
শেষ আপডেট: 22 November 2023 17:29
ডেঙ্গি হল ভাইরাল ফিভার। টাইফয়েড বা অন্যান্য ভাইরাল জ্বরের এর সাথে এর তফাৎ হল, জ্বর প্রথম দিন থেকেই বেশ বেশি আসে। তাপমাত্রা বেড়ে যায় অনেকটা। সেই সঙ্গে কিছু আনুষঙ্গিক উপসর্গ দেখা দেয়।
ডেঙ্গি নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হওয়া মানুষের সংখ্যা কম নয়। অথচ পর্যাপ্ত বিশ্রাম ও ঘরোয়া যত্নেই কিন্তু ভাল হয়ে যেতে পারে ডেঙ্গি রোগী। খুব বাড়াবাড়ি না হলে হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার দরকার পড়ে না।
ডেঙ্গি রোগীর চিকিৎসার মূল কথাই হল বিশ্রাম। যত বেশি বিশ্রাম নেওয়া যাবে ততই দ্রুত আপনার শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়বে। রোগও কমবে তাড়াতাড়ি। তবে বিশ্রামটি যেন যথার্থই বিশ্রাম হয়। শুয়ে শুয়ে মোবাইল ফোন দেখলে কিন্তু বিশ্রাম যথার্থ হয় না।
আপনি কোনও ভাল কবিতা বা গান চালিয়ে শুনতে পারেন অথবা পড়া সম্ভব হলে চোখে ব্যথা না থাকলে বই পড়ারও চেষ্টা করতে পারেন। দ্বিতীয়ত, পর্যাপ্ত তরল গ্রহণ করুন। ডেঙ্গি রোগের চিকিৎসার আরেকটি মূল বিষয় হল হাইড্রেটেড থাকা। শরীরে জলের পরিমাণ ঠিক থাকলে ডেঙ্গি রোগে জটিলতা হওয়ার সম্ভাবনা কমবে। তাই প্রতিদিন পর্যাপ্ত পরিমাণ জল তো খেতেই হবে, সঙ্গে লেবু ও গুড়ের শরবত, ডাবের জল ,ডালের জল, স্যুপ ইত্যাদিও খাবার চেষ্টা করুন।
আখের রস এখন বাজারে পাওয়া যাচ্ছে। আখের রসও খুব ভাল একটি পানীয়। বাজারে পাওয়া প্যাকেটের ফলের রস কিন্তু খাবেন না। এতে থাকা চিনি শরীরের প্যাথোজেনকে অর্থাৎ রোগ সৃষ্টিকারী জীবাণুকে আরও শক্তিশালী করে তোলে। গোটা ফল চিবিয়ে খাওয়াই ভাল। প্রয়োজনে ফলের রস করে খান।
টাটকা মরশুমি শাকসব্জি রান্না করে খান। ফল যেমন কমলালেবু, মুসাম্বি, আমলকি, পেয়ারা, বেদানা ইত্যাদি চিবিয়ে খেলে ভাল। তাছাড়া কচি গম ঘাসের জুস (Wheatgrass) এক্ষেত্রে খুবই উপকারি। দিনে চায়ের কাপের হাফ কাপ জুস খাওয়া যথেষ্ট।
প্রয়োজনে ওআরএস খান। যে কোনও ভাবে শরীরকে ডিহাইড্রেশন থেকে দূরে রাখুন। সম্ভব হলে সব রকমের খাবার সহজ পাচ্য ভাবে বানিয়ে খেতে থাকুন। নিজের হজম শক্তি অনুযায়ী খাবারের পরিমাণ নির্ধারণ করুন। যে পরিমাণ খাবার খেলে পেট অনেকক্ষণ ভার হয়ে থাকছে না এবং তাড়াতাড়ি হজম হয়ে যাচ্ছে একবারে ততটা পরিমাণ খাবারই গ্রহণ করুন। ধীরে ধীরে শরীর ঠিক হতে থাকলে খাবারের পরিমাণও বাড়তে শুরু করবে।
হালকা নরম সিদ্ধ করা ভাত ডালের জল, পেঁপে সিদ্ধ অথবা পেঁপে, কাঁচকলা, জ্যান্ত বা জিওল মাছ দিয়ে ঝোল লেবু মিশিয়ে খাবেন। যে কোনও ধরনের নিরামিষ বা আমিষ স্যুপ খেতে পারেন। দুটি খাবারের মাঝখানে স্ন্যাক হিসেবে প্রোটিন জাতীয় খাবার যেমন বাদাম, মিষ্টি কুমড়োর বীজ, সয়াবিনের টিক্কা, পনিরের সালাদ, টক দইয়ের লস্যি, কাবুলি চানা সেদ্ধ , ডালের স্যুপ, চিকেন সুপ, ডিমের পোচ ইত্যাদি খেতে পারেন।
আয়রন যুক্ত সবুজ শাকসব্জি লেবুর রস ছড়িয়ে খেলে ভাল লাগবে। কারও কারও ক্ষেত্রে হেমারেজিক কন্ডিশনের জন্য প্লেটলেট কাউন্ট অনেক কমে যেতে পারে। কিছু প্রাকৃতিক উপায়ে প্লেটলেট কাউন্ট বাড়ানো যেতে পারে। কচি গম ঘাসের জুস বিটরুট অ্যালোভেরা প্রভৃতি খাবারগুলি প্লেটলেট কাউন্ট বাড়াতে সাহায্য করে সেগুলো রোজের ডায়েটে রাখুন। আরেকটি প্রাকৃতিক খাবার যা আশ্চর্যজনকভাবে প্লেটলেট কাউন্ট বাড়াতে সাহায্য করে তা হল পেঁপে পাতার রস। শুধু পেঁপে পাতার রস নয়, কাঁচা পেঁপে ও পাকা পেঁপেও এক্ষেত্রে বেশ উপকারি।
কীভাবে খাওয়াবেন কাঁচা পেপে পাতার রস
পেঁপে পাতায় থাকা উপকারি উপাদানটি হল অ্যাসিটোজেনিন। এটি একটি ফাইটোকেমিক্যাল অর্থাৎ উদ্ভিদের শরীরে পাওয়া যায় এমন একটি প্রাকৃতিক রাসায়নিক।
এছাড়াও পেঁপে পাতার অন্যান্য প্রাকৃতিক উপাদানগুলি হল--ফ্ল্যাবনয়েড, কেরাটিন, কার্পেইন, ইত্যাদি।
এনথ্রোকুইনাইন ও সাপোনিনস এর মত উদ্ভিজ্জ রাসায়নিক ও টানিনের মত কার্ডিও গ্লাইকোসাইড রয়েছে যা অ্যান্টিইনফ্লামেটরি ও অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট হিসাবে কাজ করে। এইসব উপাদান শরীর থেকে ফ্রি রেডিকেলসগুলিকে বার করে দেয়। তাছাড়াও রক্তকণিকাকে সুরক্ষা দেয় ও লোহিত কণিকার আবরণীকে স্থিতিশীল করে।
কীভাবে বানাবেন এই রস? দুই থেকে তিনটে পেঁপে পাতা ভাল করে ধুয়ে কুঁচিয়ে নিন। একটি স্টিলের পাত্রে এক গ্লাস জল গরম করে পেঁপে পাতাগুলিকে দিয়ে ফুটতে দিন। পাঁচ থেকে সাত মিনিট ফুটিয়ে জল ছেঁকে ঠান্ডা করুন। বড়দের ক্ষেত্রে ৩০ মিলিলিটার করে দিনে দু’বার এবং ছোটদের ক্ষেত্রে ১২ বছরের নীচে দশ এমএল করে দিনে দুবার দিতে পারেন। যেহেতু এর স্বাদ একটু কষা তাই এই মিশ্রণের সঙ্গে মধু মিশিয়ে বা গুড় মিশিয়ে নিতে পারেন। একেবারে খেতে না পারলে বারে বারেও দিতে পারেন। তবে পরিমাণ যেমন বলা হয়েছে সেটাই দিতে হবে। প্লেটলেট কাউন্ট স্বাভাবিক হলে খাওয়া বন্ধ করবেন।
তবে বলে রাখা ভাল, ডেঙ্গির চিকিৎসা কখনওই পেঁপে পাতার রস নয়। পথ্য হিসেবে বাড়িতে এই পানীয় ডায়েটে রাখতেই পারেন, তবে অসুখের সামান্য বাড়াবাড়ি বুঝলে ডাক্তার দেখান অবশ্যই।