
শেষ আপডেট: 3 December 2023 18:54
রবিবার সকাল থেকে হিন্দিবলয়ের তিন রাজ্য মধ্যপ্রদেশ, রাজস্থান, ছত্তীসগড়ে ভোট গণনা চলছে। সেই সঙ্গে ভোট গণনা চলছে তেলেঙ্গানায়। দুপুর ১টা পর্যন্ত যা ট্রেন্ড তাতে দেখা যাচ্ছে, হিন্দি বলয়ের তিন রাজ্যেই গেরুয়া ঝড় চলছে। অথচ ভোটের আগে তামাম রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছিলেন, মধ্যপ্রদেশ ও ছত্তীসগড়ে জিতবে কংগ্রেস। রাজস্থানে যেহেতু পাঁচ বছর অন্তর সরকার বদলের রেওয়াজ রয়েছে, তাই সেখানে জিততে পারে বিজেপি।
কিন্তু কংগ্রেসের বাড়া ভাতে ছাই ঢেলে ড্যাং ড্যাং করে তিন রাজ্যেই এগিয়ে রয়েছে বিজেপি। বড় কথা হল, ছত্তীসগড়ে বিজেপির ঘর অগোছালো থাকলেও তার সুবিধাও নিতে পারেনি কংগ্রেস। একমাত্র তেলেঙ্গানাতেই স্পষ্ট সংখ্যাগরিষ্ঠতা সম্ভাবনা রয়েছে সাবেক জাতীয় দলের।
এখন প্রশ্ন হল, এই ফলাফল কতটা বাংলার রাজনীতিকে প্রভাবিত করবে? জাতীয় রাজনীতিতেই বা এর প্রভাব কী?
বস্তুত হিন্দিবলয়ের তিন রাজ্যের ভোট ফলাফলের দিকে কংগ্রেসের যতটা নজর ছিল, ততটাই হয়তো ছিল তৃণমূলেরও। পর্যবেক্ষকদের একাংশের মতে, যে ধারা হিন্দি হৃদয়খণ্ডে দেখা যাচ্ছে, তা তৃণমূলের জন্য হতাশার বইকি। শুধু তৃণমূল নয়, এই ফলাফল উদ্ধব ঠাকরে, নীতীশ কুমারদের হতাশ করবে। তার কারণটাও পরিষ্কার। ২০১২ সালের পর থেকে হিন্দিবলয়ে বিজেপির কাছে ক্রমশ জমি হারিয়েছে কংগ্রেস। তাদের মূল্যেই বেড়েছে বিজেপি। তাই মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়-নীতীশ কুমাররা দেখতে চাইছিলেন, বিজেপির সঙ্গে যেখানে কংগ্রেসের মুখোমুখি লড়াই সেখানে কতটা ভাল ফল করে দেখাতে পারেন রাহুল গান্ধী-মল্লিকার্জুন খাড়্গেরা। দেখা গেল, তাঁরা ডাহা ফেল করেছেন।
মধ্যপ্রদেশ, রাজস্থান, ছত্তীসগড়, গুজরাত, হিমাচল, উত্তরাখণ্ড এবং অন্যান্য রাজ্য মিলিয়ে লোকসভার অন্তত ২০০টি আসনে বিজেপির সঙ্গে মুখোমুখি লড়াইয়ে রয়েছে কংগ্রেস। সেখানে বিজেপির একমাত্র প্রতিপক্ষ কংগ্রেসই। এই আসনগুলির মধ্যে সিংহভাগই দখল করে নেওয়ায় বিজেপি একা লোকসভায় ৩০০ আসনে পৌঁছে গিয়েছিল। সুতরাং এই ভোট থেকে দেখার ছিল যে বিজেপির সঙ্গে সম্মুখসমরে তাদের বেকায়দায় ফেলতে পারছেন কিনা রাহুল-মল্লিকার্জুনরা। অন্তত তিন রাজ্যের বিধানসভা ভোটের ফলাফলে দেখা গেল, এখনও পর্যন্ত সেই লক্ষণ নেই।
তিন রাজ্যের বিধানসভা ভোটের এই ফলাফল তাই সামগ্রিক ইন্ডিয়া জোটের জন্যই ধাক্কা বলে মনে করা হচ্ছে। কারণ, ইন্ডিয়া জোটে কংগ্রেসই মেরুদণ্ড। সেই মেরুদণ্ড দুর্বল থাকলে জোট সবল হওয়া মুশকিল।
এখন প্রশ্ন উঠতে পারে, তেলেঙ্গানার ফলাফলের কি কোনও প্রভাব নেই? পর্যবেক্ষকদের অনেকের মতে, অবশ্যই রয়েছে। কর্নাটকের পর দক্ষিণ ভারতে তেলেঙ্গানায় জিততে চলেছে কংগ্রেস। এটা দক্ষিণ ভারতে সাবেক জাতীয় দলের জন্য শুভ ইঙ্গিত। ধরে নেওয়া যেতে পারে যে এর পর অন্ধ্রপ্রদেশ দখলের জন্য ঝাঁপাবে কংগ্রেস। সেই সঙ্গে দক্ষিণ ভারতে বিজেপির গতি শ্লথ হবে। কিন্তু এখানে এও মনে রাখতে হবে যে তেলেঙ্গানার ফলাফলে কংগ্রেসের লাভ হলেও বিজেপির তাতে বিশেষ ক্ষতি হয়নি। এই ফলাফল বিজেপির লোকসভা আসন কমানোর জন্য খুব বেশি প্রভাব ফেলতে পারবে না। কারণ, তেলেঙ্গানায় ৪টি আসন বিজেপির দখলে ছিলও না।
তাহলে কি এই ফলাফলকেই লোকসভা ভোটের সেমি ফাইনাল হিসাবে ধরে নেওয়া হবে?
বিজেপি ইতিমধ্যেই সেটা তুলে ধরতে নেমে পড়েছে। অর্থাৎ হিন্দিবলয়ের তিন রাজ্যে ভোট ফলাফলকে হাতিয়ার করে লোকসভা ভোটের আবহ তৈরি করতে নেমে পড়েছে গেরুয়া শিবির। তবে অনেকের মতে, এটাকে লোকসভার সেমিফাইনাল বলা ঠিক হবে না। তার কারণ, তিন রাজ্যের ভোট ফলাফলের নেপথ্যে রয়েছে অনেক স্থানীয় কারণ। কিন্তু লোকসভার ভোট হবে মোদী সরকারের পারফরম্যান্সের ভিত্তিতে। তাই লোকসভা ভোটে এই ফলাফলেরই প্রতিচ্ছবি দেখা যাবে, এমনটা মনে করলে অতিসরলীকরণ হতে পারে। ভুলে গেলে চলবে না, ২০১৮ সালে হিন্দিবলয়ের এই তিন রাজ্যের ভোটে জিতেছিল কংগ্রেস। কিন্তু লোকসভা ভোটে এই তিন রাজ্যেই সুইপ করেন নরেন্দ্র মোদী।
তবে হ্যাঁ এই ফলাফল অবশ্যই বিজেপিকে চাঙ্গা করবে। সেই সঙ্গেই হতাশ করবে ইন্ডিয়া জোটের শরিকদের। অনেকে আশঙ্কা করছেন, এই ফলাফলের পর বিরোধী শাসিত রাজ্যগুলিতে কেন্দ্রীয় এজেন্সি আরও সক্রিয় হতে পারে। কারণ, নরেন্দ্র মোদী-অমিত শাহদের বড় গুণ হল তাঁরা আত্মতুষ্টিতে ভোগেন না। তাই বিজেপি ও কেন্দ্রের সরকার আগামী দিনে আরও আগ্রাসী কৌশল নেবে বলেই ধরে নেওয়া যায়।