে গেল আখ্যান শুরুর আগে উদ্ধৃত এসি মাফেনের লেখা পঙক্তিগুচ্ছ:
"Our life is but a winter's day:
Some only breakfast and away;
Others to dinner stay and are full-fed;
The oldest man but sups and goes to bed:
He that goes soonest has the least to pay."
উপন্যাসটি পড়ে থাকলে পূজারিণী নিশ্চিতভাবে এই লাইনগুলো এড়িয়ে যাননি। ‘দ্য শশাঙ্ক রিডেম্পশন’ থেকে ‘সীতা রামম’... লীলাময়, প্রাণচঞ্চল, দ্যুতিময় জীবনের সমস্ত আভা বুদ্ধির জটিলতায় নয়, অনুভূতির শুদ্ধতায় খুঁজে পান যিনি, চৌরঙ্গী শুরুর ওই পাঁচটি লাইন তাঁকেই পারে অসূয়াদীর্ণ পৃথিবীতে সহজ ছন্দে বেঁচে থাকার শক্তি জুগিয়ে যেতে।