
শেষ আপডেট: 16 June 2018 07:49
সমীর মণ্ডল: ড্রাগ-মদের আন্দাজ ছিল। মোবাইলও ইদানীং বারবারই ধরা পড়েছে বন্দিদের কাছে। কিন্তু তা-ই বলে জাপানি তেল! এমনটা কখনও দেখেননি কারা কর্তারা। কিন্তু জেলেরই ডাক্তারবাবুর ব্যাগ থেকে যখন মদ-গাঁজা-হেরোইন-মোবাইলের সঙ্গে হাফ লিটার জাপানি তেলও পাওয়া গেল, তখন রীতিমতো চক্ষু চড়কগাছ তাঁদের!
তবে জেলের অন্দরমহলের খবরওয়ালারা বলছেন, এতে নতুন কিছু নেই। টাকার বিনিময়ে সর্বস্ব হাজির করে ফেলা যায় জেলের ভিতরে। অভিযোগ, এমনকী বন্দিদের ‘সুখের’ জন্য এনে ফেলা যায় মহিলাও! এমন ভাবে শৃঙ্খলবদ্ধ চ্যানেল করা, লজ্জা পাবে শত্রুদেশের চোরাচালানকারীরাও। তবু মাঝে মাঝে শৃঙ্খল ভাঙে বই কী! আর সেই ভাঙনে সামনে আসে অমিতাভ চৌধুরীর মতো মানুষেরা। আলিপুর জেলের ডাক্তার হিসেবে কর্মরত এই অমিতাভবাবু গ্রেফতার হয়েছেন সম্প্রতি। তাঁর হাতের ব্যাগে করেই জেলের বন্দিদের কাছে এসে পৌঁছচ্ছিল গাঁজা, মদ, মোবাইল, জাপানি তেল। অভিযোগ, শুধু পৌঁছনো নয়, এ সব নিয়ে রীতিমতো ব্যবসা ফেঁদে বসা হয়েছিল জেলে।
বস্তুত, জেলের অন্দরের যুক্ত মানুষগুলোই এ সব ব্যবসার কারবারি। যেমন সর্ষের মধ্যেই ভূত, যেমন রক্ষকই ভক্ষক, যেমন বিড়াল তপস্বী—ঠিক তেমনই যেন আলিপুর সংশোধনাগারের অন্দরমহলে উঁকি মারলে যেন এই প্রবাদবাক্যগুলোই সশরীরে ঘুরে বেড়াচ্ছে।
গোপন সূত্রে আগে থেকেই খবর ছিল। তাই আলিপুর জেলের হাসপাতালের চিকিৎসক অমিতাভ চৌধুরী জেলে ঢোকার সময় আচমকাই তাঁকে তল্লাশি করা হয়। ডাক্তারবাবু জেলে ঢোকার সময় কিছু না কিছু নিয়ে ঢুকতেন রোজ। ডিআইজি (কারা) বিপ্লব দাসের নির্দেশে তাঁকে তল্লাশি করে যা পাওয়া গেল, তা দেখে বিস্ময়ে হতবাক কারাকর্তারা। দু’টো ব্যাগ থেকে এবং প্যান্টের লুকোনো পকেট থেকে সাড়ে চার লিটার মদের বোতল, দু’কেজি ২০০ গ্রাম গাঁজা, ১০ পুরিয়া হেরোইন, ৫০০ মিলিলিটার জাপানি তেল, ১৪ কয়েল হিটারের তার, পাঁচ-ছ’টি ছোট ছুরি ও কাঁচি, ৩৭টি মোবাইল ফোন (তার মধ্যে ১০টি স্মার্ট ফোন), ৩৭টি ফোনের চার্জার, ৩৭টি ইয়ারফোন এবং দু’হাজার টাকার নোটের নগদ এক লক্ষ ৩৫ হাজার টাকা পাওয়া যায়।
অমিতাভ চৌধুরীকে আলিপুর কোর্টে তোলা হলে সোমবার পর্যন্ত জেল হেফাজতের নির্দেশ দেয় আদালত। সোমবার জেল হেফাজতের মেয়াদ শেষ হলে তাঁকে পুনরায় আলিপুর জাজ কোর্টে তোলা হলে আরও সাত দিনের পুলিশ হেফাজতের নির্দেশ দেন বিচারক।
এই যেমন সে দিন, ডাকাতি কেসের আসামি রহিম আলি কোর্ট থেকে ফেরার সময় নতুন জুতো পরে জেলে আসে। নিরাপত্তা রক্ষীদের সন্দেহ হওয়ায় তল্লাশি চালাতেই সকলের চক্ষু চড়কগাছ। নতুন জুতোর সোল কাটতেই বেরোল ১০-১২ প্যাকেট গাঁজা!
এটা অবশ্য আলিপুর জেলের বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। রাজ্যের সব জেলেই প্রায় একই অবস্থা। জেলের ভিতরে মদ, গাঁজা, মোবাইল, বাড়ির খাবার, সবই পাওয়া যায় মোটা টাকার বিনিময়ে। আর সেটা চলে জেলেরই এক শ্রেণির কর্মীদের সহযোগিতায়। লক্ষ লক্ষ টাকার কারবারে রীতিমতো সিদ্ধহস্ত তাঁরা।
তবে এ সবের মধ্যে এক জন চিকিৎসক এ ভাবে সরাসরি যুক্ত হবে, সেটা একেবারেই নজিরবিহীন। সব চেয়ে বড় প্রশ্ন, অমিতাভবাবু কাদের জন্য এই সব নিয়ে যাচ্ছিলেন? কারা ওঁকে এ সব আনার দায়িত্ব দিয়েছিল? এই চক্রের সঙ্গে কি বড় কোনও মাথা জড়িত? কোন কোন অপরাধীরা পাচ্ছে এই সুবিধা? কত দিন ধরেই বা চলছে এসব কারবার ?
আসলে, এসব জেলগুলি নামেই কেবল সংশোধনাগার। এখানে আসামিদের সংশোধন হওয়া দূর অস্ত, বরং নতুন নতুন অপরাধে জড়িয়ে পড়াই দস্তুর। বস্তুত, জেলের ভিতরটা এক শ্রেণির বিচারাধীন বন্দি ও সাজাপ্রাপ্ত আসামিদের স্বর্গরাজ্য হয়ে উঠেছে। টাকা দিলেই মিলছে অভাবনীয় সব সুবিধা। টাকার জোরে দুর্নীতিটাই নীতি সেখানে। টাকা ফেললেই জোগান আসে মদ, সিগারেট, মাদক। আনানো সম্ভব মোবাইলও। এমনকী এক প্রাক্তন বন্দি জানালেন, টাকা দিলে বাইরে থেকে জোগান দেওয়া হয় মহিলাও!
এক নজরে দেখে নেওয়া যাক কত টাকায় কী কী পাওয়া যায় জেলের অন্দরমহলে।
এ ছাড়াও বাইরে থেকে মোবাইল চলে আসে হাজার দুয়েক টাকার বিনিময়ে। জেলের খাবারের বাইরে অন্য ভাল খাবার পেতে ক্যান্টিনে দিয়ে রাখা যায় অতিরিক্ত ১০ হাজার টাকা। এমনকী জেলের হাসপাতালে ভাল চিকিৎসার জন্য ব্যয় করতে হয় ২৫-৩০ হাজার টাকা।
আলিপুর জেলে কারা জড়িয়ে এই বেআইনি কারবারের সঙ্গে? কারাই বা এই কারবারের সুবিধা পাচ্ছেন? জেলের ভিতরের নিরাপত্তার ছবিটা ঠিক কেমন? এ বিষয়ে আইনই বা কী বলছে?
জানতে চোখ রাখুন দ্বিতীয় কিস্তিতে।