
নেপালের সর্বত্র রাস্তা জুড়ে কাজ চলছে
শেষ আপডেট: 5 April 2024 03:39
৩ এপ্রিল: ধুলোয় সমস্যা হয়? অ্যালার্জি আছে? শ্বাসকষ্ট বা হাঁপানির সমস্যায় ভোগেন? তাহলে অন্তত এই মুহূর্তে নেপাল ভ্রমণের পরিকল্পনা না করাই ভাল।
এ' যেন আক্ষরিক অর্থেই ধূলিধূসরিত। নির্মাণকাজ আমাদের সকলেরই চেনা দৃশ্য। যেখানেই চলুক না কেন, ধুলোর সমস্যা হবেই। অথচ নেপালে পা রাখলেই আপনার মনে হতে পারে, বোধ হয় সামনের বছর অলিম্পিক বা এশিয়ান গেমসের আসর বসতে চলেছে কাঠমান্ডুতে। সারা দেশে নির্মাণকাজের এক মহাযজ্ঞ শুরু হয়েছে। যার সবচেয়ে বেশি ভারটা এসে পড়েছে সড়ক নির্মাণে। সাধারণত রাস্তার কাজ ধাপে ধাপে হয়। কিছুটা করে অংশে কাজ এগোয়, শেষ হলে পরের অংশে যাওয়া হয়। অথচ এখন নেপালে এলে মনে হবে, কার্যত সারা দেশের সবক'টি রাস্তাই যেন রাতারাতি প্রশস্ত করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে নেপাল সরকার!
নেপালের সবচেয়ে বড় দুই শহর কাঠমান্ডু ও পোখরার মাঝের দূরত্ব প্রায় ২০০ কিলোমিটার। সড়কপথে গেলে ঘন্টা ছয়-সাত লাগার কথা। অথচ রাস্তার অবস্থা দেখলে রাস্তা বলে চিনতেই সময় লাগবে! প্রায় গোটা রাস্তা জুড়েই চলছে বিবিধ উন্নতিকরণ প্রকল্প। কোথাও পাহাড় কেটে রাস্তা চওড়া করা হচ্ছে, কোথাও মাটি খুঁড়ে সমান করা হচ্ছে, কোথাও আবার দুই লেন, তিন লেন বানানো চলছে। যার ফলে একদিকে জমে রয়েছে মাটি, কাজ করছে জেসিবি, বুলডোজার, ক্রেন, আর্থ মুভার সহ একাধিক পেল্লায় যন্ত্রপাতি। মাঝের খানাখন্দ পেরিয়েই চলছে বাস, গাড়ি, ট্রাক।
দীর্ঘদিন ধরে পর্যটন ব্যবসার সঙ্গে জড়িত পোখরার বিনয় ঘিমিরে বললেন, "এটা আজ নতুন দেখছেন এমন নয়। গত চার-পাঁচ বছর ধরেই এই একই কাজ চলছে। ধুলোয় হাইওয়েতে বাইক চালানো যায় না। কী করে ট্যুরিস্টদের নিয়ে আসব সেটাই তো ভেবে পাই না। হাইওয়ের ধারের স্থানীয়দের কথা ভাবুন তো!" মঙ্গলবার কাঠমান্ডুতে নেপালি সংসদের প্রতিনিধি সভায় প্রায় একইভাবে কাসকির সাংসদ ও কমিউনিস্ট পার্টি (সংযুক্ত মার্ক্সবাদী-লেনিনবাদী) নেত্রী বিদ্যা ভট্টরাই অভিযোগ করেন, দীর্ঘদিন ধরে রাস্তার কাজ চলার কারণে ক্ষতির মুখে পড়ছে পোখরার হোটেল ব্যবসা।
বিনোদের দীর্ঘসূত্রিতার অভিযোগ খুব ভুল নয়৷ যেমন ধরা যাক, কাঠমান্ডু-তরাই এক্সপ্রেসওয়ের কথা। শুরুতে ২০১৫ সালে তৎকালীন সুশীল কৈরালা-সরকার ৭১ কিলোমিটার দীর্ঘ এই সড়ক প্রকল্পের দায়িত্ব তুলে দিয়েছিল ভারতীয় এক নির্মাণসংস্থার হাতে। যথারীতি সেই নিয়ে চাপান-উতোর শুরু হয়। মামলা দায়ের হয় নেপালি সুপ্রিম কোর্টে। আদালত এর বিপক্ষে রায় দেয়। ফলে পরবর্তী কে পি শর্মা ওলি সরকার নিজেদের দায়িত্বে কাজ শুরু করবে জানায়। অবশেষে বর্তমান পুষ্পকুমার দহল (কম. প্রচণ্ড) সরকার পুরোপুরিভাবে ভারতের সংস্থার সঙ্গে সব চুক্তি বাতিল করে। ২০১৭ সালে দায়িত্ব দেওয়া হয় নেপালের সেনাবাহিনীর হাতে।
মুশকিল হচ্ছে, নেপালের সেনাবাহিনী বিপর্যয় মোকাবিলায় বা জরুরি ভিত্তিতে আপৎকালীন সড়ক নির্মাণে সিদ্ধহস্ত হলেও এত বড় মাপের প্রকল্প রূপায়নের মত পরিকাঠামো তাদের হাতে নেই। ফলে বিভিন্ন ছোটখাটো দেশি-বিদেশি সংস্থার হাতে দায়িত্ব দিয়েছে সেনা। প্রকল্প শেষ হবার কথা ছিল চার বছরের মধ্যে। অথচ এখনও তা চলছে। এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট ব্যাঙ্ক শুরুতে এর খরচ ধরেছিল ৭০ বিলিয়ন নেপালি টাকা। সম্প্রতি এক দক্ষিণ কোরীয় সংস্থা হিসেব কষে দেখেছে, দীর্ঘসূত্রিতার ফলে প্রকল্পের খরচ ২০০ বিলিয়ন নেপালি টাকা ছাড়িয়ে গিয়েছে। এদিকে ২০২৩ সালের হিসেবে, কাজ এগিয়েছে মাত্র ২৮%!
এই দুর্গতি কবে শেষ হবে, বলতে পারছেন না কেউই। নেপালের সেনাপ্রধান জেনারেল প্রভুরাম শর্মা নিজেও খুব একটা আশাবাদী নন। যদিও তিনি দুষছেন একাধিক আইনি জটিলতাকে। এদিকে ধুলোর দৌরাত্ম্যে হু হু করে বিপদসীমার দিকে বাড়ছে নেপালের বায়ুর গুণমান সূচক বা "এয়ার কোয়ালিটি ইনডেক্স।" কাঠমান্ডুর মার্কিন দূতাবাস বলছে, বুধবার সকাল আটটা নাগাদ শহরের একিউআই ছিল ১৭১! যা অত্যন্ত অস্বাস্থ্যকর ও বিপজ্জনক।
তাই, আপাতত, নেপাল আসার পরিকল্পনা করলে, অবশ্যই সঙ্গে মাস্ক ও অন্যান্য হাঁপানির জরুরি ওষুধপত্র সঙ্গে রাখবেন। কাশি, অ্যালার্জির আপৎকালীন চিকিৎসা নিয়েও একটু পারিবারিক ডাক্তারবাবুর পরামর্শ নিয়ে রাখা ভাল। আর অতি অবশ্যই, পকেটে রেস্ত থাকলে বাতানুকূল গাড়ির বন্দোবস্ত রাখতে বলবেন। নয়ত পস্তাতে হতে পারে।