
আগামী ১ জুলাই থেকে দেশের অপরাধ সংক্রান্ত আইনে আমূল বদল
শেষ আপডেট: 27 June 2024 13:44
দ্য ওয়াল ব্যুরো: আগামী ১ জুলাই দেশের অপরাধ সংক্রান্ত আইন আমূল বদলে যাচ্ছে। ব্রিটিশ সরকারের তৈরি ফৌজদারি আইন ওই দিন থেকে বাতিল হয়ে যাবে। কেন্দ্রীয় সরকারের এই সিদ্ধান্ত নিয়ে বিরোধীরা আগেই আপত্তি তুলেছিল। ভারত সরকার তাতে কর্ণপাত করেনি।
বৃহস্পতিবার রাষ্ট্রপতি দ্রৌপদী মুর্মু সংসদে যৌথ অধিবেশনে প্রদত্ত ভাষণে জানিয়েছেন ১ জুলাই-ই নতুন আইন চালু হচ্ছে। যদিও নয়া আইন নিয়ে বিচারক-পুলিশ-আইনজীবীদের বেশিরভাগই এখনও অন্ধকারে। অনেকের কাছেই নয়া আইন স্পষ্ট নয়। গত বছর ২৫ ডিসেম্বরে রাষ্ট্রপতি বিজ্ঞপ্তি জারি করে নতুন আইনে সম্মতি দেন। তার আগে কার্যত বিরোধী শূন্য সংসদে তিনটি বিল পাশ করিয়ে নেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ। তিনি পরে ঘোষণা করেন, ১ জুলাই থেকে নয়া আইন কার্যকর হবে।
যদিও বিচারালয় এবং থানা-পুলিশের সিংহভাগের কাছে নয়া আইন স্পষ্ট নয়। ফলে ১ জুলাই থানায় অভিযোগ দায়ের করার সময় আইনের ধারা প্রয়োগ নিয়ে সমস্যায় পড়তে হবে পুলিশকে। একই কারণে বিচারে সমস্যার মুখে পড়বেন বিচারকেরাও। কলকাতা ও রাজ্য পুলিশের দুই পদস্থ আধিকারিকের কথায়, বাহিনীর লোকজনের কাছে নয়া আইন খায় না মাথায় জাতীয় সমস্যা। সবচেয়ে সমস্যায় পড়বে থানায় কর্মরত পুলিশ। একই মত আলিপুর ও শিয়ালদহ আদালতের দুই বিচারকের। তাঁদের বক্তব্য, এক দফা প্রশিক্ষণ হয়েছে বটে। তবে তা ছিল দায়সাড়া পদক্ষেপ।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী শাহ জানিয়েছিলেন পুলিশ-আইনজীবী ও নিম্ন আদালতের বিচারকদের পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণ দেওয়া হবে। কিন্তু জানুয়ারি মাস থেকে পুলিশ-প্রশাসন ভোট নিয়ে ব্যস্ত থাকায় নয়া আইন নিয়ে প্রশিক্ষণের সুযোগ পাননি অনেকেই।
আসলে ১ জুলাই থেকে ফৌজদারি বা অপরাধ সংক্রান্ত বিচার ব্যবস্থায় চালু হতে যাচ্ছে নয়া তিন আইনের শাসন। ভারতীয় দণ্ডবিধি বা আইপিসি’র বদলে ভারতীয় ন্যায়সংহিতা (বিএনএস), ফৌজদারি কার্যবিধি বা সিআরপিসি’র বদলে ভারতীয় নাগরিক সুরক্ষা সংহিতা (বিএনএসএস) এবং এভিডেন্স অ্যাক্টের বদলে ভারতীয় সাক্ষ্য অধিনিয়ম (বিএসএ) চালু হবে গোটা দেশে।
আইন-আদালত ও মানবাধিকার রক্ষার কাজে যুক্ত মহলের মতে, স্বাধীনতার পর কম করে ৭৫ বার আইপিসি সংশোধন করা হয়েছে। এই প্রথম গোটা আইন বদলে ফেলা হল। নয়া আইন প্রনয়ণের সময় সরকারের তরফে বারে বারে দাবি করা হয় ব্রিটিশ সরকারের দমনপীড়নমূলক ধারাগুলি বাতিল করা হবে। যদিও নয়া আইনের ধারা-উপধারার বিধান দেখে অনেকেই মনে করছেন, স্রেফ নাম বদল ঘটিয়ে ব্রিটিশ আইন বলবৎ রাখা হয়েছে। কিছু ক্ষেত্রে আইনের ধারা আরও কঠোর করা হয়েছে। মানবাধিকার সংগঠন এপিডিআর নয়া আইনের কঠোর ধারাগুলি আপত্তি তুলে প্রচার শুরু করেছে। তারা নাগরিকদের প্রতিবাদ করার ডাক দিয়েছে।
একাধিক মানবাধিকার সংগঠন নয়া আইনকে বিপজ্জনক বলে তা বাতিলেক দাবি তুলেছে। তাদের বক্তব্য, ব্রিটিশ আইনে গ্রেপ্তারের পর আদালতের অনুমতি সাপেক্ষে অভিযুক্তকে সর্বোচ্চ ১৪ দিন হেফাজতে রাখতে পারে পুলিশ। নয়া আইনে বলা হয়েছে ৬০ কিংবা ৯০ দিন অবধি পুলিশ অভিযুক্তকে হেফাজতে রাখতে পারবে। অনেকেই মনে করছেন, এটা মানবাধিকার হরণের বড় নজির। হালেও সুপ্রিম কোর্ট একাধিক মামলায় বলেছে গ্রেফতারি, হেফাজতে রাখার মতো পদক্ষেপ বিরল ক্ষেত্রে প্রয়োগ করা যেতে পারে। অভিযোগ দায়ের হলেই গ্রেফতার করে গারদে পোরার ব্রিটিশ সংস্কৃতি থেকে সরে আসুক পুলিশ। অথচ নয়া আইনে পুলিশকে এই ব্যাপারে আরও বাড়তি সুবিধা করে দেওয়া হয়েছে।
মানবাধিকার সংগঠনগুলি বলছে, নয়া আইনে বাতিল হয়েছে পুলিশ হেফাজতে থাকা বন্দির প্রতি ৪৮ ঘণ্টা অন্তর বাধ্যতামূলক স্বাস্থ্য পরীক্ষার বিধান। নয়া আইনে বলা হয়েছে, চিকিৎসক মনে করলে তবেই স্বাস্থ্য পরীক্ষা করা যেতে পারে।
ইডির আইনে আদালতের অনুমতি ব্যতিরেকে অভিযুক্তের সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করার বিধান নিয়ে বিতর্ক জারি আছে দেশে। ওই ধারা বাতিলের দাবিতে সুপ্রিম কোর্টে মামলা হয়েছে। মানবাধিকার সংগঠনগুলির অভিযোগ, নয়া আইনে পুলিশকেও একই ক্ষমতা দিয়েছে কেন্দ্রীয় সরকার।
নয়া আইনে কঠোর করা হয়েছে মৃত্যুদণ্ডের বিধান। নয়া আইন বলবৎ হলে রাষ্ট্রপতি প্রাণভিক্ষার আবেদন এক বার নাকচ করে দেওয়ার পর আর আদালতে বিচার চাওয়া যাবে না।
বলা হয়েছে, কিছু অভিযোগের ক্ষেত্রে পুলিশ সরাসরি এফআইআর দায়ের না করে প্রথমে ঘটনার সত্যতা যাচাই করবে। তারপর পুলিশের মনে হলে এফআইআর দায়ের করে তদন্ত শুরু করতে পারে।
নতুন আইনে ৩৩টি অপরাধের ক্ষেত্রে জরিমানা ও কারাবাসের মেয়াদ বাড়ানো হয়েছে। ৬ মাসের সাজা বেড়ে হয়েছে ১ বা ২ বছর। ২ বছরের কারাবাসের মেয়াদ বৃদ্ধি করে করা হয়েছে ৩ বা ৫ বছর। বহু অপরাধে যাবজ্জীবন সাজাপ্রাপ্ত আসামীর আমৃত্যু কারাবাসের বিধান বলবৎ হয়েছে নয়া আইনে। ১৪ বছর মুক্তির আবেদন বিবেচনার সুযোগ ওই সব ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হবে না। এছাড়া ইউএপিএ-সহ দেশদ্রোহিতার অভিযোগের বিচারের কঠোর ধারাগুলি আগের মতোই বহাল রাখা হয়েছে।